‘হত্যাকারীরা’ চিহ্নিত মুখ খুলছেন অনেকে

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে ঢাকার আশুলিয়া থানার সামনে গুলি করে হত্যার পর ছাত্র-জনতার লাশ ভ্যানে স্তূপ করে রাখা ও জ্বালিয়ে দেওয়ার অভিযোগ তদন্তে ৪ সদস্যের কমিটি গঠন করেছে পুলিশ। এ বিষয়ে ওই থানার পুলিশ সদস্যরা বিব্রত বোধ করার কথা জানিয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাচ্ছেন না। তবে মুখ খুলতে শুরু করেছেন প্রত্যক্ষদর্শী ঘটনাস্থলের আশপাশের বাসিন্দা ও দোকানিরা। লাশের স্তূপের ওই ঘটনার সঙ্গে জড়িত অনেকেরই পরিচয় ইতিমধ্যে পাওয়া গেছে। তাদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা হবে বলে জানিয়েছেন ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার আহম্মদ মুঈদ।

পায়ে চালিত একটি ভ্যানে রক্তাক্ত লাশ স্তূপ করছে পুলিশ সদস্যরা এমন একটি ভিডিও ক্লিপ সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। শুরুতে ওই ভিডিওর দৃশ্যের স্থান নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠলেও পরে নিশ্চিত হওয়া যায় এটি আশুলিয়া থানার সামনের ঘটনা। গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর বিকেল ৩টার দিকে এই ঘটনা ঘটে। সেদিন আশুলিয়া থানা পুলিশের পাশাপাশি ঢাকা জেলা উত্তর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) একটি দল ছিল সেখানে।

পুলিশের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ওইদিন আশুলিয়া থানায় অবস্থানরত ঢাকা উত্তর ডিবির পরিদর্শক (তদন্ত) আরাফাত হোসেন, এসআই মো. রকিবুল, এসআই মালেক, এসআই আবুল হাসান, এসআই হামিদুর রহমান, এসআই নাসির উদ্দিন, এসআই আব্দুল মালেক, এএসআই সুমন চন্দ্র গাইন ও এসআই জলিল বিক্ষোভকারী ছাত্র-জনতাকে উদ্দেশ্য করে গুলি ছোড়েন। তাদের মধ্যে কয়েকজনকে এরই মধ্যে আটক করা হয়েছে। তবে কয়েকজন এখনো চাকরিতে যোগদান করেননি। এই ঘটনায় যারা যারা জড়িত তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এ বিষয়ে মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান ও পুলিশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ওমর ফারুক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পুলিশ তাদের চেইন অব কমান্ডে চলে। সিনিয়র কর্মকর্তাদের নির্দেশনায় পরিদর্শক, এসআই, এএসআই ও কনস্টেবলরা গুলি করেছেন এবং নিহতদের লাশগুলো সরিয়ে ফেলার জন্য ভ্যানে ওঠানো হয়েছে। যারা এই ন্যক্কারজনক ঘটনার নির্দেশক তাদেরসহ ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের আইনানুগ সাজা হওয়া উচিত।’

তিনি আরও বলেন, ‘পুলিশের পোশাক পরা অবস্থায় কীভাবে এমন ঘটনা ঘটাতে পারে এটা আমার বোধগম্য নয়। কিছু মানুষের জন্য পুরো পুলিশ বাহিনীকে প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়েছে। তাই যারা এ ঘটনায় জড়িত তাদের শাস্তি দিয়ে পুলিশ তাদের নজির স্থাপন করবে বলে আমি আশা করছি।’

গত ৫ আগস্ট বিকেল ৩টা ২০ মিনিটে গুলির শব্দ শুনতে পান আশুলিয়া থানার সামনের একটি বাড়ির মালিক রাশিদা বেগম। তিনি বলেন, ‘সেই সময় থানার সামনে অনেক মানুষ ছিলেন। মানুষ মরে পড়ে থাকতে দেখছি। তবে কখন গোলাগুলি শেষ হয়েছে বলতে পারব না।’

থানা ফটকের পাশের বাইপাইল কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের ইমাম মাওলানা মোফাজ্জল হোসেন বলেন, ‘সেদিন দুপুরের পর থেকে মসজিদে আসতে পারিনি। এশার নামাজ হয়েছিল। পরদিন সকালে পোড়ানো ছয়টি মৃতদেহের জানাজা পড়ানো হয়েছে।’

থানার সামনের ভবন থেকে পুরো ঘটনা দেখা রনি আহমেদ নামে এক ব্যক্তি বলেন, ‘বিকেলে থানা ফটকের সামনে উত্তেজিত জনতার ওপর পুলিশ গুলি ছোড়ে। এতে ১০ থেকে ১২ জন গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ে যান। কয়েক মিনিট ধরে ওখানে গোলাগুলি চলে। পরে জীবিত কয়েকজনকে ছাত্ররা নিচু হয়ে এসে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যান। তারপরেও ৬ থেকে ৭ জন ওখানে পড়ে ছিল। তখন আশপাশের সব অলিগলি জনগণ ঘিরে ফেলে। রাস্তা থেকেও লোকজন থানার দিকে রওনা হয়। পরে থানা থেকে সব পুলিশ সশস্ত্র হয়ে একযোগে বেরিয়ে আসে। তারা গুলি করতে করতে বেরিয়ে আসে।’

ওই দিনের ঘটনা ও ছড়িয়ে পড়া ভিডিওর বিষয়ে ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার আহম্মদ মুঈদ গতকাল রবিবার গণমাধ্যমকে বলেন, ‘ছাত্র-জনতার লাশের স্তূপ করার ১ মিনিট ১৪ সেকেন্ডের ভিডিও এবং পরবর্তী সময়ে সেগুলো জ্বালিয়ে দেওয়ার অভিযোগের তদন্তে চার সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ও ডিএসবি কর্মকর্তার সমন্বয়ে এই কমিটি গঠন করা হয়েছে। পুলিশের জায়গা থেকে যা যা করণীয় তা আমরা করছি। তদন্ত কমিটি তাদের তদন্তের কাজ শুরু করছে। কারা কারা এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত, কারা উপস্থিত ছিলেন তাদের নামও আমরা পেয়ে গেছি। আমাদের পরবর্তী পদক্ষেপের জন্য নামগুলো প্রকাশ করছি না। খুব তাড়াতাড়ি আপনাদের সামনে বিস্তারিত প্রকাশ করা হবে।’

জড়িত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে মামলা হবে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে পুলিশ সুপার বলেন, ‘অপরাধী সে যেই হোক তার বিরুদ্ধে মামলা হবে। পুলিশও আইনের বাইরে নয়। এছাড়া শুধু ছাত্র-জনতা না, আমাদের অনেক পুলিশ সদস্যকেও আগুনে পুড়িয়ে মারা হয়েছে। পুলিশ হত্যার বিষয়েও মামলা হবে। প্রধান উপদেষ্টার সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে, মানবাধিকার লঙ্ঘন হলে গুরুত্বের সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি ও একটি মামলার বাদীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত ৫ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শেষ সময়ে থানায় হামলা হয়। সে সময় পুলিশ সদস্যরা এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়ে। এ সময় কয়েকজন আন্দোলনকারী মারা গেলেও খোঁজ পাওয়া যায়নি তাদের। পরবর্তী সময়ে ৬ আগস্ট সকালে একটি পিকআপে পুড়ে যাওয়া কয়েকজনের মৃতদেহের খোঁজ মেলে। ধারণা করা হচ্ছে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটিতে দেখা যাওয়া লাশগুলো গুম করতে পুলিশ পিকআপে তুলে পুড়িয়ে দেয়। তবে অনেকের লাশ অতিরিক্ত পুড়ে যাওয়ায় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। এ ছাড়া পুড়ে যাওয়া একটি মৃতদেহের হাতে হ্যান্ডকাফ পরানো ছিল।

ওইদিনের ঘটনায় আশুলিয়া থানায় একটি মামলা করেছিলেন মোসা. রাহেন জান্নাত ফেরদৌস। তিনি বলেন, ‘গত ৫ আগস্ট ছাত্র আন্দোলনে নিখোঁজ হয় আমার ছেলে আস-সাবুর। পরবর্তী সময়ে ৬ আগস্ট সকালে আশুলিয়া থানার সামনে একটি পিকআপে পুড়ে যাওয়া কয়েকজনের লাশের খোঁজ মেলে। আমার ছেলের পুড়ে যাওয়া লাশ ওই পিকআপেই পেয়েছি। পকেটে থাকা মোবাইল ফোনের সিমকার্ডের সূত্র ধরে আমার ছেলের লাশ শনাক্ত করি। আমার ছেলেকে গুলি করে হত্যার পর গুম করার উদ্দেশ্যে পুলিশ সদস্যরা লাশটি পুড়িয়ে ফেলে। যখন ছেলের লাশ আনতে যাই তখন আরও কয়েকজনের পুড়ে যাওয়া লাশ দেখতে পাই। যাদের চেহারা শনাক্ত করার কোনো উপায় ছিল না।’

ছেলের পুড়ে যাওয়া লাশের পাশে আইডি কার্ড দেখে সাজ্জাদ হোসেনের পরিচয় শনাক্ত করেন মা শাহিনা বেগম। তিনি বলেন, ৫ আগস্ট বেলা সাড়ে ৩টা পর্যন্ত মোবাইল ফোনে কথা হয় সাজ্জাদের সঙ্গে। পরে ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। তার পরদিন সকালে থানার সামনে পুড়ে যাওয়া লাশের সঙ্গে থাকা আইডি কার্ড দেখে শনাক্ত হয় সাজ্জাদের মৃতদেহ।

শাহিনা বেগম আরও বলেন, সেখানে আরও ছয়টি পোড়া লাশ দেখতে পান তিনি। যার মধ্যে তানজিল মাহমুদ সুজয়কে তার মামা মাজেদুল ও বাইজিদকে তার স্ত্রী রিনা আক্তার শনাক্ত করেন। তাদের পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা দুজনই ৫ আগস্ট বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সময়ের মধ্যে নিখোঁজ হন। পরদিন আইডি কার্ড ও মোবাইল ফোনের সিমের সূত্র ধরে তাদের লাশ শনাক্ত হয়।

ওইদিনের ঘটনায় এখনো যারা নিখোঁজ রয়েছেন তাদের অনেকের স্বজন জিডি করার জন্য থানায় আসছেন বলে জানান আশুলিয়া থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মাসুদুর রহমান। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পরে অনেকেই থানায় আসছেন তাদের স্বজনদের খোঁজার জন্য। এ বিষয়ে ইতিমধ্যে তদন্ত চলমান রয়েছে।’

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ১ মিনিট ১৪ সেকেন্ডের একটি ভিডিও ক্লিপ ছড়িয়ে পড়ে। যাতে দেখা যায়, মাথায় পুলিশের হেলমেট, সাদা পোশাকের ওপরে পুলিশের ভেস্ট পরা এক ব্যক্তি আরেকজনের সহায়তায় চ্যাংদোলা করে নিথর এক যুবকের দুহাত ধরে ভ্যানের ওপর নিক্ষেপ করছেন। ভ্যানের ওপর নিথর ওই দেহের নিচে আরও বেশ কয়েকটি নিথর দেহ। সেগুলো থেকে ঝরে পড়া রক্তে সড়কের কিছু অংশ ভিজে গেছে। বিছানার চাদরের মতো একটি চাদর দিয়ে তাদের ঢেকে রাখা হয়েছে। পাশেই পুলিশের হেলমেট, ভেস্ট পরা আরও কয়েকজনকে দেখা যায়। ভিডিওটির আশপাশের নানা বিষয় পর্যালোচনা করে এবং স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে স্থানটি আশুলিয়া থানা লাগোয়া ‘ইসলাম পলিমারস অ্যান্ড প্লাস্টিসাইজারস লি. অফিসার ফ্যামিলি কোয়ার্টারের’ পাশের সড়ক বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।