জ্বালানি তেলের দাম

লিটারপ্রতি কমতে পারে ৫০ পয়সা থেকে ৭ টাকা পর্যন্ত

বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম কম হওয়ায় আগামী মাস থেকে দেশে এর দাম কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে অন্তর্র্বর্তী সরকার। এর মধ্যে এ-সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব তৈরি করেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি), যেখানে জ্বালানিভেদে লিটারপ্রতি গড়ে ৫০ পয়সা থেকে ৭ টাকা পর্যন্ত দাম কমতে পারে। তবে বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের একজন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, বিশ^বাজারে তেলের দাম এবং আনুষঙ্গিক খরচ ও মুনাফা ধরে একটি খসড়া প্রস্তাব তৈরি করেছে বিপিসি। বৃহস্পতিবার (আজ) প্রস্তাবটি জ্বালানি বিভাগে জমা দেওয়ার পর সেটি বিবেচনা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে সরকার। নতুন দাম আগামী সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হবে।

সূত্রমতে, ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রোল এবং অকটেনের দাম দিয়ে একাধিক প্রস্তাব তৈরি করেছে বিপিসি। দাম কম কমালে বিপিসির লাভ-লোকসান কেমন হবে, সেটিও উল্লেখ রয়েছে ওই প্রস্তাবে। যেখানে ডিজেল ও কেরোসিনের দাম লিটারপ্রতি ৫০ ও ৭৫ পয়সা এবং ১ টাকা ২০ পয়সা কমানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া পেট্রোল ও অকটেনের দাম লিটারপ্রতি ৫, ৬ ও ৭ টাকা কমানোর প্রস্তাব তৈরি করেছে বিপিসি।

বিপিসির ওই প্রস্তাব অনুযায়ী, সর্বনিম্ন দাম কমানো হলে প্রতিষ্ঠানটির লোকসান হবে না; বরং লিটারপ্রতি ২০ থেকে ৩০ পয়সার মতো মুনাফা থাকতে পারে। মাঝামাঝি যে প্রস্তাব সেটি কার্যকর করা হলে লাভ-লোকসান সমান হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে সর্বোচ্চ যে দামের প্রস্তাব রয়েছে, সেটি যদি সরকার কার্যকর করে, তাহলে বিপিসির লোকসান হবে।

সূত্রটি জানিয়েছে, বিপিসি তেলের দামের যে প্রস্তাব তৈরি হয়েছে, সেটি আজ জমা দেওয়ার আগে কিছুটা পরিবর্তনও হতে পারে। তবে পরিবর্তন না হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান দায়িত্ব নেওয়ার পর জ্বালানি তেলের দাম কমানোর আভাস পাওয়া গেছে। সে ক্ষেত্রে মানুষের কষ্ট লাঘবের জন্য তেলের দাম সর্বোচ্চ যত কমানো যায়, সেই পরিকল্পনাও সরকারের রয়েছে বলে জানা গেছে। এ ক্ষেত্রে হয়তো ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১ টাকা এবং পেট্রোল-অকটেনের দাম ৬ বা ৭ টাকা কমতে পারে বলে ধারণা করছেন অনেকে।

দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে ভারতের দামও বিবেচনায় নেওয়া হবে। কারণ বাংলাদেশে তেলের দাম যদি ভারতের চেয়ে কম হয়, তাহলে তা চোরাইপথে সে দেশে পাচার হওয়ারও আশঙ্কা থাকে।

সর্বোচ্চ দাম কমানোর ফলে এক মাসে ঠিক কত টাকা লোকসান হবে তা জানা না গেলেও বিপিসির একজন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, দেশের উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে আগস্টে, অর্থাৎ চলতি মাসে তেলের দাম অপরিবর্তিত থাকার কারণে মাস শেষে প্রায় ২৭০ থেকে ২৮০ কোটি টাকা লোকসান গুনতে হতে পারে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, এর আগে বিপিসি বিভিন্ন সময়ে যেমন লোকসান করেছে, তেমনি বিপুল পরিমাণ মুনাফাও করেছে। তবে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে মূল্য সমন্বয়ের পর থেকে চলতি মাস ছাড়া বিপিসির তেমন একটা লোকসান হয়নি।

চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিপিসি আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের ব্যারেলপ্রতি গড়মূল্য প্রাক্কলন করেছিল প্রায় ১২২ ডলার। যদিও বিশ^বাজারে জ্বালানি পণ্যটির গড়মূল্য এখন ৮০ ডলারের আশপাশে। সামনে তা আরও কমার পূর্বাভাস রয়েছে।

বিশ্ববাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে গত মার্চ থেকে জ্বালানি তেলের স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ করে আসছে সরকার। এই হিসাবে প্রতি মাসে নতুন দাম ঘোষণা করা হচ্ছে। চলতি মাসে জ্বালানি তেলের দাম অপরিবর্তিত ছিল।

সর্বশেষ গত জুলাইয়ের জন্য প্রতি লিটার ডিজেল ও কেরোসিনের দাম ১ টাকা কমিয়ে নতুন দর নির্ধারণ করা হয় ১০৬ টাকা ৭৫ পয়সা। আর পেট্রোলের দাম লিটারে ১২৭ এবং অকটেনে ১৩১ টাকা অপরিবর্তিত রাখা হয়। এর আগে জুন মাসে ডিজেল ও কেরোসিনের দাম ৭৫ পয়সা এবং পেট্রোল ও অকটেনের দাম বাড়ানো হয়েছে আড়াই টাকা করে। তখন বিশ^বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমলেও দেশে বাড়ানো হয়। মে মাসেও বাড়ানো হয়। আর এপ্রিলে ডিজেল ও কেরোসিনের দাম কমানো হলেও অপরিবর্তিত ছিল পেট্রোল ও অকটেনের দাম। স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে মূল্য সমন্বয়ের প্রথম মাস মার্চে ডিজেল ও কেরোসিন ৭৫ পয়সা, অকটেন ৪ ও পেট্রোলের দাম ৩ টাকা কমানো হয়।

আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য নির্ধারণ করতে গত ২০ ফেব্রুয়ারি জ্বালানি তেলের স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ ফর্মুলার নির্দেশিকা প্রকাশ করা হয়। এতে বলা হয়, দেশে ব্যবহৃত অকটেন ও পেট্রোল ব্যক্তিগত যানবাহনে অধিক পরিমাণে ব্যবহার হয়। তাই বাস্তবতার নিরিখে বিলাসদ্রব্য হিসেবে সব সময় ডিজেলের চেয়ে অকটেন ও পেট্রোলের দাম বেশি রাখা হয়। ভর্তুকির চাপ এড়াতে ২০২২ সালের আগস্টে গড়ে ৪২ শতাংশ বাড়ানো হয় জ্বালানি তেলের দাম। এরপর ব্যাপক সমালোচনার মুখে ২৩ দিনের মাথায় সব জ্বালানি তেলের লিটারে ৫ টাকা করে কমানো হয়।

ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেনের দাম জ্বালানি বিভাগ নির্ধারণ করে। এ ছাড়া উড়োজাহাজে ব্যবহৃত জেট ফুয়েল ও বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহৃত ফার্নেস অয়েলের দাম নিয়মিত সমন্বয় করে বিপিসি।