রাজধানীতে যানজট ও দুর্ঘটনার নতুন ঝুঁকি সৃষ্টি করছে অবৈধ ব্যাটারিচালিত রিকশা। ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে ঢিলেঢালা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সুযোগে এসব যান গলির রাস্তা থেকে প্রধান সড়কে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, আইন অনুযায়ী ব্যাটারিচালিত রিকশা কোনো যানবাহনের মধ্যেই পড়ে না, তাদের রাস্তায় ওঠা তো দূরের কথা। কিন্তু এই গাড়ির সংখ্যা এত পরিমাণ যে, তা বন্ধ করাও সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে ব্যাটারিচালিত রিকশার জন্য আইন জরুরি। তখন সেই আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যাবে বলে জানান তিনি।
গত সোমবার ব্যাটারি ও প্যাডেলচালিত রিকশাচালকদের পাল্টাপাল্টি বিক্ষোভ হয়েছে। সেখানে প্রধান সড়কে ব্যাটারিচালিত রিকশা বন্ধের দাবি জানিয়েছেন প্যাডেলচালিত রিকশাচালকরা। অন্যদিকে সড়ক-মহাসড়কে ব্যাটারিচালিত রিকশা চালানোর দাবি জানান ব্যাটারিচালিত রিকশাচালকরা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীতে প্রায় দুই লাখ ব্যাটারিচালিত রিকশা অবৈধভাবে চলাচল করছে। এগুলোর জন্য একদিকে যেমন বিদ্যুৎ অপচয় হচ্ছে, অন্যদিকে অদক্ষ চালক ও বেপরোয়া চলাচলের কারণে দুর্ঘটনা ঘটছে। এসব যান এত দিন শক্তিশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে চলত। গত মে মাসে তখনকার আওয়ামী লীগ সরকারের সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সড়কে ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল করতে পারবে না বলে ঘোষণা দেন। এরপর চালক ও মালিকদের সড়ক অবরোধ এবং এর জের ধরে সংঘর্ষের পর ঘোষণাটি প্রত্যাহার করা হয়। বলা হয়, শুধু গলির রাস্তায় ব্যাটারিচালিত রিকশা চালানো যাবে। কিন্তু প্রধান সড়কে আসতে পারবে না। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ব্যাটারিচালিত রিকশাচালকরা সেটা মানছেন না।
সরেজমিনে রাজধানীর গুলিস্তান, পল্টন, শাহবাগ, বাংলামোটরসহ গুরুত্বপূর্ণ সব সড়কে ব্যাটারিচালিত রিকশা দেখা যায়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সামনেই এসব অবৈধ যান সড়ক দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। ফলে আগের থেকে নতুন করে যানজট আরও বাড়তে দেখা যায় সড়কে।
একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত মো. জয়নাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হঠাৎ করেই শহরে ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল বেড়ে গেছে। দুদিন আগেও একটি আমার মোটরসাইকেলকে ধাক্কা দিয়েছে। অল্পের জন্য দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে গেছি। তা ছাড়া কিছু কিছু ব্যাটারিচালিত রিকশা মোটরসাইকেলের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলতে চায়। যার জন্য প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা।’
পল্টন এলাকায় হাশেম নামের এক প্যাডেলচালিত রিকশাচালক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এই ব্যাটারিচালিত রিকশার জন্য আমাদের আয় অর্ধেক কমে গেছে। তাদের কারণে আমরা খেপ পাই না। যেসব জায়গার ভাড়া আমরা ৬০ টাকা পেতাম, সেগুলো তারা ৩০ টাকায় নিয়ে যাচ্ছে। ফলে আমাদের রিকশায় যাত্রীরা না উঠে তাদের রিকশায় চলে যাচ্ছেন।’
ব্যাটারিচালিত রিকশাচালক নাজিম মিয়া বলেন, ‘এত দিন অলিগলিতে চালাতাম। এখন সবাই প্রধান সড়কে উঠে চালায়। আমিও চালাচ্ছি। প্যাডেলচালিত রিকশা চালানো খুব কষ্ট। এ কারণে ওই রিকশা চালাই না।’
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা কেন্দ্রের সাবেক পরিচালক ড. হাদিউজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ব্যাটারিচালিত যানের জন্য সড়কে একদিকে যেমন বাড়ছে যানজট, তেমনি দুর্ঘটনার নতুন হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। আগে শাখা সড়কে এসব যান চলাচল করলেও এখন প্রধান সড়কে চলাচল করছে। মূলত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দুর্বলতার সুযোগ কাজে লাগিয়ে এরা বেপরোয়া হয়ে গেছে। তাদের জন্য রাজধানীর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাও নষ্ট হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, দ্রুত এই ব্যাটারিচালিত যানের চালকদের লাগাম টানতে হবে। তাদের কোনো অবস্থায় মূল সড়কে চলাচল করতে দেওয়া ঠিক হবে না। তা ছাড়া শাখা রুটে চলাচল করলে সেখানেও একটি নীতিমালা করে দেওয়া দরকার। তা না হলে সড়কে শৃঙ্খলা ফিরবে না বলে জানান এই বিশেষজ্ঞ।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, কয়েক মাস আগেও এত ব্যাটারিচালিত রিকশা ছিল না প্রধান সড়কে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঢিলেঢালা হওয়ায় এসব অবৈধ রিকশা বেড়েছে। সরকারের উচিত এ বিষয়ে কঠোর মনিটারং করা।