লুঙ্গি দিয়ে পেট থেকে শুরু করে দুই পায়ের হাঁটু পর্যন্ত ঢাকা। দুই পা প্যারালাইজড (অবশ), নড়াচড়া নেই। পেটে, হাতে ও গলায় গুলির চিহ্ন। যেন কোনো নিথর মরদেহ পড়ে আছে হাসপাতালের শয্যায়। এ চিত্র বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে গিয়ে পুলিশের গুলিতে আহত হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন কলেজছাত্র খালেদ মাহমুদ সুজনের (২১)। চিকিৎসকরা বলছেন, গুলিতে তার যকৃৎ (লিভার) ছিদ্র হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি পা দুটিও প্যারালাইজড হয়ে গেছে। সুজনের বেঁচে থাকাটাই কঠিন হয়ে উঠেছে। আর বেঁচে গেলেও স্বাভাবিক কর্মজীবনে ফেরা হবে না তার।
সুজন লক্ষ্মীপুর সরকারি কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী। গত ৪ আগস্ট কলেজের বন্ধুদের সঙ্গে বের হয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কর্মসূচিতে যোগ দেন। একপর্যায়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে রাস্তায় পড়ে থাকেন তিনি। শরীরে গুলি লাগে আটটি, এর মধ্যে তিনটি পেটে, দুটি গলায় ও তিনটি লাগে হাতে।
স্বজনরা জানান, পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী ব্যক্তি ছিলেন সুজন। হাসপাতালে শয্যাশায়ী এই কলেজছাত্র এখন নিজে থেকে কিছুই করতে পারছেন না। শুধু চোখ বুজে শুয়ে থাকেন, শরীরের ব্যথায় দুচোখ দিয়ে পানি ঝরে। আর বাড়িতে থাকা বাবা-মা ও ভাইদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবেন। কীভাবে চলবে সংসার, কেমন হবে হাসপাতাল-পরবর্তী জীবন।
তিন ভাইয়ের মধ্যে সুজন দ্বিতীয়। বাবা শাহিন কাদের ও বড় ভাই সোহান হোসেন বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী। আর ছোট ভাই শিহাব হাসান লক্ষ্মীপুর টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী। সুজন লেখাপড়ার পাশাপাশি একটি দোকানে চাকরি করতেন। বেতনের সেই সামান্য টাকায় নিজের ও পরিবারের খরচ চালাতেন। কিন্তু এখন হাসপাতালের শয্যায় দিন কাটছে সেই সুজনের। উঠতে বসতেও পারেন না। খাওয়া থেকে শুরু করে সবকিছুই অন্যদের সহায়তায় করতে হচ্ছে। যার উপার্জনের টাকায় সংসার চলত তার এই করুণ দশা দেখে পরিবারের অন্য সদস্যরাও মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন।
গত রবিবার ঢামেক হাসপাতালের জরুরি বিভাগের ১০১ নম্বর ওয়ার্ডের ৩ নম্বর বেডের পাশে মাথা নিচু করে বসে থাকতে দেখা যায় সুজনের ছোট ভাই শিহাবকে। ভাইয়ের অবস্থা জানতে চাইলে কান্নাজড়িত কণ্ঠে শিহাব বলেন, ‘লক্ষ্মীপুর সদরের চররোহিতা আমাদের বাড়ি। গত ৪ আগস্ট ভাই ছাত্র আন্দোলনে যান। ওই সময় পুলিশ আমার ভাইকে গুলি করে। একটি গুলি খাওয়ার পরে রাস্তায় পড়ে গেলে তাকে আরও সাতটি গুলি করা হয়। পরে আন্দোলনরত লোকজন ভাইকে হাসপাতালে নিয়ে যান। প্রথমে যে অবস্থা আমরা দেখছি, তাতে ভেবেছিলাম বাঁচবে না। আল্লাহ আমার ভাইকে বাঁচিয়ে রেখেছে তাতেই আলহামদুলিল্লাহ।’
শিহাব আরও বলেন, ‘আমার ভাই পড়ালেখার পাশাপাশি চাকরি করে আমাদের চালাত। এখন ভাইয়ের এই অবস্থা। কীভাবে সংসার চলবে জানি না। আমার লেখাপড়াও আদৌও আর করতে পারব কি না তাও বলতে পারছি না। ভাইয়ের ইচ্ছা ছিল সবাইকে নিয়ে ভালো থাকার। ভাই বলছিল, যখন প্রথম গুলি লাগে, তখন কলেমা পড়েছে। আর চিন্তা করছিল কীভাবে চলবে আমাদের পাঁচজনের এই পরিবারটি। কে চালাবে এই সংসার।’
শিহাব জানান, এরই মধ্যে কয়েকটি অস্ত্রোপচার (অপারেশন) হয়েছে সুজনের শরীরে। একটি গুলি বের করা হয়েছে শরীর থেকে। তাদের বাড়িতে সম্পদ বলতে তেমন কিছু নেই, ধার-দেনা করে সুজনের চিকিৎসার খরচ জোগানো হচ্ছে। এখন পর্যন্ত প্রায় দেড় লাখ টাকার মতো খরচ হয়েছে। শিহাব বলেন, ‘আরও কত টাকা লাগে জানি না। ভাইয়ের বাকি চিকিৎসা সঠিকভাবে করাতে পারব কি না তাও বলতে পারছি না।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওয়ার্ডটির একজন নার্স দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘খালেদ মাহমুদ সুজন এখানে প্রায় ১০দিন ধরে চিকিৎসাধীন। কয়েকটি অপারেশন করা হয়েছে। তবে দুই পা প্যারালাইজড ও লিভার ছিদ্র হওয়ায় তার অবস্থা আশঙ্কজনক।’
তিনি আরও বলেন, ‘ঢামেকে আন্দোলনে গুলিবিদ্ধদের এখন চিকিৎসা সম্পূর্ণ ফ্রি করা হয়েছে। শুধু প্রয়োজনীয় ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে হয়।’
