দেশের বিদ্যমান অর্থনৈতিক অবস্থার শ্বেতপত্র প্রণয়নের জন্য বিভিন্ন খাতের বিশেষজ্ঞদের নিয়ে ১২ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে, যার নেতৃত্বে আছেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।
শ্বেতপত্রে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির চিত্র থাকার পাশাপাশি অর্থনৈতিক বিষয়ে সরকারের কৌশলগত পদক্ষেপ গ্রহণ, এসডিজি বাস্তবায়ন এবং এলডিসি থেকে উত্তরণে করণীয় বিষয়ে প্রতিফলন
থাকবে। ৯০ দিনের মধ্যে অন্তর্র্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার কাছে সুপারিশসহ প্রতিবেদন হস্তান্তর করবে ওই কমিটি। প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের প্রশাসন বিভাগের মহাপরিচালক মো. আহসান কিবরিয়া সিদ্দিকি স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে বিষয়টি জানানো হয়। অর্থনৈতিক অবস্থার শ্বেতপত্র প্রণয়নের লক্ষ্যে বরেণ্য ব্যক্তিত্ব ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যকে প্রধান করে সরকার একটি কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। তিনি অন্তর্র্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার অনুমোদনক্রমে কমিটির অপরাপর সদস্যদের মনোনীত করবেন।
কমিটির অপর সদস্যরা হলেন ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের প্রধান এ. কে এনামুল হক, বিজনেস ইনিশিয়েটিভ লিডিং ডেভেলপমেন্টের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফেরদৌস আরা বেগম, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্নেন্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক ইমরান মতিন, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড. কাজী ইকবাল, বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ড. ম তামিম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আবু ইউসুফ, সিপিডির সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মুস্তাফিজুর রহমান, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান, জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. শারমিন্দ নীলোর্মি, রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) প্রতিষ্ঠাতা ও ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. তাসনিম আরিফা সিদ্দিকী এবং বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন।
প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় সূত্র জানায়, কমিটির সদস্যরা অবৈতনিকভাবে (বেতন-ভাতা ছাড়া) দায়িত্ব পালন করবেন। কমিটির সদর দপ্তর হবে পরিকল্পনা কমিশনে। কমিটিকে সাচিবিক সহায়তা দেবে পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ। সরকারের সব মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও দপ্তর প্রস্তাবিত কমিটির চাহিদা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত দিয়ে সহযোগিতা করবে।
শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির আনুষ্ঠানিক নাম ‘বাংলাদেশের বিদ্যমান অর্থনৈতিক অবস্থার শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি’। এই শ্বেতপত্রে মোটা দাগে ছয়টি বিষয়ে আলোকপাত করা হবে। সেগুলো হচ্ছে সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনা, মূল্যস্ফীতি ও খাদ্য ব্যবস্থাপনা, বাহ্যিক ভারসাম্য, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ, বেসরকারি বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থান।
এ সংক্রান্ত প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, গত দেড় দশকে দেশের অর্থনীতি বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জে পড়েছে। বিগত সরকারের চরম অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি, অর্থ পাচার ও অপরিণামদর্শী প্রকল্প গ্রহণের মাধ্যমে দেশি-বিদেশি ঋণ গ্রহণ ইত্যাদি কার্যক্রমের কারণে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক হয়ে পড়ে। অর্থ বিভাগের সূত্রে গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, পতনের আগে শেখ হাসিনার সরকার ১৮ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকার ঋণ রেখে গেছে। গত ডিসেম্বর পর্যন্ত ঋণের যে স্থিতি, তা বাংলাদেশের তিনটি বাজেটের মোট বরাদ্দের সমান। অন্যদিকে বাজেট ঘাটতি মেটাতে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে কর আদায়ের মাধ্যমে রাজস্ব বৃদ্ধির চেষ্টা না করে দেশি-বিদেশি ঋণের প্রতি ঝুঁকেছিল সেই সরকার।
সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় জিডিপির তুলনায় কর সংগ্রহ বাড়িয়ে ১৪ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও গত ছয়-সাত বছরে এই অনুপাত উল্টো ১১ শতাংশ থেকে কমে ৮ শতাংশে নেমেছে। অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনার এটি একটি দিক। সামগ্রিকভাবে দুর্নীতি, অর্থ পাচারের অবাধ সুযোগ, বাজার সিন্ডিকেট ইত্যাদির ফলে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা অসহনীয় হয়ে পড়ে।