ফ্ল্যাট কেনার বায়না করেও পুরো টাকা পরিশোধ করেননি কৃষিবিদ হোসনে আরা (রীনা)। সার্ভিস চার্জ, বিদ্যুৎ বিলসহ কোনো ইউটিলিটি বিলও পরিশোধ করেননি। উল্টো সাড়ে ৫ বছর ধরে জোর করে দখলে রেখেছেন কোটি টাকার ফ্ল্যাট। বিষয়টি নিয়ে সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ, এমনকি মামলা করেও প্রতিকার পাচ্ছেন না প্রকৃত ফ্ল্যাট মালিক। উল্টো নিজেদের ক্ষমতা ও প্রভাব ব্যবহার করে হুমকি-ধমকি দিয়ে যাচ্ছেন হোসনে আরা ও তার স্বামী। ভুক্তভোগী ফ্ল্যাট মালিক মো. আব্বাস উদ্দিন (বিটু) দেশ রূপান্তরের কাছে এমন অভিযোগ করেছেন।
জানা গেছে, অভিযুক্ত হোসনে আরা বর্তমানে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক হিসেবে কর্মরত আছেন। তার স্বামী কৃষিবিদ ওবায়দুর রহমান।
ভুক্তভোগী ফ্ল্যাট মালিক মো. আব্বাস উদ্দিন (বিটু) দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তেজগাঁও থানাধীন মণিপুরী পাড়ার ২০/এ বি হোল্ডিংয়ের মাতৃছায়া নামের বহুতল ভবনের অষ্টম তলার সি-৭ নম্বর ফ্ল্যাটটি সব নিয়মকানুন মেনে ২০২২ সালের ২৫ সেপ্টেম্বরে সাফ কবলা দলিল মূলে ক্রয় করি। ফ্ল্যাটটির নামজারি করে খাজনা পরিশোধ করি। ফ্ল্যাটের বিদ্যুতের মিটারের নাম পরিবর্তন করে ফ্ল্যাটের বিদ্যুৎ বিল, হোল্ডিং ট্যাক্স, সার্ভিস চার্জসহ যাবতীয় অন্যান্য বকেয়া বিলও পরিশোধ করি। এ ছাড়া গত বছরের ১৯ জুলাই মাতৃছায়া ফ্ল্যাট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়ে এখনো দায়িত্ব পালন করছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি ফ্ল্যাটটি কেনার আগে সেখানে ভাড়াটিয়া হিসেবে বসবাস করছিলেন কৃষিবিদ হোসনে আরা। সর্বশেষ ২০২২ সালের ৩ অক্টোবর ফ্ল্যাটটি ছেড়ে যাওয়ার মৌখিকভাবে কথা থাকলেও পরে তিনি ফ্ল্যাটটি নিজের বলে দাবি করেন। তাকে ফ্ল্যাটের বৈধ কাগজপত্র দেখাতে বললে আমাকে ও আমার কর্মচারীদের বিভিন্নভাবে হুমকি দেন। এ ঘটনায় হোসনে আরা ও তার স্বামীর বিরুদ্ধে একই বছরের ৬ ডিসেম্বর তেজগাঁও থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করি। জিডির পর তিনি আরও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। ক্ষমতার অপব্যবহার করে বিভিন্নভাবে হুমকি-ধমকি দেওয়া বাড়িয়ে দেন। এরপর পর্যায়ক্রমে থানায় আরও ছয়টি জিডি করি। সালিশের মাধ্যমে তাদের স্বামী-স্ত্রীকে বৈধ দলিল হাজির করতে বললে তারা ক্ষিপ্ত হয়ে খারাপ আচরণ করেন।’
মো. আব্বাস উদ্দিন (বিটু) আরও বলেন, ‘আমি অনেক আগেই সে সময় বিষয়টি নিয়ে হোসনে আরার বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স, কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ ২৩টি দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দিয়েও কোনো প্রতিকার পাচ্ছিলাম না। কারণ তিনি আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতাদের ক্ষমতার দাপট দেখাতেন। পরে বাধ্য হয়ে গত বছরের ২৮ মার্চ হোসনে আরার বিরুদ্ধে অবৈধ দখলদার উচ্ছেদের মামলা করি, যেটি বর্তমানে চূড়ান্ত শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে।’
ভবন ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালের জানুয়ারি মাসে ১ হাজার ১৫৮ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট কেনার জন্য ১০ লাখ টাকা দিয়ে বায়না দলিল করেন হোসনে আরা। তখন দলিলে বলা হয়, আগামী ছয় মাসের মধ্যে ফ্ল্যাটের নির্ধারিত বাকি মূল্য অর্থাৎ ৫০ লাখ টাকা পরিশোধ করে ফ্ল্যাটটির রেজিস্ট্রি করে নেবেন। চুক্তিতে আরও উল্লেখ থাকেন, যত দিন টাকা পরিশোধ না করবেন, তত দিন ফ্ল্যাটটির ভাড়া পরিশোধ করবেন। কিন্তু ফ্ল্যাটে ওঠার পর থেকে সার্ভিস চার্জ, বিদ্যুৎ বিল, পানির বিল ও সিটি করপোরেশনের ট্যাক্স না দিয়ে ৫ বছর ৫ মাস (৬৬) মাস ধরে বসবাস করছেন। সে হিসেবে ভাড়া বাবদ তার কাছে ১৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা পাওনা রয়েছে। বিষয়টি তার স্বামীকে জানালে তিনিও একই আচরণ করেন। এমনকি ওই দম্পতি ছাদ দখল করে ‘ছাদকৃষি, কিচেন কম্পোস্ট ও ড্রিপ ইরিগেশন প্রদর্শনী’ নাম দিয়ে কৃষি ব্যাংক থেকে ঋণও নিয়েছেন।
ওয়েস্টার্ন ভিউ ডেভেলপমেন্ট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সামছুজ্জামান বলেন, চুক্তিমতো হোসনে আরা পুরো টাকা পরিশোধ না করলে বায়না দলিলের সময় দেওয়া ১০ লাখ টাকা ফেরত নিয়ে ফ্ল্যাটটি বুঝিয়ে দিতে বলা হয়। তখন তিনি ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন লোকজনের নাম ভাঙিয়ে ভয়ভীতি দেখানো শুরু করেন। পরে মো. আব্বাস উদ্দিন (বিটু) নামে এক ব্যক্তির কাছে ফ্ল্যাটটি বিক্রি করে দেওয়া হয়। তিনিই বর্তমানে ফ্ল্যাটের বৈধ মালিক।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে হোসনে আরাকে দেশ রূপান্তর থেকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।