অর্থাভাবে চিকিৎসা নিতে পারছে না গুলিবিদ্ধ রাকিব

অধিকার আদায়ের জন্য বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে অংশ নিয়ে ছিলেন রাকিব। সেই আন্দোলনেই পায়ে গুলিবিদ্ধ হন তিনি। হারান পরিবারে চালানোর এক মাত্র অবলম্বন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকরিটাও। তারপর ২৫ দিন ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েও সুস্থ হতে পারেনি তিনি। অর্থাভাব চলে আসতে হয়েছে নিজ গ্রামে। ঝালকাঠি জেলার রাজাপুর উপজেলা স্থাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিতে হচ্ছে চিকিৎসা। তার চোখ মুখে আতঙ্কের ছাপ। ভয় কাটেনি এখনও।

জানা যায়, গত ১৯ জুলাই রামপুরা টেলিভিশন ভবনের সামনে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার আন্দোলনে যোগ দেওয়ার পর পায়ে গুলি লাগে রাকিবের। এরপর ঢাকার কয়েকটি হাসপাতালে চিকিৎসা করালেও এখনও সুস্থ হতে পারেনি রাকিব। পুরোপুরি সুস্থ হতে এখনও কয়েকমাস সময় লাগবে বলে জানিয়েছে চিকিৎসক। রাকিবের বাড়ি জেলার রাজাপুর উপজেলার ৬নং মঠবাড়ি ইউনিয়নের পুখুরিজনা গ্রামে।

রাজাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসারত রাকিব জানায়, ২০১৭ সালে এসএসসি পাস করার পর বরিশাল পলিটেকনিক কলেজে ভর্তি হয়ে ২০২১ সালে ডিপ্লোমা শেষ করি। এরপর পারিবারিক অসচ্ছলতার কারণে বিএসি তে ভর্তি না হয়ে ঢাকার একটি বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে চাকরি নেই।

গত ১৮ জুলাই সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে সারা দেশের শিক্ষার্থীরা যখন রাস্তায় নেমে আসে ঐদিন রাকিবও ছাত্রদের সাথে আন্দোলনে যোগ দেয় । এরপর ১৯ জুলাই অফিস থেকে আগে বেরিয়ে বিকাল পাচটায় বনশ্রী মোড়ে শিক্ষার্থীদের সাথে আন্দোলনে অংশ নেয় রাকিব। এসময় রামপুরার দিক থেকে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের লক্ষ করে একের পর এক গুলি ছুড়তে থাকে বিজিবি।  বিকেল সোয়া পাচটার দিকে হঠাৎ করে আমার বাম পায়ের হাটুতে গুলি লেগে বের হয়ে আমার পিছনে থাকা আর এক জনের পায়ে বিদ্ধ হয়। আমরা দুইজন রাস্তায় লুটিয়ে পড়লে আমাদেরকে আন্দোলনকারীদের মধ্য থেকে কয়েকজন প্রথমে বনশ্রীর ইউনিটি হাসপাতালে নেওয়া নেয়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আমাদেরকে চিকিৎসা দিতে অস্বীকৃতি জানায়।

এসময় আমাদের সাথে আগে পরে আরও বিশ থেকে পঁচিশজন আন্দোলনকারী গুলিবিদ্ধ হয়। পরে বনশ্রীর ভিতর দিয়ে আমিসহ গুলিবিদ্ধ সবাইকে মুগদা জেনারেল হাসপাতালে যখন নিয়ে যাওয়া হয় তখন রাত প্রায় আটটা বাজে। অনবরত রক্ত ক্ষরণে আমি অজ্ঞান হয়ে পরি। এরপর সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর রক্ত ক্ষরণ বন্ধ হলে আমার জ্ঞান ফিরে আসে। একটি তাজা বুলেট আমার বাম পায়ের হাটুর পাশ দিয়ে ঢুকে হাটুর পিছন দিয়ে বেরিয়ে যায়। ফলে আমার পায়ের পিছন দিকটাতে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি হয়। আমার জ্ঞান ফেরার পর মুগদা হাসপাতালের জরুরী বিভাগের চিত্র দেখে আমি আতঙ্কিত হয়ে পরি ।

রাকিব আরও জানায়, কেউ চিৎকার করছে কেউ বা নিস্তেজ হয়ে পড়ে রয়েছে। সেখানে প্রায় শতাধিক গুলিবিদ্ধ মানুষ এসেছে চিকিৎসা নিতে। আমার স্ত্রীকে কেউ খবর দিলে পরবর্তীতে তিনিও ছুটে এসেছেন হাসপাতালে। প্রাথমিক চিকিৎসার পর কর্তব্যরত ডাক্তার আমাকে ভর্তি না নিয়ে বাসায় চিকিৎসা নিতে বলে ও প্রতিদিন হাসপাতালে এসে ক্ষত পরিস্কারের জন্য বলা হয়।

রাকিব বলেন,মুগদা হাসপাতালের চিকিৎসা নিয়ে বনশ্রীর বাসায় আসার পর ৫ আগষ্ট পর্যন্ত বাসায় এক রকম পালিয়ে ছিলাম। কেননা পুলিশ তখন চারিদিকে ধর পাকড় করছে। বাসায় বাসায় হানা দিয়ে সন্দেহ হলেই তাকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে,গুলি করছে। এ অবস্থায় আমি বাসা থেকে বের হইনি। মাঝে মাঝে স্থানীয় ফার্মেসী থেকে লোক নিয়ে এসে ক্ষত পরিস্কার করাতাম। অফিসে আমি গুলিবিদ্ধ হওয়ার কথা জানালে কর্তৃপক্ষ আমাকে অফিস থেকে অব্যহতির কথা জানায়। ৫ আগষ্টের পর কয়েকদিন হাসপাতালে ক্ষত পরিষ্কার করিয়েছি।

তিনি জানান, বাসা থেকে মুগদা হাসপাতাল রিকশা ভাড়া আপ ডাউন তিনশত টাকার নিচে হয়না। তার পরে ইনজেকশন,ঔষধ,খাওয়া দাওয়া, ঘরভাড়া। এর মধ্যে আবার চাকরি নেই, তাই বাধ্য হয়ে বাড়ি চলে এসেছি।

রাকিবের স্ত্রী তাহসিনা জান্নাত মুন বলেন, মঙ্গলবার দুপুরে ঢাকা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মুশফিকুর রহমান নামে এক নেতা আমাকে ফোন করেছিলেন। তিনি বলেছেন, রাকিবকে ঢাকায় নিয়ে যেতে। তারা ওর চিকিৎসার সব খরচ বহন করবে। কিন্তু ঢাকা গিয়ে আমরা কোথায় থাকব? কি খাব? এখন তো ওর চাকরিও নেই। তাছাড়া ঢাকায় যাওয়া আসার মতো খরচও আমাদের কাছে নেই। তাই বাধ্য হয়েই এখানে থেকে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। এখানকার টিএইচও রাসেল স্যার ওনাকে দেখেছেন এবং তিনিই ওর চিকিৎসা করছেন।

এদিকে আন্দোলনে যোগ দিয়ে আহত স্থানীয় বরইয়া ডিগ্রি কলেজের ডিগ্রি তৃতীয় বর্ষের ছাত্র ঈমন সিকদার রাজাপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। ঈমন আন্দোলন শুরু হলে রাজাপুর থেকে ঢাকায় গিয়ে ঢাকা কলেজের ওর বন্ধুদের সাথে আন্দোলনে যোগ দেয়।

ঈমন জানায়,১৮ জুলাই থেকে আন্দোলনে যোগ দিলেও ৩১ জুলাই ঢাকার যাত্রাবাড়িতে পুলিশের সাথে থাকা ছাত্রলীগের ছুড়া ইটের আঘাতে তার ডান পা গুরুতর ভাবে আঘাত প্রাপ্ত হয়। এরপর বন্ধুরা তাকে স্থানীয় একটি ফার্মেসীতে নিয়ে ক্ষত পরিস্কার করে বাসায় পৌছে দিলেও পরের দিন থেকে পায়ে প্রচন্ড যন্ত্রনা শুরু হয়ে পা ফুলে যায়। এরপর পচন ধরে তার ডান পায়। পরবর্তিতে হাসনাবাদের জনসেবা ক্লিনিকে চিকিৎসা নেওয়ার পরেও পায়ের পচন আরও বাড়তে থাকে। কোনো উপায়ন্ত না পেয়ে ইমন চলে আসে বাড়িতে এবং ভর্তি হয় রাজাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। ঈমনের বাড়ি রাজাপুর সদর ইউনিয়নের ছোট কৈবর্তখালী গ্রামে।

রাজাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য কর্মকর্তা আবুল খায়ের মাহমুদ রাসেল বলেন, ‘রাকিবের পায়ে গুলি ও ঈমনের পায়ে ইটের আঘাতে গভীর ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে। ওদের দুজনের পায়েই ইনফেকশন রয়েছে তবে ঈমনের ইনফেকশন গুরুতর। দুজনেরই এন্টিবায়োটিক ও ইনজেকশন চলমান রয়েছে। আমরা সাতদিন পরপর এন্টিবায়োটিক ও ইনজেকশন পাল্টিয়ে দিচ্ছি। সুস্থ্য হতে ওদের আরও বেশ কিছুদিন সময় লাগবে।’