খুলনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের ২৭টি পোল্ডারে বেড়িবাঁধের দৈর্ঘ্য ১ হাজার ১৩ দশমিক ৯০ কিলোমিটার। এর মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ ৪০ কিলোমিটার। চলতি বর্ষা মৌসুমে ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধের অনেক স্থান ধসে পড়ছে। বাঁধ ভেঙে প্লাবিত হচ্ছে গ্রামের পর গ্রাম, যা নিয়ে চরম আতঙ্কে নদীপাড়ের মানুষ।
অন্যদিকে, জেলায় ৪২৭টির মধ্যে ভরাট ও সরু হয়ে নাব্য হারিয়েছে ২৭২টি খাল। ইজারা দেওয়া আছে ১১৬টি। নেট-পাটা ও বাঁধ দিয়ে এসব খালে চলছে খ-ে খ-ে মাছ চাষ। এতে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে পানির অবাধপ্রবাহ। সৃষ্টি হচ্ছে তীব্র জলাবদ্ধতা। পানিবন্দি হচ্ছে আশপাশের শত শত মানুষ।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, ৯ উপজেলা কয়রা, পাইকগাছা, ডুমুরিয়া, বটিয়াঘাটা, ফুলতলা, দিঘলিয়া, রূপসা ও দাকোপ নিয়ে গঠিত খুলনা জেলা। এই জেলায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের ২৭টি পোল্ডার রয়েছে। এসব পোল্ডারের দৈর্ঘ্য ১ হাজার ১৩ দশমিক ৯০ কিলোমিটার। যার মধ্যে ৪০ কিলোমিটার বাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ রয়েছে। এর মধ্যে কয়রা, পাইকগাছা, দাকোপ ও বটিয়াঘাটায় উপজেলায় ঝুঁকিতে রয়েছে ৩০ কিলোমিটার। শহরের সন্নিকটে দিঘলিয়া উপজেলার বারাকপুরের ২৯, ২৮/২ নম্বর পোল্ডারে ঝুঁকিপূর্ণ রয়েছে ১০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ। কয়রার বাসিন্দা সৌরভ মোল্ল্যাসহ পোল্ডারগুলোর আশপাশের বাসিন্দারা দেশ রূপান্তরকে জানান, স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে নদীতে পানি বাড়লে বিভিন্ন জায়গায় বাঁধ উপচে লোকালয়ে পানিও প্রবেশ করে। এ ছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধ প্রায়ই ভাঙনের কবলে পড়ছে। জোয়ারের পানিতে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। নষ্ট হচ্ছে ঘরবাড়ি, ফসল ও ঘেরের মাছ। ভাঙনে শত শত বিঘা জমিও নদীতে চলে যাচ্ছে। অনেকে ভিটেবাড়ি হারিয়ে বাস্তুচ্যুত হচ্ছেন। কেউ বাঁধের ওপর মানবেতর জীবনযাপন করছেন, যা নিয়ে প্রতিনিয়ত আতঙ্কে দিন পার করেন তারা। পাইকগাছা উপজেলার দেলুটি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রিপন কুমার ম-ল বলেন, ভদ্রা নদীর জোয়ারে ২২ নম্বর পোল্ডারের কালিনগর এলাকায় ৪০০ ফুট বেড়িবাঁধ ভেঙে যায়। তাতে ১৩টি গ্রাম প্লাবিত হয়। ভাঙনের কিছুদিন পর গ্রামবাসীর সহযোগিতায় পানি উন্নয়ন বোর্ড রিং বাঁধ দিয়ে পানি আটকাতে সক্ষম হয়। এতে ফসল ও কাঁচা ঘরবাড়ির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ভেসে গেছে আমনের বীজতলা ও চিংড়িঘের আর পুকুরের মাছ।
এ ব্যাপারে খুলনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আশরাফুল আলম বলেন, নদীতে জোয়ারের চাপ বাড়লে কোথাও না কোথাও ভাঙন ধরে। বাঁধের ঝুঁকিপূর্ণ অংশের তালিকা করা হয়েছে। ভাঙনকবলিত জায়গায় তাৎক্ষণিক মেরামত করা হচ্ছে। আর স্থায়ীভাবে টেকসই ও ঝুঁকিমুক্ত করতে প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে।
এদিকে, খুলনা মেট্রোপলিটন থানাসহ ৯ উপজেলায় ৪২৭টি খাল রয়েছে। এর মধ্যে প্রবহমান রয়েছে ১৫৫টি। ভরাট ও সরু হয়ে ২৭২টি খালের নাব্য নেই। নাব্য হারানো খালের মধ্যে লবণচরায় ২টি, দৌলতপুর ২টি, রূপসায় ৩০টি, তেরখাদায় ৫টি, ফুলতলায় ৩৭টি, দিঘলিয়ায় ১৪টি, ডুমুরিয়ায় ৪৩টি, বটিয়াঘাটায় ৫৭টি, দাকোপে ৪০টি, কয়রায় ২৭টি ও পাইকগাছায় ১৫টি।
এ ছাড়া ৪২৭টি খালের মধ্যে ৯ উপজেলায় ইজারা দেওয়া আছে ১১৬টি। যেগুলো নেট-পাটা ও বাঁধ দিয়ে খ- খ- করে মাছ চাষ করা হচ্ছে। এতে চলতি বর্ষা মৌসুমে পানির অবাধপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। খালের আশপাশে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। ফসলের ক্ষেত ও মৎস্যঘের ডুবে যাচ্ছে। অনেক বসতবাড়িও পানিতে নিমজ্জিত হচ্ছে। ক্ষতির মুখে পড়ছেন
কৃষক। অন্যদিকে, ৮২৩ কোটি টাকা ব্যয়ে খুলনা শহরে ড্রেন ও কালভার্ট নির্মাণ এবং নদী খনন করা হচ্ছে। অথচ একটু ভারী বৃষ্টিতে তীব্র জলজটের সৃষ্টি হচ্ছে। তলিয়ে যায় রাস্তাঘাট। বিশেষ করে নগরীর রয়্যাল মোড়, সাতরাস্তা মোড়, টুটপাড়া, মুজগুন্নি, রায়েরমহলসহ বিভিন্ন এলাকায় হাঁটুপানি জমে। নিম্নাঞ্চলের বাসাবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও পানিতে নিমজ্জিত হয়।
খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী খান মশিউজ্জামান বলেন, প্রকল্পের কাজ চলমান। কাজ সমাপ্ত হলে জলজট থাকবে না।