ছাত্ররাজনীতি বন্ধের দাবিতে সরব জবি শিক্ষার্থীরা

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) সাধারণ শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে দলীয় লেজুড়বৃত্তিক ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি জানিয়েছেন। রাজনৈতিক দলভিত্তিক ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করে দ্রুত সময়ের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (জকসু) গঠন করার দাবি জানিয়েছেন তারা। কয়েক দিন ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের ব্যক্তিগত প্রোফাইলে পোস্ট কিংবা বিভিন্ন গ্রুপের মাধ্যমে এই দাবি জানাচ্ছেন জবির শিক্ষার্থীরা। তা ছাড়া বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ ব্যাচ থেকে বিবৃতি দিয়ে ছাত্ররাজনীতি বন্ধের দাবি জানিয়েছেন।

এসব বিবৃতিতে বলা হয়, শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক দলভিত্তিক ছাত্ররাজনীতি চান না। আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার মুক্তির ৯ দফা দাবির মধ্যে অন্যতম দাবি ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ে দলভিত্তিক ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করা। এই দাবির সঙ্গে সংহতি রেখে জবি ক্যাম্পাসে দলভিত্তিক ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ এবং অনতিবিলম্বে জকসু গঠন করা হোক। তা ছাড়া কেউ যদি রাজনৈতিক দলভিত্তিক ছাত্ররাজনীতিতে জড়িত হয়, তবে তাকে বিভাগ থেকে বয়কট করা হবে। কোনো বিভাগীয় কার্যক্রমে সেই শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করতে পারবেন না এবং তার সঙ্গে কোনো শিক্ষার্থী ক্লাস-পরীক্ষায় বসবে না।

জবির সাধারণ শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, কয়েক বছর ধরে ক্যাম্পাসে সাধারণ শিক্ষার্থী, সাংবাদিক এবং ভিন্নমতের ছাত্ররাজনীতি যারা করেছেন, তারা ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মীদের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তাই শিক্ষার্থীরা এসব লেজুড়বৃত্তিক ছাত্ররাজনীতি আর চান না। তারা চান ছাত্র সংসদ নির্বাচন।

ভুক্তভোগী এক শিক্ষার্থী মিনহাজ বলেন, ‘ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগ ছিল একটা ভয়ের নাম। সাধারণ শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে শিক্ষক, সাংবাদিকরাও তাদের হামলার শিকার হতো নিয়মিত। আমি গত জানুয়ারি মাসে ছাত্রলীগের মারধরের শিকার হই। বিচার চাইতে গেলে ফোন করে হত্যার হুমকি দেয় ছাত্রলীগ। এরপর বিভিন্নভাবে হুমকি দিয়ে তারা আমাদের ভয়ে রাখত।’

আরেক ভুক্তভোগী জবি প্রেস ক্লাবের অর্থ সম্পাদক ও চ্যানেল আই অনলাইনের প্রতিনিধি রিদুয়ান ইসলাম। তিনি বলেন, ‘ক্যাম্পাসে ১৭তম আবর্তনের জুনিয়রদের ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের দুই প্যানেলে ভেড়ানোকে কেন্দ্র করে ঝগড়া শুরু হয়। আমি পেশাদারির জায়গা থেকে সেই দৃশ্যের ভিডিওচিত্র ধারণ করছিলাম। হঠাৎ ছাত্রলীগের দুজন কর্মী (শাহিন আলম ও তানিম ফারহান) এসে আমার ফোন কেড়ে নিতে চেষ্টা করে এবং অনবরত ধাক্কা দিতে থাকে। এরপর তাদের আরও অনেক কর্মী আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। এমন ঘটনার মধ্য দিয়ে ক্যাম্পাসে সাংবাদিকদের কাজের সুষ্ঠু পরিবেশ বিঘ্নিত করেছে ছাত্রলীগ। আমি ক্যাম্পাসে সাংবাদিকদের কাজের সুষ্ঠু পরিবেশ চাই।’

ছাত্ররাজনীতি বন্ধ না করে  সুস্থ ধারার ছাত্ররাজনীতি চালুর পক্ষে মত দেন জবি শিক্ষার্থী সিফাত হোসেন সাকিব। তিনি বলেন, ‘ছাত্ররাজনীতি কখনোই বন্ধ করা উচিত না। তবে ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের জিম্মি করে যে রাজনীতি, সেটা বন্ধ হওয়া উচিত। অপরাজনীতিকে দমন করতে হলে প্রয়োজন সুস্থ ধরার ছাত্ররাজনীতি। ছাত্ররাজনীতি বন্ধ করে সেটা হবে না; বরং অপরাধী ছাত্রসংগঠন বন্ধ করা হোক। এগুলো ক্যাম্পাসে থাকা উচিত না। ক্যাম্পাসভিত্তিক ছাত্র সংসদ ছাত্ররাজনীতি চর্চার প্ল্যাটফর্ম হতে পারে।’

সামিয়া নুসরাত নামে আরেক শিক্ষার্থী বলেন, ‘লেজুড়বৃত্তিক এবং দলভিত্তিক ছাত্ররাজনীতি ক্যাম্পাসে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। যার উদাহরণ আমরা বছরের পর বছর ধরেই দেখে এসেছি। তাদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের কারণে ক্যাম্পাসে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ বিনষ্ট হয়। কিছুদিন আগেও আমাদের ছাত্র আন্দোলনেও নৃশংস হামলা করে হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে ছাত্রলীগ। অতীতে ছাত্রদল, শিবিরও এমন কর্মকাণ্ড চালিয়েছে। তাই আমরা ক্যাম্পাসে সব ধরনের ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ চাই।’

জবির বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক ইভান তাহসিভ বলেন, ‘আমাদের এ ব্যাপারে কেন্দ্রীয় নির্দেশনা এলে সেই অনুযায়ী বিস্তারিত জানানো হবে। বৈষম্যবিরোধী  ছাত্র আন্দোলনের ৯ দফার মধ্যে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করার কথা ছিল, যেহেতু কেন্দ্রীয় সমন্বয়কদের থেকে এখনো কোনো নির্দেশনা আসেনি, তাই আমাদের একটু অপেক্ষা করতে হবে। এমনটা হতে পারে আমাদের ছাত্র সংসদ থাকবে, সেখানে শিক্ষার্থীরা তাদের দাবি তুলে ধরতে পারবে। এখন যে দলই হোক আওয়ামী লীগ কিংবা বিএনপি, আমরা লেজুড়বৃত্তিক ছাত্ররাজনীতি চাই না।’

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের প্রাক্তন চেয়ারম্যান ও সহযোগী অধ্যাপক ড. শাহ নিস্তার জাহান কবির বলেন, ‘আমি ছাত্ররাজনীতির বিপক্ষে না, আমি নোংরামির বিপক্ষে। আমি এমন কোনো ছাত্ররাজনীতি বা সংগঠন চাই না, যারা ভাইস চ্যান্সেলর, প্রক্টর, রেজিস্ট্রারের রুমে বসে পলিসি মেকিংয়ে সমস্যা করে। যেখানে বড় ভাইদের সালাম দিতে হবে, মিছিলে যেতে হবে, যেখানে বাজে বাজে কথা শোনানো হবে, এমন ছাত্ররাজনীতি না হোক। একটি পরিচ্ছন্ন ছাত্ররাজনীতি গড়ে উঠুক।’

তবে বিষয়টি সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত বলে মনে করেন গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক রাইসুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘ছাত্ররাজনীতি বন্ধ করার পক্ষে কিছু যুক্তি রয়েছে। প্রথমত, এটি শিক্ষার্থীদের শিক্ষার প্রতি মনোযোগ বাড়াতে সহায়ক হতে পারে। কারণ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য তারা কম সময় ব্যয় করবে। দ্বিতীয়ত, ছাত্ররাজনীতির ফলে ক্যাম্পাসে অশান্তি ও সংঘাত সৃষ্টি হতে পারে, যা নিরাপত্তার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তৃতীয়ত, রাজনৈতিক দলগুলোর প্রভাব ছাত্রদের ওপর পড়তে পারে, যা তাদের স্বাধীন চিন্তাভাবনার স্বাধীনতা সীমিত করতে পারে। তবে, ছাত্ররাজনীতি বন্ধ করার ফলে শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক সচেতনতা এবং সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা কমতে পারে, তাই বিষয়টি সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত।’

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর জাহাঙ্গীর হোসেনের মোবাইল ফোনে কল করে কোনো সাড়া মেলেনি।