জীবনবাজি রেখে যেসব ছাত্র-জনতা তীব্র আন্দোলন গড়ে এক যুগেরও বেশি সময় ধরে চলা আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটিয়েছেন তারাই এখন সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানো, চাঁদাবাজি বন্ধ, পরিচ্ছন্নতা অভিযানসহ রাষ্ট্র সংস্কারে নানামুখী কাজ করছেন স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে। এখন তো নয়ই, বরং ভবিষ্যতেও কোনো কিছু পাওয়ার আশা নেই তাদের। তবুও দিনরাত ঘাম ঝরানো পরিশ্রম করে যাচ্ছেন তারা।
এদিকে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে শেখ হাসিনার দেশত্যাগের পরপরই গণভবনসহ বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক লুটপাট, হামলা, অগ্নিসংযোগ শুরু করে সুযোগসন্ধানীরা। ফুটপাত থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলসহ পদ-পদবি দখলের অভিযোগ উঠেছে। সরকারি কর্মকর্তারাও নিজেদের নানা দাবি নিয়ে হাজির হচ্ছেন, আন্দোলন করছেন। রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা ব্যস্ত হয়ে উঠেছেন নিজেদের দল গোছাতে। আর যারা ‘বৈষ্যম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের’ বিপক্ষে ছিলেন কিংবা আওয়ামী লীগ সরকারের কাছ থেকে নানা রকম সুবিধা নিয়েছেন বিভিন্ন সময়ে, তারাও এখন ফেসবুকে রাষ্ট্র সংস্কার নিয়ে কথার ফুলঝুরি ছড়াচ্ছেন। নিজের কৃতিত্বও দাবি করছেন অনেকেই। অথচ মাঠে নেই এসব ফেসবুকযোদ্ধারা।
শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের পতনের জন্য দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল বহু বছর ধরে আন্দোলন করেছে। কিন্তু টলাতে পারেননি তাকে। অথচ ছাত্র-জনতার আন্দোলনে যখন সেই সফলতা এসেছে তখনই ক্ষমতায় যাওয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন ওই দলগুলোর নেতারা। নানা রকম চটকদার বক্তব্যও দিচ্ছেন তারা। অথচ এতদিন তারা জনগণের মৌলিক দাবিগুলো নিয়ে খুব কমই আন্দোলন করেছেন।
গত সোমবার শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে ভারতে চলে যাওয়ার পর বিভিন্ন সড়কে নামেন শিক্ষার্থী ও তরুণরা। এতদিন যে ট্রাফিক পুলিশের সদস্যরা সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে পারেননি, তা রাতারাতি বদলে গেছে। এখন আর আইন অমান্য করছে না কেউ। অযথা হর্ন বাজানো কমে এসেছে অনেকখানি। তুলনামূলক যানজটও কমেছে আগের চেয়ে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার শুরু করেছেন বিভিন্ন এলাকায়।
নগরবাসী বলছেন, বাহ্ চমৎকার! এ রকম বাংলাদেশই তো আমরা চেয়েছিলাম। শিক্ষার্থীদের এসব উদ্যোগে অনুপ্রাণিত হয়ে সাধারণ মানুষের অনেকেই তাদের সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিচ্ছেন। কামনা করছেন তাদের ভবিষ্যৎ সাফল্য।
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি রুখতে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন এলাকায় দলবেঁধে বাজার মনিটরিং শুরু করেছেন। সড়কে যেমন কোনো চাঁদাবাজি নেই। তেমনি ব্যবসা করতেও দিতে হচ্ছে না কোনো চাঁদা। ফলে গত কয়েক দিনে বাজারে বিভিন্ন পণ্যের দাম অনেক কমেছে। অথচ দুর্যোগকালীন সময়ে নানা অজুহাতে দেশের ব্যবসায়ীদের জিনিসপত্রের দাম বাড়িয়ে দেওয়ার অভ্যাস বেশ পুরনো। ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে গিয়ে তরুণরা রাষ্ট্র সংস্কারে এমন নানামুখী কাজ করছেন নিরলসভাবে।
অন্যদিকে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হল দখলের অভিযোগ উঠেছে ছাত্রদল, ছাত্রশিবিরসহ অন্যান্য সংগঠনের বিরুদ্ধে। জানা গেছে, গত সোমবার সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলের তালা ভেঙে বিভিন্ন কক্ষ দখল করেছেন ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা। এ ছাড়া কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের হল দখলেরও অভিযোগ উঠেছে গত কয়েক দিনে। হল দখলের পক্ষে তাদের যুক্তি হলো, এতদিন ছাত্রলীগ তাদের নেতাকর্মীদের কক্ষ দখল করে রেখেছিলেন জোর করে, এখন তারা সেসব কক্ষে উঠেছেন। এ যেন, সেই পুরনো রীতি আবার ফিরে এসেছে।
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও তাদের বিভিন্ন দাবি-দাওয়া নিয়ে এখন বেশ সোচ্চার। অথচ রাষ্ট্র সংস্কারে তাদের খুব একটা ভূমিকা চোখে পড়ছে না। আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্র সচিবালয়ে দীর্ঘদিন পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ভিড় জমাচ্ছেন। গত মঙ্গলবার তারা সচিবালয়ে ভিড় জমান, বৈঠক করেন। তুলে ধরেন বিভিন্ন ধরনের দাবি-দাওয়া। তাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে গত মঙ্গলবার বিভিন্ন দপ্তরের পদোন্নতিবঞ্চিত ২৮ জন সিনিয়র সহকারী সচিব ও উপসচিবকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পদায়ন করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। ওই কর্মকর্তারা ইতিমধ্যে যোগদানও করেছেন। এ ছাড়া বেশ কয়েকজনকে বিভিন্ন দপ্তরে বদলিও করা হয়েছে।
সচিবালয়ে কর্মরত প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও ব্যক্তিগত কর্মকর্তাদের পদনাম পরিবর্তন, পেশাগত ও বেতনবৈষম্য দূর করা, বেতন কমিশন গঠনসহ দীর্ঘদিনের ক্ষোভ ও হতাশা নিরসনের জন্য গত বুধবার ৯ দফা জানিয়েছেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় কার্যত প্রশাসন ক্যাডারের স্বার্থরক্ষার মন্ত্রণালয়ে পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন একদল উপসচিব। তাদের দাবি, বেআইনিভাবে তাদের পদোন্নতিবঞ্চিত করা হয়েছে। তারা অতি দ্রুত ক্যাডার নির্বিশেষে বৈষম্যহীন মেধাভিত্তিক জনপ্রশাসন গড়ার লক্ষ্যে প্রশাসন ক্যাডার ছাড়া বিশেষজ্ঞ ২৫ ক্যাডারের বেআইনিভাবে পদোন্নতিবঞ্চিত উপসচিবদের পিএসসির মেধাতালিকা অনুযায়ী স্ব-স্ব ব্যাচের সঙ্গে জ্যেষ্ঠতা নিশ্চিতপূর্বক যুগ্ম সচিব পদে ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন গতকাল।
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) পুনর্গঠনে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার প্রেষণে আসা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দুদক থেকে সরিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি নিজেদের পদোন্নতিসহ নানা দাবি জানিয়েছে দুদক সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন (ডুসা)।
আইসিটি অফিসারদের জন্য স্বতন্ত্র আইসিটি ক্যাডার চালুর জন্য চূড়ান্ত প্রস্তাব অনুমোদন করাসহ ১৩ দফা দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ আইসিটি অফিসার্স ফোরাম। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে সচিবালয়ে তারা এসব দাবি জানান।
এদিকে দুই দফা দাবিতে গতকাল দেশের ৮০টি পল্লীবিদ্যুৎ সমিতির প্রায় ২৫ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী ঢাকায় পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড ঘেরাও করেন।
বৈষম্য দূরীকরণে ছয় দফা দাবি আদায়ে সর্বাত্মক কর্মবিরতির ঘোষণা দিয়েছেন ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) সাত শতাধিক কর্মচারী। গতকাল মেট্রোরেলের উত্তরা ডিপোর সামনে তারা এক মানববন্ধনে এসব দাবি করেন।
প্রধান বিচারপতিসহ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগের ‘বিতর্কিত’ বিচারপতিদের দ্রুত পদত্যাগের দাবি জানিয়েছেন সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন। তিনি বিএনপি যুগ্ম মহাসচিব।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও বিভিন্ন দাবি নিয়ে সরব হয়েছেন। তাদের মূল দাবি, এনবিআরের চেয়ারম্যান নিয়োগ দিতে হবে শুল্ক, আবগারি ও আয়কর ক্যাডার থেকে। সেই সঙ্গে বর্তমান চেয়ারম্যানসহ শীর্ষ একাধিক কর্মকর্তার অপসারণসহ নিজেদের পদোন্নতিসহ নানা দাবি রয়েছে তাদের। এসব দাবিতে গত দুদিন ধরে তারাও আন্দোলন করছেন।
অন্যদিকে গত বুধবার সকালে অফিস চালু হওয়ার পর একদল কর্মকর্তা ও কর্মচারী কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ফ্লোরে জড়ো হন। এ সময় তারা গভর্নর, চার ডেপুটি গভর্নর, উপদেষ্টা ও আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটের প্রধানসহ চুক্তিভিত্তিক নিয়োগপ্রাপ্তদের পদত্যাগ দাবি তুলে স্লোগান দেন। একপর্যায়ে ডেপুটি গভর্নর-১ পদে থাকা কাজী ছায়েদুর রহমানকে সাদা কাগজে সই করতে বাধ্য করেন তারা।
চার ডেপুটি গভর্নর ও বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) প্রধান বিক্ষুব্ধ কর্মকর্তাদের দাবির মুখে পদত্যাগ করতে রাজি হয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় থেকে বেরিয়ে যান। এ সময় সেনাসদস্যরা ওই কর্মকর্তাদের নিরাপত্তা দেন।
অন্যদিকে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর নেতাকর্মীদের অনেকে বিদেশে পালিয়ে যাওয়ায় এবং গা ঢাকা দেওয়ায় দেশের বিভিন্ন স্থানে তাদের বাড়িতে, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলার পাশাপাশি লুটপাট হচ্ছে। অনেক এলাকায় খাসজমিতে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা দলীয় কার্যালয় দখল করারও খবর পাওয়া গেছে। ফুটপাত থেকে বিভিন্ন স্থানে চাঁদা তোলার প্রস্তুতিও নিচ্ছেন অনেকে।
রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ডাকাতির খবর পাওয়া গেছে। এসব ডাকাতদল প্রতিহত করতে রাত জেগে পাহারা দিচ্ছেন পাড়া-মহল্লার ছাত্র-জনতা। অন্যদিকে হিন্দু ও অন্যান্য ধর্মাবলম্বী সম্প্রদায়ের ওপর হামলা প্রতিহতও তারাই করছেন। অবশ্য কোথাও কোথাও কিছু রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা পাহারা দিচ্ছেন।
বিভিন্ন অপকর্মের সঙ্গে শিক্ষার্থী বা সাধারণ মানুষ জড়িত হওয়ার এখন পর্যন্ত তেমন কোনো প্রমাণ মেলেনি। বরং ‘কিশোর গ্যাং’ এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সুবিধাবাদী কর্মীরা এসব অপকর্ম করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
লক্ষ্মীপুরে প্রতিপক্ষের বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটে জড়িত থাকার অভিযোগে যুবদলের চার নেতাকে দল থেকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়েছে গতকাল। এ ছাড়া স্কুলশিক্ষকসহ কয়েকজনের বাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও চাঁদা আদায়ের অভিযোগে বুধবার রাতে একই জেলার চন্দ্রগঞ্জ ইউনিয়ন ছাত্রদলের সদস্য কাউছার মানিক বাদলকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়।
ডাকাতির ঘটনায় বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ২৯ জনকে আটক করা হয়েছে। ভুক্তভোগী এলাকার মানুষ জানিয়েছেন, যারা ডাকাতির সঙ্গে জড়িতদের বেশিরভাগই টোকাই এবং কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য। তাদের অস্ত্র এবং টাকা সরবরাহ করে পরিকল্পিতভাবে এসব করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বলা হচ্ছে, তাদের উদ্দেশ্য দেশে একটা অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করা। তারা আওয়ামী লীগের নেতাদের নির্দেশে ডাকাতিতে নেমেছে।