আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছর কোনো কিছু লেখার আগে বা কোনো মন্তব্য করার আগে ভাবতে হতো, এটা সরকারের বিপক্ষে যাচ্ছে না তো! যদি বিপক্ষে যেত, তাহলে ভয় কাজ করত। কখন যেন সাদা পোশাকের লোকজন ডিবি পরিচয় দিয়ে তুলে নিয়ে যায়। তুলে নিয়ে তারা গুম বা অপহরণের মতো নাটক সাজাতেন। অজানা স্থানে নিয়ে কিছু দিন নির্যাতন করতেন। পরে উন্মুক্ত স্থানে ফেলে রেখে যেতেন। কিংবা মামলায় গ্রেপ্তার দেখাতেন। আবার গ্রেপ্তারের পর রিমান্ডে চলত নির্যাতন। যারা ঘরে ফিরতেন, তারা মুখে কুলুপ এঁটে বসে থাকতেন। কে তুলে নিয়েছিল, কোথায় রেখেছিল, সেখানে তারা কী করেছে, কী খেতে দিয়েছে, কোথায় ঘুমাতে দিয়েছে, কত টাকা মুক্তিপণে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে কোনো বিষয়েই মুখ খুলতেন না। ফলে এসব জানার উপায়ও ছিল না। এ রকম অসংখ্য ঘটনা ঘটেছে গত ১৫ বছরে। আলোকচিত্রী ও দৃক গ্যালারির প্রতিষ্ঠাতা ড. শহিদুল ইসলাম এবং ফটো সাংবাদিক শফিকুল ইসলাম কাজলের কথা নিশ্চয়ই আমাদের মনে থাকবে।
২০১৮ সালের আগস্টে নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে রাজধানীর জিগাতলা এলাকায় সংঘর্ষ হয়। এ সময় বেশ কয়েকবার ফেসবুক লাইভে সংঘর্ষ নিয়ে কথা বলেন শহিদুল আলম। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি সরকারের সমালোচনা করেন। এরপর শহিদুল আলমকে তার বাসা থেকে নিয়ে যায় গোয়েন্দা পুলিশ। রাতে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়। মামলায় তার বিরুদ্ধে ফেসবুক ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় সরকারের বিরুদ্ধে অপপ্রচার এবং শিক্ষার্থীদের আন্দোলন নিয়ে মিথ্যা তথ্য দিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করার অভিযোগ আনা হয়। প্রায় ৩ মাস কারাভোগের পর জামিনে মুক্তি পান আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আলোকচিত্রী শহিদুল আলম।
ফটোসাংবাদিক শফিকুল ইসলাম কাজল নিখোঁজ হওয়ার ৫৩ দিন পর গভীর রাতে যশোর বেনাপোল সীমান্তের একটি মাঠ থেকে তাকে উদ্ধার করার কথা বলা হয়েছিল পুলিশের পক্ষ থেকে। তখন এই সাংবাদিককে দুই হাত পেছনে দিয়ে হাতকড়া লাগিয়ে আদালতে নেওয়ার ছবি ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি করেছিল। এরপর থেকে তিনি কারাগারে ছিলেন। তবে তিনি নিখোঁজ হওয়ার আগেই তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের একজন সংসদ সদস্য সাংবাদিক কাজলের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করেছিলেন ঢাকার শেরেবাংলা নগর থানায়। এছাড়া যুব মহিলা লীগের দুজন নেত্রীও তার বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে দুটি মামলা করেছিলেন। প্রয় ৯ মাস কারাভোগের পর উচ্চ আদালত থেকে জামিনে মুক্তি পেয়েছিলেন তিনি।
ফলে গত ১৫ বছর সাংবাদিক হিসেবেও ঘটনা তুলে ধরা বা মতপ্রকাশের সুযোগ ছিল না বললেই চলে। শুধু তাই নয়, পত্রিকা বা গণমাধ্যমগুলোর কর্তাব্যক্তিরাও ভয়ে থাকতেন। কোনো লেখা বা মত না আবার তার মিডিয়ার ওপর খড়গ টেনে আনে। দেখা যাবে, কেউ ফোন দিয়ে বলছে এটা লেখা হলো কেন? এরপর বিজ্ঞাপন বন্ধ। এতে মিডিয়ার মালিক বা কর্তারা সব সময়ই জবাবদিহির মধ্য দিয়ে গেছেন। এমনও শুনেছি কোনো নিউজ বা লেখা প্রকাশের পর সরকারের বিভিন্ন দপ্তর থেকে এডিটরদের গালাগাল পর্যন্ত করা হয়েছে। সাধারণের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা যেমন ছিল না, তেমনি বিরুদ্ধ মতের খড়গ ভুগিয়েছে অনেক নামিদামি লোকদেরও। সাংবাদিকরা মূলত ঘটনা তুলে ধরে বা সরকারের ভুলভ্রান্তি ধরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। ফলে সরকারে যারাই থাকুন না কেন, সংবাদ মাধ্যমের বা সাংবাদিকদের টুঁটি চেপে ধরবেন না। শুধু তোষামদ শুনলে আপনি বুঝবেন কী করে জনগণ আপনাকে কতটা ভালোবাসে বা কতটা অপছন্দ করে?
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে মতপ্রকাশের অধিকার থাকতে হয়। বাংলাদেশ সংবিধানের ৩৯ নম্বর অনুচ্ছেদ বলে বাকস্বাধীনতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়। বাংলাদেশে সংবিধানের ৩৬, ৩৭ ও ৩৮ নম্বর অনুচ্ছেদে যথাক্রমে চলাফেরার স্বাধীনতা, সমাবেশের স্বাধীনতা ও সংগঠনের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। ৩৯ ধারায় চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা এবং বাক-স্বাধীনতার বিষয়ে বলা হয়েছে, (১) চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতার নিশ্চয়তাদান করা হইল। (২) রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, বিদেশি রাষ্ট্রসমূহের সহিত বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, জনশৃঙ্খলা, শালীনতা ও নৈতিকতার স্বার্থে কিংবা আদালত-অবমাননা, মানহানি বা অপরাধ-সংঘটনে প্ররোচনা সম্পর্কে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসংগত বাধানিষেধ-সাপেক্ষে (ক) প্রত্যেক নাগরিকের বাক ও ভাবপ্রকাশের স্বাধীনতার অধিকারের এবং (খ) সংবাদক্ষেত্রের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দান করা হইল।
সংবিধানের এই ধারাগুলো মানুষের মৌলিক অধিকার হিসেবে লিপিবব্ধ আছে। তবে বাকস্বাধীনতার বিষয়ে খেয়াল রাখতে হয়, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, বিদেশি রাষ্ট্রসমূহের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, জনশৃঙ্খলা, শালীনতা ও নৈতিকতার স্বার্থে কিংবা আদালত-অবমাননা, মানহানি বা অপরাধ-সংঘটনে প্ররোচনা সম্পর্কে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসংগত বাধানিষেধের বিষয়গুলো। ফলে বোঝা যায়, বাকস্বাধীনতা মানে যা ইচ্ছা তাই বলা নয়। তেমনি ৩৭ ধারার সমাবেশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রেও বলা হয়েছে জনশৃঙ্খলা বা জনস্বাস্থ্যের স্বার্থে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসংগত বাধানিষেধ-সাপেক্ষে শান্তিপূর্ণভাবে ও নিরস্ত্র অবস্থায় সমবেত হইবার এবং জনসভা ও শোভাযাত্রায় যোগদান করিবার অধিকার প্রত্যেক নাগরিকের থাকিবে। কিন্তু বিগত সরকারের সময়ে তা মানা হয়নি। দেখা গেছে, শান্তিপূর্ণ সমাবেশেও সরকারের দমন নিপীড়ন ছিল। এক্ষেত্রে বলা যায়, বিগত সরকার সংবিধানের ৩৭ ও ৩৮ ধারা ভঙ্গ করেছে।
Universal Declaration of Human Rights (1948)-Article 19 -এ বলা হয়েছে ‘প্রত্যেকের মতপ্রকাশের স্বাধীনতার অধিকার রয়েছে; এই অধিকারের মধ্যে রয়েছে হস্তক্ষেপ ছাড়াই মতামত ধারণ করার এবং যেকোনো মাধ্যমে তথ্য ও ধারণা খোঁজা, গ্রহণ এবং প্রদানের স্বাধীনতা থাকবে। অর্থাৎ আইনের ধারা মেনে কিছু বলা এবং প্রকাশ করলে তাতে রাষ্ট্র বা কেউ বাধা দিতে পারবে না। এটা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, আমাদের দেশে এ রীতি মানা হয় না।
আওয়ামী লীগ সরকারের বিদায়ের পর অন্তর্বর্তী সরকার এখন বাংলাদেশে। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়েছে। ছাত্র-জনতার বিস্ফোরণে নতুনভাবে দেশ গঠনের প্রক্রিয়া চলছে। লক্ষ করা গেছে, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে নানা সংগঠন প্রতিষ্ঠান সংস্থার লোকজন সবাই দাবি আদায়ে সোচ্চার হয়ে উঠেছে। দীর্ঘদিনের বঞ্চনার ফলে এমনটি হওয়া অযৌক্তিক নয় বটে আবার অযৌক্তিক দাবি যে উঠছে না তাও কিন্তু নয়। সমস্যা হলো যারা অযৌক্তিক দাবি তুলছে, রাস্তা অবরোধ করে বিক্ষোভ করছে, নিরাপত্তাব্যবস্থা উপেক্ষা করে ঢুকে পড়ছে সরকারি অফিসে, তাদের বিষয়ে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করি। কারণ দাবি আদায়ের নামে বড় কোনো নাশকতার পরিকল্পনা থাকলে, তা ঠেকানো মুশকিল হবে।
ছাত্রদের ঘাড়ে বন্দুক রেখে কেউ নাশকতা করার চেষ্টা করলে আর ছাত্র ভেবে ছাড় দেওয়া হলে, তবে যেকোনো সময় অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটার সুযোগ তৈরি হতে পারে। যেমন স্থগিত এইচএসসি পরীক্ষা বাতিলের দাবিতে একদল ছাত্র সচিবালয়ের নিরাপত্তা ভেঙে ঢুকে পড়েন সচিবালয়ে। এ সময় যে কোনো অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটার সুযোগ তৈরি হয়েছিল। হয়তো এ আশঙ্কা থেকেই দ্রুত তাদের দাবি মেনে সচিবালয়ের অঙ্গন থেকে তাদের সরানো হয়েছিল। যদিও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের দুই সমন্বয়ক এখন উপদেষ্টা পদে আছেন। তাদের এগিয়ে আসতে দেখা যায়নি এই পরিস্থিতিতে। এইচএসসির শিক্ষার্থীদের এই দাবির সঙ্গে তারা একাত্মতা পোষণ করেছিলেন কি না তা এখনো আমরা জানি না। ফলে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারকে ব্যবহার করে যে কেউ যে কোনো কিছু চাইলে এবং তা মেনে নিতে বাধ্য করলে তা বর্তমান সরকারকেই সমালোচনা এবং বিতর্কের মুখে ফেলবে। যেটা কাম্য নয়। এ কারণে এ ধরনের পরিস্থিতি সেটা যেখানেই ঘটুক বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের এগিয়ে আসা উচিত এবং তাদের মাধ্যমেই সংকটের সমাধানের জন্য সরকারের কাছে আবেদন যাওয়া উচিত। এতে অন্তত বিশৃঙ্খলা কিংবা অনাকাক্সিক্ষত কোনো ঘটনার সুযোগ থাকবে না। চেষ্টা থাকলেও তারা তা প্রতিহতের চেষ্টা করবেন।
অনেকে বলেন, আগে তো আওয়ামী লীগের কোনো নীতির ভিন্নমত পোষণ করলে রোষানলে পড়তে হতো। বর্তমানে বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের কোনো সিদ্ধান্ত বা নীতির বা কাজের ভিন্নমত পোষণ করলে, তাদের আবরণে অন্য কারও আক্রমণের শিকার হতে হয় কি না সে ভয়ে থাকতে হয়। আগে তো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাধ্যমে দমন নিপীড়ন হতো। ফলে তাদের চিহ্নিত করা যেত। এখন ছাত্র-জনতার ব্যানারে এসে কেউ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করলে তার তো কোনো বিচার পাব না। এ কারণে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নেতৃস্থানীয়দের সতর্ক হতে হবে তাদের স্বার্থেই। কেউ ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। ভুল করলে ভুল ধরিয়ে দেওয়ার সুযোগ থাকতে হবে। ভুল শোধরাবেন কি না সেটা আপনার একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়। কিন্তু তার জন্য প্রতিহিংসাপরায়ণ হওয়া যাবে না। না হলে কিন্তু এতগুলো প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত সাফল্য ম্লান হয়ে যেতে পারে।
লেখক: সাংবাদিক ও সংবাদ বিশ্লেষক
zakpol74@gmail.com