বন্যা দেশের বিভিন্ন প্রান্ত ঘিরে ধরেছে। প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্তে বন্যার্ত জনগণের অসহায় দৃশ্য দেখি। অসহায়ে মুষড়ে পড়ি। প্রতি বছর কোথাও না কোথাও বন্যা হচ্ছেই। মাত্র এক কী দেড় মাস আগে হয়ে গেল সিলেট-সুনামগঞ্জে বারবার, কয়েকবার। এখন হচ্ছে কুমিল্লা, ফেনী, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুরসহ সেই অঞ্চলের বিভিন্ন জায়গায়। এবারের বন্যাটা এসেছে হঠাৎ। কোনো আগাম বার্তা জানায়নি বাংলাদেশের আবহাওয়া দপ্তর বা বন্যা সতর্কীকরণ কেন্দ্র! সত্যিই কি কোনো বার্তা ছিল না এই সর্বনাশা বন্যার? এ বিষয়ে আবহাওয়া ও জলবায়ু বিষয়ে পিএইচডি গবেষক এবং কানাডার সাসকাচুয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মোস্তফা কামাল পাশার মন্তব্য সামনে আনা যায়। তিনি লিখেছেন, ‘সর্বশেষ আগস্ট মাসের ১৫ তারিখ পর্যন্ত তথ্যে আমেরিকার আবহাওয়া সংস্থা ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোসফেরিক অর্গানাইজেশন জানায়, পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে এখন নিরপেক্ষ অবস্থা বিরাজ করছে। যেহেতু কিছুদিন আগেই মারাত্মক শক্তিশালী এল-নিনো ঘটেছিল সুতরাং এবার বাংলাদেশে বড় বড় আকারের বন্যা হতে পারে, সেটা আগে থেকেই অনুমেয় ছিল। আমি কয়েক মাস আগে থেকেই পূর্বাভাসে বলেছি, এ বছর বাংলাদেশে স্বাভাবিকের চেয়ে বড় আকারের বন্যা হবে। বারবার সতর্ক করার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমার কথা শোনা হয়নি। বাংলাদেশে বন্যা হতে যাচ্ছে, এটা এক প্রকার নিশ্চিত ছিল।’
তাহলে! কেন আমরা বুঝতে পারিনি? বা বুঝতে চাইনি কেন? ভৌগোলিকভাবে আমাদের দেশের অবস্থান এমন এক জায়গায়, উভয় সংকটে। উজানে বিশাল ভারতের জল সাম্রাজ্যের প্রভাব, সমুদ্রের দিকে ঝড় জলোচ্ছ্বাসের আগ্রাসন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগে, সত্তরের প্রলয়ংকরী ঝড়ে ভোলা-মনপুরা এলাকায় কয়েক লাখ মানুষ জীবন হারিয়েছিল।
ইতিমধ্যে গড়ে উঠেছে বন্যা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনার বিশেষ সংস্থা। বন্যার পর বা বন্যার মধ্যে স্বেচ্ছাসেবক দল বন্যার্ত জনতার পাশে দাঁড়ায়। কিন্তু আবহাওয়া সতর্কীকরণ ব্যবস্থা বড়ই দুর্বল। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির এই আধুনিক সময়ে আমাদের আবহাওয়ার পূর্বাভাসে কেন এত দরিদ্র? কেন উন্নত আবহাওয়া নিরীক্ষণ ও পর্যবেক্ষণের যন্ত্রপাতি আনা হচ্ছে না? কেন অন্যের ওপর নির্ভর করতে হয়? বছরের পর বছর যখন বন্যা হয়, সেই অভিজ্ঞতার নিরিখে বন্যা পর্যালোচনা করা যায় না কেন? এই দুর্বলতা কার!
‘নেদারল্যান্ডস প্রায় সমুদ্রের মধ্যে একটি দেশ। কিন্তু বন্যা প্রতিরোধে অবাক সফল। পরিসংখ্যান মতে, নেদারল্যান্ডসের বর্তমান ভূ-ভাগের ১৭ ভাগ হচ্ছে সমুদ্র, হ্রদ থেকে উদ্ধারকৃত জমি (রিক্লেইমড ল্যান্ড)। নেদারল্যান্ডসের ৬০ ভাগ জায়গা বন্যাপ্রবণ। আর বাংলাদেশের ৮০ ভাগ ভূ-ভাগ বন্যাপ্রবণ সমতল এলাকায়, বাকি ৮ ভাগ এবং ১২ ভাগ হচ্ছে যথাক্রমে অসমতল উঁচু-নিচু এলাকা এবং পাহাড় এলাকা। চট্টগ্রাম এবং সিলেট ব্যতীত দেশের অধিকাংশ এলাকা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে মাত্র ১১ মিটারের ওপরে। উপকূলীয় এলাকায় এ উচ্চতা আরও কম, মাত্র ১ মিটার হতে ২ মিটার। বন্যা নিয়ন্ত্রণ তথা পানি ব্যবস্থাপনা ডাচ জনগণের ঐতিহ্য ও রক্তে মিশে আছে। তারা সুদীর্ঘকাল থেকে শিখেছে কীভাবে বন্যাকে নিয়ন্ত্রণ করে এর সঙ্গে সাযুজ্য করে টিকে থাকা যায়। ডাচ সরকার ও তাদের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো একযোগে কাজ করে বড় বড় সব নদী এবং সাগরের জলরাশিকে নিয়ন্ত্রণ করে ফেলেছে। এ জন্য পোল্ডার, ডাইক, স্লুইসগেট এবং ছোট ছোট অসংখ্য লেক, শাখা নদী, জলাধার নির্মাণ করে পানি প্রবাহকে গতিশীল ও নিয়ন্ত্রণাধীন রাখা হয়েছে। অনেক জায়গায় নদীকে ড্রেজিং করে এর গতিশীলতা বাড়ানো হয়েছে, আবার অনেক জায়গায় অতিরিক্ত পানির প্রবাহ যাতে বন্যার সৃষ্টি না করে সে জন্য উইন্ডমিল ও শক্তিশালী পাম্প স্থাপন এবং বিদ্যমান নদীর পাশে আরেকটি নদী খনন করে পানি সংরক্ষণ ও পানি প্রবাহের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে। এর সবই করা হয়েছে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে।’
তাহলে আমরা আমাদের সীমাবদ্ধতা বুঝতে পারছি। প্রতি বছর বাংলাদেশ বন্যায় নিমজ্জিত হবে, মানুষ মরবে। তারপরও আধুনিক যুক্তিসংগত বন্যা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে পারিনি। যখনই বন্যা হয়, লাখ লাখ জনতার জীবন বিপন্ন হয়ে ওঠে, ভেসে যায় ফসলের মাঠ, পুকুরের মাছ, গবাদি পশু। আমরা আর্তনাদ করি, স্বজন হারানোর বেদনায় মুহ্যমান হই। তথাকথিত নেতারা ত্রাণ নিয়ে যায়, ছবি তোলে, আমাদের দায়িত্ব শেষ। কিন্তু বাংলার মানুষ প্রাণের শক্তিতে পরিপূর্ণ। ফলে, সব ধরনের অভিশাপ মাথায় নিয়ে নতুন করে ঘুরে দাঁড়ায়। বারবার বাংলার মানুষ প্রমাণ করেছে, বন্যার সব সর্বনাশ অতিক্রম করে ফিনিক্স পাখির মতো তারা জেগে ওঠে।
এবারের বন্যায় একটা অভিযোগ শোনা যায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে, এই বন্যার জন্য নাকি ভারত দায়ী! ভারতের ত্রিপুরার ডুম্বুর বাঁধ ছেড়ে দেওয়ায় বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যার সৃষ্টি হয়েছে। এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা কী বলেন? আবার ফিরে যাই মোস্তফা কামাল পাশার কাছে। একই লেখায় তিনি লেখেন, ‘ভারত বাঁধের পানি ছেড়ে দেওয়ায় বাংলাদেশে বন্যা হয়েছে, এই দাবি পুরোপুরি সত্য নয়। ভারতের ডুম্বুর বাঁধ যদি হঠাৎ খুলে দেওয়া হয়, তাহলে আগে ক্ষতিগ্রস্ত হবে ত্রিপুরার নিম্নাঞ্চল। পুরো অঞ্চলে ব্যাপক বৃষ্টিপাতের ফলে আগে ত্রিপুরা বন্যাকবলিত হয়েছে এবং ঢালুপথে সেই পানি বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। একই সঙ্গে ভারতের উঁচু ভূমি থেকে নেমে আসা পানি এবং বাংলাদেশের ফেনী, নোয়াখালী, কুমিল্লা অঞ্চলে হওয়া ব্যাপক বৃষ্টি দুইয়ে মিলে এই অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি করেছে।’
বাংলাদেশের আবহাওয়াবিদরা তো বড় বড় পদে থাকেন। সরকারের বিচিত্র ধরনের সুবিধা ভোগ করে থাকেন। সমস্যা হলো, সঠিক সময়ে আবহাওয়ার পূর্বাভাস যথাযথভাবে দিতে পারছেন না। মোস্তফা কামাল পাশা নিজে এই পরিস্থিতির আপডেট দিয়েছেন তার ওয়েবসাইটে। কিন্তু বাংলাদেশের আবহাওয়াবিদরা তা দেখেননি, অথবা দেখলেও গ্রাহ্য করেননি। নিট ফলাফল হলো, বাংলাদেশের প্রায় এক কোটি মানুষ বন্যায় মর্মান্তিকভাবে পানির তোড়ে ভেসে যাওয়ার উপক্রম হলো।
বাংলাদেশে বা পৃথিবীতে যখন কোনো ট্রেন্ড তৈরি হয়, তার বিপরীতে লেখা অনেকটা কঠিন হয়ে যায়, নির্মম সত্য হলেও। এখন ভারতবিরোধিতার একটা হুজুগ চলছে। মনে রাখা দরকার, রাষ্ট্র কোনো পুতুল বা কাগজের ঠোঙ্গা নয়, যা চাইলেই আপনি ছিঁড়ে ফেলতে পারবেন। তাহলে কী করা দরকার? সহাবস্থান করা, পরস্পরের সঙ্গে বোঝাপড়ার ভিত্তিতে। ভারত বড় রাষ্ট্র, এক ধরনের অহমিকা তাদের মধ্যে বিরাজমান। কিন্তু মনে রাখা দরকার, বাংলাদেশও একটা স্বাধীন রাষ্ট্র এবং প্রতিবেশী। দুই দেশের জনগণের মধ্যে একটা চেতনাগত ঐক্য রয়েছে। সেই চেতনাগত ঐক্য এবং ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের সম্পর্কের নিরিখে সব ইগো এক পাশে সরিয়ে রেখে, বন্যা কীভাবে মোকাবিলা করা যায়, তার বাস্তবানুগ সুপরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন। কারণ, বন্যা হলে দুই দেশের সাধারণ মানুষই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ভারত একটা অসাধারণ কাজ করেছে, সীমান্তের ছিটমহলের ঘেরাটোপে যুগ যুগ বন্দি প্রায় এক লাখ মানুষকে সংবিধান পরিবর্তন করে মুক্তি দিয়েছে। সেই চিরবঞ্চিত মানুষগুলো নতুন করে বেঁচে থাকার সুযোগ বা অধিকার পেয়েছে সত্যিকারের নাগরিক হিসেবে। আমরা চাইলেই পারি, দুই দেশের অভিন্ন নদ-নদীর পানির হিস্যার যথাযথ ব্যবস্থাপনা করার। তাহলে তো এই অবিশ্বাস, দ্বন্দ্ব থাকে না। দুই দেশের সীমান্তের নাগরিকদের জীবনে বন্যা এসে সব ভাসিয়ে দিয়ে সর্বস্বান্ত করে দিচ্ছে। বাংলাদেশ ও ভারতের সরকার আন্তরিকভাবে চাইলে এই বন্যাকে নিয়ন্ত্রণ করে জনগণকে ভোগান্তি থেকে মুক্তি দিতে পারে। এটা একান্তই কূটনৈতিক ব্যাপার। নিজের ব্যর্থতার দায় আরেকজনের ঘাড়ে চাপালেই কি সমস্যার সমাধান হবে!
লেখক: কথাসাহিত্যিক
monihaider68@gmail.com