কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে সহিংস পরিস্থিতিতে প্রায় এক মাস বন্ধ থাকার পর ধীরে ধীরে খুলতে শুরু করেছে রাজধানীর বিদ্যালয়গুলো। তবে এখনো আতঙ্ক কাটেনি সাধারণ মানুষের। সন্তানকে বিদ্যালয়ে পাঠানো নিয়ে দোটানায় রয়েছেন বহু অভিভাবক। তারা চান, দ্রুতই এমন পরিস্থিতির অবসান হোক। রাস্তাঘাটের নিরাপত্তা জোরদার ও গুমোট পরিবেশ কাটিয়ে আবারও খুলে যাক সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। তবে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে গতকাল সোমবার পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি।
কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে গত ১৬ জুলাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। এরপর গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। তারপর তিন দিন সরকারবিহীন ছিল দেশ। এরই মধ্যে গত ৭ আগস্ট থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার নির্দেশনা এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছিল আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর)। ওইদিন থেকে বেসরকারি বিদ্যালয়গুলোর মধ্যে কিছু খোলা
থাকলেও সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা ও নিরাপত্তা জোরদার না হওয়ায় সিদ্ধান্তহীনতায় খোলেনি বেশিরভাগ সরকারি বিদ্যালয়। তবে গত রবিবার থেকে ধীরে ধীরে খুলতে শুরু করেছে রাজধানীর বিদ্যালয়গুলো। এদিন রাজধানীর কিছু বিদ্যালয় খোলা পাওয়া গেছে, আবার কিছু ছিল বন্ধ। বেসরকারি বিদ্যালয়গুলোর মধ্যে কিছু খোলা থাকলেও সরকারি বিদ্যালয়গুলোর অধিকাংশই বন্ধ। হাতেগোনা কয়েকটি বিদ্যালয় খুললেও শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ছিল কম। যেসব অভিভাবক সন্তানদের নিয়ে বিদ্যালয়ে আসেন, তাদের মধ্যেও দেখা যায় এক ধরনের অস্বস্তি। সন্তানকে বিদ্যালয়ে পাঠানো নিয়ে তারাও রয়েছেন দোটানায়।
গতকাল থেকে বিদ্যালয়ে যাওয়া শুরু করেছে মিরপুরের সাউথ পয়েন্ট স্কুল ও কলেজের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী তামান্না রহমান। তার মা পারুল আক্তার মেয়ের নিরাপত্তা নিয়েই বেশি শঙ্কিত। সেজন্য নিজেই মেয়েকে নিয়ে বিদ্যালয়ে যাতায়াত করেন। তিনি বলেন, ‘রাস্তাঘাটে এখনো পুলিশ নেই। নিরাপত্তা এখনো জোরদার হয়নি। তাই কিছুটা আতঙ্ক তো রয়েছেই। আমরা চাই এটা দ্রুত কেটে যাক।’
বনশ্রী আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের দশম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর বাবা শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘৭ আগস্ট থেকে স্কুল খোলা থাকলেও নিরাপত্তাজনিত কারণে ছেলেকে স্কুলে পাঠাইনি। সেনাপ্রধান ঘোষণা দেওয়ার পর স্কুল খুলেছে। কিন্তু আমি বাচ্চাকে পাঠাইনি। মন্ত্রণালয় থেকে ঘোষণার আগে পাঠাব না। আর এখন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির যে অবস্থা, সে কারণেই ছেলেকে স্কুলে পাঠানোর সাহসও পাচ্ছি না।’
এই প্রসঙ্গে মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মোহাম্মদ এমাম হোসাইন বলেন, ‘স্কুল খোলা থাকলেও শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কম থাকায় স্বাভাবিক পাঠদান প্রক্রিয়ায় ফেরা যাচ্ছে না। অনেকের মধ্যে এখনো আতঙ্ক কাজ করছে। অনেকে আবার সরকারি ঘোষণার জন্য অপেক্ষা করছে, কবে স্কুল খুলে দেওয়া হবে। তবে শিক্ষার্থী উপস্থিতি অনেক কম। গড়ে ১০-১১ শতাংশ শিক্ষার্থী ক্লাসে আসছে। ফলে স্বাভাবিক পাঠদানে ফেরা যাচ্ছে না।’ এদিকে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা বিধান রঞ্জন রায় দায়িত্ব পাওয়ার পর গতকাল সচিবালয়ে প্রথম অফিস করতে আসেন। এদিন সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি বলেন, ‘প্রাথমিক শিক্ষা হচ্ছে যেকোনো একটি দেশের জাতির জন্য একদম ভিতস্বরূপ। কারণ বাচ্চাদের শিক্ষাটা কিন্তু প্রথম জীবনে, যা পড়ে সেটি কিন্তু ব্যক্তিত্বের ভিত গড়ে দেয়। কিন্তু খুব দুঃখজনক হলো, আমাদের দেশে বাস্তবে কিন্তু এটা এতটুকু কার্যকর হয় না, যেমনটা করা উচিত, তেমনটা করা হয় না।’
এই উপদেষ্টা বলেন, ‘একসময় আমাদের সাক্ষরতার হার খুব কম ছিল। একদিক দিয়ে অনেক উন্নতি হয়েছে, আমাদের অবকাঠামোগত অনেক উন্নতি হয়েছে। ফলে সাক্ষরতার হার বেড়েছে। আমাদের শিশুরা বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাচ্ছে। কিন্তু এই মুহূর্তে আমাদের যেটা প্রয়োজন সেটা হচ্ছে, মানের উন্নয়ন করা। প্রাথমিক শিক্ষার মানের উন্নয়ন করা। যেন আমাদের শিশুরা সুনাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠে এবং তারা অবদান রাখতে পারে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি আজকে এসেছি। সবার সঙ্গে বসব। তারপর আমরা কর্মকৌশল ঠিক করব। প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো খোলার সিদ্ধান্ত হয়ে আছে। কিন্তু কার্যকর হচ্ছে না।’ কবে থেকে কার্যকর হচ্ছে জানতে চাইলে অন্তর্বর্তী সরকারের এই উপদেষ্টা বলেন, ‘এই বিষয়টা নিয়ে আমরা কথা বলি, তারপর ঠিক করি। কারণ যেটা হয়েছে সামগ্রিকভাবে এখন একটা অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। আর বাচ্চারা খুব ছোট। অস্থিরতা না কমে যদি সমস্যাগুলো থাকে, তাহলে তো মানুষজন বাচ্চাদের স্কুলে পাঠাতে আগ্রহ বোধ করে না। ঘোষণা দিলেই তো হয় না ব্যাপারটা। সেজন্যই এ বিষয়টি ঠিক করে আমরা জানাব।’
এর আগে গত শুক্রবার অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রথম বৈঠকেও দ্রুততম সময়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।