চানখাঁরপুল থেকে বকশীবাজার মোড়ের মাঝামাঝি স্থান। ফুটপাতঘেঁষা পিচঢালা রাস্তার ওপর রক্ত জমাট বেঁধে আছে অক্টোপাসের মতো। এখান থেকেই ফোঁটা ফোঁটা রক্তের দাগ মিলিয়ে গেছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের (ঢামেক) নতুন ভবনের এক নম্বর গেটের একটু আগে। রাস্তায় পড়ে থাকা এমন রক্তরেখা দেখে মনে হতে পারে, কোনো জবাই করা মুরগির দেহ ঝুলিয়ে নেওয়া হয়েছে এই পথে। ভুল ভাঙে সড়কের ধারে ফুটপাতে যারা অস্থায়ী দোকান করেন, তাদের কয়েকজনের কথায়। তাদের একজন সিহাব, আনুমানিক বয়স ১৩ বছর। এই কিশোর জানাল এমন রক্তলেখার পেছনের পৈশাচিকতার কথা। তার ভাষ্য, কারফিউ ভেঙে বেলা ১১টায় চানখাঁরপুল মোড়ে অবস্থান নেয় ছাত্র-জনতা। পুলিশ অবস্থান নেয় শেখ হাসিনা বার্ন ইনস্টিটিউটের মোড়ে। সেখান থেকে উভয় পক্ষই দফায় দফায় সংঘর্ষে জড়ায়। ছাত্র-জনতার ইটপাটকেলের জবাবে ওপাশ থেকে আসছিল ছররা গুলি, সাউন্ড গ্রেনেড ও কাঁদানে গ্যাস। একপর্যায়ে চানখাঁরপুল মোড় থেকে পিছু হটে ছাত্র-জনতা, শক্ত অবস্থান তৈরি করে দুই মোড়ের মাঝামাঝি স্থানে। এদিকে পুলিশ এগিয়ে এসেছে চানখাঁরপুল মোড় পর্যন্ত। অল্পসংখ্যক পুলিশ বিপুল ছাত্র-জনতা দেখে ভরকে যায়, চালায় শটগানের গুলি। তার একটি গুলি এসে লাগে একজন ছাত্রের ঠিক কপালে! এত সব বলার পর একটু সময়ের জন্য থামল সিহাব। বড় একটা ঢোক গিলে আবার বলতে শুরু করল, ‘মাথায় গুলি লাগার পর ওই ছাত্র মাটিতে লুটাইয়া পড়ল। জায়গায় মরছে! এক মিনিটের মধ্যে তার মাথা থাইকা রক্ত বাইরয়া জইমা গেল গা। এরপর ছাত্ররা হেরে তুইলা নিয়া রিকশায় উডাইছে। রিকশায় উঠানোর আগ পর্যন্ত হের মাতার রক্ত ফোঁটা ফোঁটা হইয়া পইড়া আছে রাস্তায়।’
ঠিক যেখানে নাম না-জানা জীবনদানকারী ওই ছাত্রের রক্তের দাগ মিলিয়ে গেছে, সেখানেই দাঁড়ানো শতাধিক ছাত্র-জনতা। বেলা তখন ১টা ৫৯ মিনিট। ঢামেক নতুন ভবনের ভেতর থেকে আরও শতাধিক ছাত্র-জনতা বেরিয়ে এলো। কেউ একজন চিৎকার দিয়ে বলল, ‘এইমাত্র খবর এলো, বাংলাদেশ স্বাধীন হলো।’ সবাই তখন হুল্লোড় দিয়ে উঠল। প্রকম্পিত হলো আকাশ-বাতাস। এই জমায়েত, হুল্লোড় পরিণত হলো মিছিলে। ‘এইমাত্র খবর এলো, বাংলাদেশ স্বাধীন হলো, এইমাত্র খবর এলো, শেখ হাসিনা পালিয়ে গেল।’ মুহুর্মুহু স্লোগানে পুরো কম্পাউন্ড প্রকম্পিত হলো। মিছিলটি জরুরি বিভাগের সামনে দিয়ে, জরুরি বিভাগের গেট হয়ে চলে গেল শহীদ মিনার পার হয়ে টিএসসির দিকে। রক্তের দাগ যেখানে মিলিয়ে গিয়েছিল, সেখান থেকেই শুরু হলো প্রথম বিজয় মিছিল।