ইসলাম জীবজন্তর অধিকার নিশ্চিত করেছে। ভূপৃষ্ঠে যত জীবজন্তু আছে সেগুলোর সবই একেকটি জাতি। কোনো কারণ ছাড়া সেসব প্রাণীকে হত্যা করা যাবে না এবং কোনো রকম অত্যাচারও চালানো যাবে না। ইসলামে এসব নিষেধ এবং অপরাধ বলে গণ্য। মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘ভূপৃষ্ঠে বিচরণশীল প্রত্যেকটি জীব এবং (বায়ুমণ্ডলে) নিজ ডানার সাহায্যে উড়ন্ত প্রত্যেকটি পাখি তোমাদের মতোই একেকটি জাতি।’ (সুরা আনআম ৩৮)
দৃশ্যত আমাদের বুঝে আসে না যে, সব প্রাণীই উপকারী কি না? সব প্রাণীই মানুষের কল্যাণে কাজে লাগে কি না? এসব বুঝে না আসলেও সত্য হলো, আল্লাহর সব সৃষ্টি কোনো না কোনোভাবে মানুষের উপকারে আসে। সাপের কথাই ধরা যাক। সাপের সামান্য ছোবলে সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মৃত্যু হয়। অথচ এই সাপের বিষে তৈরি হয় দুরারোগ্য ব্যাধির ওষুধ। সে কারণে মহান আল্লাহর কোনো সৃষ্টিকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা যাবে না।
অন্যদিকে গবাদিপশুর কথা ভাবা যেতে পারে। একটি গরুর কোনো কিছুই ফেলনা নয়। গরুর দুধ, গোশত ও ভুঁড়ি আমরা খেয়ে থাকি। এমনকি শিং ও চামড়ার বাণিজ্যিক মূল্য আছে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন, ‘তোমরা আহার করো এবং তোমাদের গবাদিপশু চরাও। অবশ্যই বিবেকসম্পন্নদের জন্য এতে বহু নিদর্শন আছে।’ (সুরা তাহা ৫৪)
প্রাণীর অধিকারের বিষয়ে রাসুল (সা.)-এর একাধিক হাদিস পাওয়া যায়। রাসুল (সা.) কখনো প্রাণী হত্যাকে পছন্দ করেননি। ছোট একটি পিঁপড়াও তার কাছে মর্যাদা পেত। ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘রাসুল (সা.) চার প্রকার প্রাণী হত্যা করতে বারণ করেছেন। তা হলো পিঁপড়া, মধুমক্ষিকা, হুদহুদ পাখি এবং চড়ইসদৃশ বাজপাখি।’ (আবু দাউদ ৫২৬৭) অন্য হাদিসে রাসুল (সা.) অন্যায়ভাবে প্রাণী হত্যাকারীর শাস্তির কথা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি চড়ুই বা তার চাইতে ছোট কোনো প্রাণীকে অযথা হত্যা করে, তাকে আল্লাহ কিয়ামতের দিন সে সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবেন। তখন জিজ্ঞাসা করা হলো, হে আল্লাহর রাসুল! তার অধিকার কী? তিনি বলেন, তার অধিকার হলো তাকে যথা নিয়মে জবাই করে ভক্ষণ করা এবং তার মাথা কেটে নিক্ষেপ না করা।’ (সুনানে নাসায়ি)
বাসা-বাড়িতে পিঁপড়ার উপদ্রব হয়। খাবারে ছড়িয়ে পড়ে। এই অবস্থায় পিঁপড়া হত্যা করা ঠিক নয়। এর জন্য বিভিন্ন রকম ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। যাতে পিঁপড়া না আসে। যেমন : পিঁপড়া আসার পথে চক ঘষে দেওয়া যায়। আবার খাবার ঢেকে রাখলেও পিঁপড়া আসবে না। অহেতুক পিঁপড়া হত্যা করা উচিত নয়। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘কোনো এক নবীকে একটি পিঁপড়া দংশন করলে তিনি সে পিঁপড়ার বস্তি জ্বালিয়ে দেওয়ার আদেশ দেন এবং তা জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। তখন আল্লাহতায়ালা তার প্রতি ওহি প্রেরণ করে বলেন, তোমাকে তো একটা পিঁপড়া দংশন করেছে। আর তুমি এমন এক জাতিকে ধ্বংস করলে যারা আল্লাহর মহিমা ও পবিত্রতা ঘোষণা করত।’ (সুনানে নাসায়ি)
জীবজন্তর সেবা-যত্ন যারা করবে তাদের জন্য সুসংবাদের ঘোষণা রয়েছে। একবার এক লোক রাস্তায় চলতে চলতে পিপাসায় কাতর হয়ে পড়ল। সে একটি কূপ দেখতে পেয়ে তাতে নেমে পানি পান করল। কূপ থেকে উঠে সে দেখল, একটি কুকুর হাঁপাচ্ছে এবং পিপাসায় কাতর হয়ে কাদামাটি চাটছে। সে ভাবল, আমার এরূপ পিপাসা পেয়েছিল কুকুরটিরও অনুরূপ পিপাসা পেয়েছে। সে আবার কূপের মধ্যে নামল এবং পায়ের মোজায় পানি ভরে তা মুখে কামড়ে ধরে ওঠে এসে কুকুরটিকে পানি পান করাল। আল্লাহ তার এ কাজে খুশি হয়ে তার সব গুনাহ ক্ষমা করে দিলেন। সাহাবিরা বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! এসব প্রাণীর সেবা করলে আমাদেরও সওয়াব দেওয়া হবে? তিনি বললেন, প্রতিটি জীবিত প্রাণীর সেবার জন্য সওয়াব আছে। (আবু দাউদ)
আল্লাহর সব সৃষ্টি উপকারী। পাশাপাশি মানুষের জন্য এসব সৃষ্টির মধ্যে শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে। আল্লাহর সৃষ্টি মাখলুক নিয়ে চিন্তা করলে ইমান বৃদ্ধি পাবে। আল্লাহর প্রতি ভয় ও ভালোবাসা বৃদ্ধি পাবে। মৌমাছির কথা কি আমরা ভেবে দেখেছি? মৌমাছিকে আরবিতে বলা হয় ‘নাহল’। ‘নাহল’ নামে পবিত্র কোরআনে একটি সুরা রয়েছে। মৌমাছি আমাদের জন্য উৎকৃষ্ট মধু আহরণ করে। মধুর অনেক উপকারিতা রয়েছে। মধুকে বলা হয় মৃত্যু ছাড়া সব রোগের ওষুধ। মৌমাছি খুবই পরিশ্রমী পতঙ্গ। ফুলের রস মুখে নিয়ে সেটা থেকে জলীয় অংশ দূর করে শতভাগ ভেজালমুক্ত এক ফোঁটা মধু তৈরি করতে যে শ্রম ও সময় ব্যয় করে সেটা বিস্ময়কর। এক পাউন্ড মধু বানাতে ৫৫০ মৌমাছিকে প্রায় ২০ লাখ ফুলে ভ্রমণ করতে হয়। আবার এক পাউন্ড মধু সংগ্রহ করতে একটি কর্মী মৌমাছিকে প্রায় ১৪.৫ লাখ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতে হয়। যা দিয়ে পৃথিবীকে তিনবার প্রদক্ষিণ করা সম্ভব। সায়েন্স টাইমসের মতে, পৃথিবীতে যত রকমের চাষ মানুষ করে থাকে তার ৭০ শতাংশ নির্ভর করে মৌমাছির ওপর। মৌমাছি যদি না থাকে, তাহলে মানুষ নিশ্চিহ্ন হতে সময় লাগবে মাত্র চার বছর। তাই প্রাত্যহিক জীবনে আমরা যেন কোনো প্রাণী হত্যা না করি। যতটুকু পারি ততটুকু অবলা প্রাণীদের সেবা করার চেষ্টা করি। এতেই কল্যাণ আছে। গুনাহ মাফের সুযোগও আছে।