গাজী টায়ার্স কারখানা

আগুন দেওয়া ও লুটপাটের নেপথ্যে ৩ গ্রুপের ১০ জন

লুটপাট ও লুটপাটের সময় সংঘর্ষে হতাহতের ঘটনা আড়াল করতেই নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের রূপসীতে গাজী টায়ার্স কারখানায় আগুন দেওয়া হয়। আর এই সংঘর্ষ ও আগুনের নেপথ্যে ছিল স্থানীয় তিনটি গ্রুপের নেতৃত্বস্থানীয় ১০ জন, যাদের অধিকাংশই আবার আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দলটি ছেড়ে অন্য দলে ভেড়েন। গত ৫ আগস্ট সরকার পতনের দিনও এই তিনটি গ্রুপের লোকজন কারাখানাটিতে প্রথম দফায় লুটপাট চালিয়েছিল। গত পাঁচ দিনে কারখানার আশপাশের এলাকার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

গাজী টায়ার্স কারখানায় আগুনের ঘটনায় ফায়ার সার্ভিসের কাছে স্বজনদের দাবি অনুযায়ী নিখোঁজের সংখ্যা ১৭৬ জন। আর শিক্ষার্থী ও পুলিশের করা তালিকায় নিখোঁজের সংখ্যা ১২৯ জন। তবে আগুনে পুড়ে কারখানার ছয়তলা মূল ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ায় আট দিন পেরিয়ে গেলেও ভেতরে এখনো উদ্ধার অভিযান চালানো সম্ভব হয়নি।

দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত ২৩ আগস্ট রাতে গোলাম দস্তগীর গাজী হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হন। পরদিন ২৪ আগস্ট তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালত ছয় দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে। ওইদিন গাজী টায়ার্স কারখানার পাশে রূপসীর খাদুন এলাকার খাপাড়া জামে মসজিদ থেকে মাইকে একটি ঘোষণা দেওয়া হয়। 

যাতে বলা হয়, গাজী টায়ার্স কারখানার সীমানার ভেতরে যাদের জমি জোর করে দখল করে রাখা হয়েছে তাদের নিয়ে বিকেলে রূপসী বাস স্টেশন এলাকায় সভা হবে। পরে বিকেল ৪টার দিকে খাদুন এলাকার ছাত্রলীগকর্মী বাবু, মহিলা লীগ নেত্রী রাবেয়ার ছেলে তুষার এবং রবিন, আলামিন, রায়হান, ফোরকান ও গোফরানসহ তাদের লোকজন নিয়ে দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে কারখানার ভেতরে গিয়ে লুটপাট শুরু করে। এরপর বরাবো এলাকার শহিদুল ওরফে ডাকাত শহিদুল ও মিজান ওরফে ফেন্সি মিজানও তাদের লোকজন নিয়ে দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে কারখানাটির ভেতরে ঢুকে লুটপাট শুরু করে। আর এই দুই গ্রুপের লুটপাটের খবর পেয়ে চনপাড়া থেকে আরেকটি গ্রুপ ও রূপগঞ্জের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে লোকজন কারখানার ভেতরে ঢুকে লুটপাট চালাতে থাকে। এমন পরিস্থিতিতে খাদুনের খাপাড়া মসজিদ থেকে দ্বিতীয়বার মাইকে আরেকটি ঘোষণা দেওয়া হয়। 

যাতে বলা হয়, গাজী টায়ার্স কারখানায় ডাকাত ঢুকেছে এবং এলাকাবাসীকে তাদের প্রতিহত করার আহ্বান জানানো হয়। এ ছাড়া সাধারণ মানুষকে গাজী টায়ার্স কারখানা থেকে বের হয়ে যেতে বলা হয়। এরই মধ্যে বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে লুটপাট নিয়ে ছয়তলা ভবনটির নিচতলায় বাবু, তুষার, জনি, রবিন, আলামিন, রায়হান গ্রুপের সঙ্গে শহিদুল ও মিজান গ্রুপ এবং চনপাড়ার একটি গ্রুপের ত্রিমুখী সংঘর্ষ শুরু হয়ে যায়। এতে তিন গ্রুপের ও সাধারণ মানুষসহ ১৫-২০ জন গুরুতর আহত হয়। সংঘর্ষে হতাহতের সংখ্যা বাড়তে থাকলে পরিস্থিতি জটিল আকার নেয়। পরে রাত সাড়ে ৯টার দিকে সংঘর্ষ ও লুটপাটের ঘটনা আড়াল করতে বাবু ও শহিদুল গ্রুপের সদস্যরা লুটপাট করতে আসা লোকজনকে ভবনের চার এবং পাঁচতলায় তামা ও দামি কেমিক্যাল রয়েছে উল্লেখ করে ওপরে উঠতে বলে। পরে ভবনের নিচতলায় আগুন জ্বালিয়ে দিয়ে নিচতলার গেটের সাটারে তালা ঝুলিয়ে চলে যায় তারা।

খোঁজ নিয়ে আরও জানা গেছে, বাবু ও তার সহযোগীরা উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি তানজির আহমেদ রিয়াজের হয়ে ছাত্রলীগের রাজনীতি করলেও সরকার পতনের দিনই বিএনপিতে যোগ দেয়। আর তুষারের মা রাবেয়া মহিলা লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকলেও আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরই তিনিও বিএনপিতে যোগ দেন। বিএনপিতে যোগ দেওয়া বাবুর নেতৃত্বে তার সহযোগী ৪০ জনকে দৈনিক ২ হাজার টাকা করে দেওয়ার শর্তে গাজী টায়ার্স কারখানা পাহারার কাজ দেওয়া হয়। কিন্ত গোলাম দস্তগীর গাজী গ্রেপ্তার হওয়ার পরই বাবু ও তার সহযোগীরা লুটপাট চালাতে কারখানায় ঢোকে।

গাজী টায়ার্স কারখানার দেওয়াল ঘেঁষে খাদুন এলাকায় বাড়ি সোহেল মিয়ার। তিনি নিজের বাড়ির তৃতীয়তলায় বসে লুটপাটের ভিডিও ধারণ করায় হামলার শিকার হন বলে জানান। সোহেল মিয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাবু, তুষার, রবিন, জনি, সাব্বির, মোহন, সাদ্দাম, গোফরান, সাজ্জাদ, রানা ভূঁইয়া, আলামিন খান, মারুক খান, কাউসার মিয়াসহ ৫০-৬০ জন দেশীয় অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে আমার বাড়িতে হামলা করে ভাঙচুর চালায়। আমাকে ও আমার স্ত্রীকে মারধর করে। এ ঘটনায় আমার স্ত্রী চাঁদনী শাহনাজ বাদী হয়ে বাবু ও তার সহযোগীদের আসামি করে রূপগঞ্জ থানায় অভিযোগ দেয়।’

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে বাবুর মোবাইল ফোনে কল করা হলে তিনি সাংবাদিক পরিচয় শুনে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।

কারখানায় লুটপাট করতে যাওয়া নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক যুবক বলেন, ‘কারখানার ছয়তলা ভবনের ভেতরে ব্যাপক মারামারির ঘটনা ঘটে। এ সময় অনেক লোকজনকে আহত হয়ে মাটিতে পড়ে থাকতে দেখা যায়। এই মারামারিতে হতাহতের ঘটনা ধামচাপা দিতেই আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয় কারখানায়।’ কারখানাটির ভেতরে লুট করতে যাওয়া অন্তত ২০ জনের সঙ্গে কথা বলে একই ধরনের তথ্য জানা গেছে।

ঘটনার দিন কারখানা চত্বরে উপস্থিত থাকা ইয়ামিন নামে এক যুবক বলেন, ‘কারখানার ভেতরে ঢুকে দেখেছিলাম দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে মারামারির ঘটনা ঘটছে। পরে এ কারণে কারখানা থেকে বেড়িয়ে চলে আসি।’

এ বিষয়ে বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য কাজী মনিরুজ্জামান মনির দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দলের নাম ভাঙিয়ে কেউ অপরাধ করলে সাংগঠনিকভাবে দল থেকে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। গাজী সাহেব অপরাধ করলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী তার বিচার করা হবে। কিন্তু সাধারণ মানুষের রুটি-রোজগারের জায়গা এই কারখানা। কারখানা ধ্বংস করলে এখানে কর্মরত ২০ থেকে ২৫ হাজার শ্রমিক কর্মচারী কোথায় যাবে?’

গাজী টায়ার্স কারখানার ব্যবস্থাপক (প্রশাসন) সাইফুল ইসলাম দাবি করেন, আগুনে কারখানার প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

নিখোঁজদের খোঁজে কারখানার ভেতরে স্বজনরা : গাজী টায়ার্স কারখানায় অগ্নিকা-ের ঘটনার সাত দিন পেরিয়ে গেছে। টানা চার দিন আগুনে পুড়ে কারখানাটির চতুর্থ ও পঞ্চমতলার ছাদ ধসে পড়েছে। এ কারণে বুয়েটের প্রতিনিধিদল পরিদর্শন করে আগুনে পোড়া ভবনটিতে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে। যে কারণে ভেতরে উদ্ধার অভিযান চালানো সম্ভব না বলে জানিয়ে দেয় তারা। কিন্তু নিখোঁজদের সন্ধানে প্রতিদিনই কারখানার সামনে ভিড় করছেন স্বজনরা।