ধোঁকা দেওয়া, প্রতারণা করা, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করা এবং কথার বরখেলাফ করা মন্দ গুণাবলির অন্তর্ভুক্ত। এ জাতীয় মন্দ গুণাবলি এখন মানুষের মধ্যে ব্যাপক হারে বাসা বাঁধতে শুরু করেছে। অনেক মানুষ দিন দিন মনুষ্যত্ব হারিয়ে ফেলছে। ভাবছে ধোঁকাবাজি করার মধ্যেই বুঝি সফলতা। এজন্যই আজকাল কথা, কাজ ও আচরণে মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করছে মানুষ। এমন প্রতারণা থেকে নিজ পরিবারের সদস্য থেকে শুরু করে কাছে-দূরের কেউ রেহাই পাচ্ছে না।
মানুষ কেনা-বেচার ক্ষেত্রে ওজনে কম দিচ্ছে। ভেজাল পণ্য দিয়ে গ্রাহককে ধোঁকা দিচ্ছে। অনলাইনে কেনা-বেচা করার ক্ষেত্রে ধোঁকা দেওয়ার প্রবণতা থাকে বেশি। গ্রাহকের সরলতা বা দুর্বলতাকে পুঁজি করে তাকে ধোঁকা দেওয়া হয়। একবারও কী আমরা ভেবে দেখেছি যে, এভাবে আমরা নিজেদের ইমান-আমল নষ্ট করছি না তো?
হাদিসের আলোকে প্রকৃত মুসলমান হচ্ছে ওই ব্যক্তি, যার হাত ও মুখের যাবতীয় অন্যায় আচরণ থেকে সব মুসলমান নিরাপত্তা লাভ করে। কিন্তু কতজন মানুষ বলতে পারবে যে, তাদের হাত ও মুখের আচরণ দ্বারা কারও কোনো ক্ষতি হচ্ছে না? কাউকে কটুকথা বলছে না? খোঁচা দিয়ে কথা বলছে না?
এমনটা কি সবাই বলতে পারবে? আর এভাবে প্রকৃত অর্থে তারা কি তাদের নিজেদের সঙ্গেই ধোঁকাবাজি করছে না? পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘তারা আল্লাহ ও মুমিনদের সঙ্গে ধোঁকাবাজি করে। প্রকৃতপক্ষে তারা নিজেদের ছাড়া আর কারও সঙ্গে ধোঁকাবাজি করে না। আর তারা এ বিষয়টি অনুভবও করতে পারে না।’ (সুরা বাকারা ০৯)
সাহাবি হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমাদের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করবে সে আমাদের দলভুক্ত নয়। আর যে ব্যক্তি আমাদের ধোঁকা দেবে সেও আমাদের (মুসলমানদের) দলভুক্ত নয়।’ (সহিহ মুসলিম)
এ হাদিসে পরিষ্কার বলা হচ্ছে, যে ব্যক্তি আমাদের কারও বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করবে অর্থাৎ খুনোখুনি, হানাহানি, মারামারি, যুদ্ধবিগ্রহ, বিশৃঙ্খলা ও অশান্তির কাজ করবে সে কখনো মুসলমানদের মধ্যে গণ্য হবে না। একইভাবে যারা মানুষকে বিভিন্নভাবে প্রতারিত করে, ধোঁকা দেয়, বিভিন্ন মিথ্যা-ছলচাতুরীর মাধ্যমে মানুষের হক নষ্ট করে, তারাও মুসলমানদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হবে না। এর অর্থ হলো, এমন লোকেরা কখনো ইসলামের পরিপূর্ণ অনুসারী হতে পারে না। অথচ মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে বলেছেন, ‘তোমরা পরিপূর্ণভাবে ইসলামের মধ্যে প্রবেশ করো।’ (সুরা বাকারা ২০৮)
অতএব আমাদের পরিপূর্ণভাবে ইসলামের বিধান মেনে চলতে হবে। এমন যেন না হয়, আমরা নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করলাম, রমজানে রোজা রাখলাম, অর্থ-সম্পদ আছে বলে হজ করলাম এবং জাকাতও আদায় করলাম, কিন্তু কখনোই মানুষের সঙ্গে প্রতারণা ও ধোঁকাবাজি করা বন্ধ করতে পারলাম না। এভাবে ছলচাতুরীর মাধ্যমে মানুষের হক নষ্ট করার মানে হলো, জীবনের যাবতীয় ইবাদত ও আমল নিজের দ্বারাই বরবাদ হয়ে গেল। অথচ হাদিসে স্পষ্ট বর্ণনা এসেছে, ইসলাম হলো কল্যাণকামিতার নাম। কাজেই কাউকে কষ্ট দিয়ে, কারও হক নষ্ট করে, কাউকে ধোঁকা দিয়ে অবশ্যই তাকে ক্ষতিগ্রস্ত করা হচ্ছে। আর এটা কখনোই কল্যাণ হতে পারে না।
যারা মানুষকে ধোঁকা দেয়, মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করে তারা এর পরিণাম অবশ্যই ভোগ করে। কোনো কোনো প্রতারককে মহান আল্লাহ দুনিয়াতেই সাজা দেন। পরকালের সাজা তো বাকিই থাকে। আর ধোঁকা ও প্রতারণার সাজা যারা দুনিয়াতে পায় না তাদের জন্য মহান আল্লাহ পরকালে প্রস্তুত করে রেখেছেন ভয়াবহ আজাব। যে আজাব থেকে রক্ষা পাওয়ার কোনো উপায় নেই।
মহান আল্লাহ আমাদের যাবতীয় অনিষ্টকারী বিষয় থেকে হেফাজত করুন। আমাদের দ্বারা যেন এমন কোনো আচরণ প্রকাশ না পায়, যা সম্পূর্ণ প্রতারণার অন্তর্ভুক্ত। মহান আল্লাহ আমাদের সহায় হোন। সবার সঙ্গে যেন আমরা উত্তম আচরণ করতে পারি, তিনি আমাদের সেই তৌফিক দান করুন।