ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও বর্ষীয়ান কমিউনিস্ট নেতা বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য মারা গেছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে দক্ষিণ কলকাতার পাম অ্যাভিনিউয়ের বাড়িতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। পশ্চিমবঙ্গে টানা ৩৪ বছর ধরে চলা বামফ্রন্টের শাসনামলে বুদ্ধদেব দ্বিতীয় ও শেষ মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। তার বয়স হয়েছিল ৮০ বছর।
বুদ্ধদেবের ছেলে সুচেতন ভট্টাচার্য কলকাতার সংবাদমাধ্যম আনন্দবাজার অনলাইনকে বলেন, সকালে নাস্তা করার পর অসুস্থ হয়ে পড়েন তার বাবা, তারপর স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ২০ মিনিটে চিরবিদায় নেন।
বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের জন্ম ১৯৪৪ সালের ১ মার্চ। কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের ভাইয়ের ছেলে রাজনীতিবিদের পাশাপাশি কবি ও সাহিত্যিক হিসেবেও ছিলেন পরিচিত। ২০০০ থেকে ২০১১ পর্যন্ত টানা ১১ বছর পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন তিনি। পশ্চিমবঙ্গের প্রয়াত সাবেক মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর উত্তরসূরি ছিলেন তিনি। তিনি আদর্শ কমিউনিস্ট হিসেবে জীবনযাপন করতেন।
বুদ্ধদেব দীর্ঘদিন ধরেই গুরুতর শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যায় ভুগছিলেন। এ নিয়ে বেশ কয়েকবার হাসপাতালে ভর্তি হতে হয় তাকে। গত বছরের জুলাইতে আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল।
নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত বুদ্ধদেব কলকাতার ওই বেসরকারি হাসপাতালে বেশ কয়েকদিন ভেন্টিলেশনে ছিলেন। ফুসফুস ও শ্বাসনালিতে মারাত্মক সংক্রমণ ধরা পড়লেও ১২ দিন পর সুস্থ হয়ে বাড়িতে ফেরেন। এরপর থেকে কঠোর বিধিনিষেধের মধ্যে জীবন কাটাতে হচ্ছিল তাকে।২০২১ এর মে মাসে কভিডে আক্রান্ত হয়েছিলেন তিনি। তখনো হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল তাকে। চিকিৎসার পরে কভিড-মুক্ত হয়েছিলেন।
আনন্দবাজারকে একটি সূত্র জানিয়েছে, বুধবার রাতে বুদ্ধদেবের শ্বাসকষ্ট বাড়াবাড়ি পর্যায়ে গিয়েছিল। কিন্তু সেটা রাতে সামাল দেওয়া হয়েছিল। তখনই ঠিক করা হয়েছিল, বৃহস্পতিবার বেলা ১১টা নাগাদ উডল্যান্ডসের চিকিৎসকরা এসে তাকে পরীক্ষা করবেন। প্রয়োজনে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করানো হবে। কারণ, হাসপাতালে যাওয়ার বিষয়টিতে তার ঘোর অনীহা ছিল। তাই চিকিৎসকদের পরামর্শের কথা ভাবা হয়েছিল। সেই মতোই বিষয়টি এগোচ্ছিল। কিন্তু বৃহস্পতিবার সকাল থেকে আবার অসুস্থ হয়ে পড়েন বুদ্ধদেব। সকালে উঠে প্রাতরাশের পর চা-ও খেয়েছিলেন। তার পরে আবার অসুস্থ হয়ে পড়ায় তাকে নেবুলাইজার দেওয়ার চেষ্টা হয়। সেই সময়েই তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হন। চিকিৎসকদের খবর দেওয়া হয় দ্রুত। তারা এসে বুদ্ধদেবকে প্রয়াত বলে ঘোষণা করেন।
বুদ্ধদেবের মুখ্যমন্ত্রিত্বের শেষ মেয়াদে পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্টের জনপ্রিয়তা তলানিতে নামতে থাকে। এ মেয়াদে শিল্পায়ন নীতি নিয়ে এগোতে থাকা বামফ্রন্ট সরকারের জমি অধিগ্রহণ পদ্ধতি ব্যাপক বিরোধিতার মুখে পড়ে। এই নিয়ে সৃষ্ট বিতর্কে তার সরকার জনপ্রিয়তা হারায়। ২০০৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ব্যাপক জয় নিয়ে আবার ক্ষমতাসীন হলেও ২০১১ সালে শোচনীয় পরাজয়বরণ করে বামফ্রন্ট। এর মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘ বাম শাসনের অবসান ঘটে। শুরু হয় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেস পার্টির (টিএমসি) শাসন।
বর্ষীয়ান এ রাজনীতিক সর্বশেষ আলোচনায় এসেছিলেন ২০২২ সালে ভারত সরকারের দেওয়া রাষ্ট্রীয় সম্মান পদ্মভূষণ প্রত্যাখ্যান করে।
বুদ্ধদেব ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির (মার্কসবাদী) সর্বোচ্চ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী পরিষদ পলিটব্যুরোর সদস্য ছিলেন। বুদ্ধদেব তার পূর্বসূরি জ্যোতি বসুর মতোই মরণোত্তর দেহদান করে গেছেন। সেই প্রক্রিয়া কোথায় এবং কীভাবে সম্পন্ন হবে, তা নিয়ে আলাপ-আলোচনা শুরু করেছেন সিপিএমের রাজ্য নেতৃত্ব। বুদ্ধদেবকে শেষ শ্রদ্ধা জানানোর বিষয়টি নিয়েও তারা আলোচনায় বসবেন। বুদ্ধদেব পলিটব্যুরোর সদস্য ছিলেন। ফলে দিল্লির নেতাদেরও তার শেষযাত্রায় একটা ভূমিকা থাকবে। আপাতত পাম অ্যাভিনিউয়ের দুই কামরার ফ্ল্যাটেই তার মরদেহ রাখা হয়েছে।