বন্যাকবলিত বেশিরভাগ এলাকায় নেমেছে বানের পানি। ভেসে উঠছে বন্যার ভয়াবহ ক্ষতচিহ্ন। স্রোতের তোড়ে ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক, মহাসড়ক, কালভার্ট। সড়কের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে বড় বড় গর্ত। সেসব গর্তে আটকা পড়ছে যানবাহন। ফলে বন্যাকবলিত এলাকার মানুষের ভোগান্তি যেন কাটছে না। এলাকাবাসী স্বেচ্ছাশ্রমে সড়ক মেরামতের কাজ করছেন।
সরেজমিনে দেখা গেছে, কুমিল্লার বুড়িচং সদর থেকে রাজাপুর হয়ে শংকুচাইল পর্যন্ত প্রায় পাঁচ কিলোমিটার পাকা সড়কের বিভিন্ন স্থানে পিচ উঠে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। মনে হয় যেন ৫০ বছর ধরে এ সড়কের কোনো কাজ হয়নি। ইতিমধ্যে সড়কটি গর্ত ভরাট করে যানবাহন চলাচলের উপযোগী করার চেষ্টা করছেন এলাকাবাসী।
এ বিষয়ে হরিপুর গ্রামের সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক আলমগীর হোসেন বলেন, সিএনজি চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করি। আমার পরিবারে পাঁচ সদস্য রয়েছে। ২১ আগস্ট রাতে বাঁধ ভেঙে এলাকায় পানি ঢোকে। তড়িঘড়ি করে পরিবারকে নিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে চলে যাই। বুড়িচং সদর থেকে রাজাপুর হয়ে শংকুচাইল সড়কে নিয়মিত সিএনজি চালাই। এখন পানি কমাতে সড়কের বিভিন্ন স্থানে বড় বড় গর্ত দেখা যাচ্ছে। এ গর্তগুলো ভরাট না করলে কোনোভাবে গাড়ি চালানো সম্ভব নয়। দ্রুত সড়ক মেরামতের দাবি জানাই।
হরিপুর গ্রামের শাহিন বলেন, এই সড়কটি দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ যাতায়াত করে। বন্যার পানি এলাকায় ঢুকে পুরো উপজেলা ডুবে যায়। পানি কমতে শুরু করায় সড়কের বড় বড় গর্ত দেখা যাচ্ছে। আমরা এলাকাবাসী উদ্যোগ নিয়ে সড়কটি মেরামত করার জন্য কাজ করছি।
এ বিষয়ে বুড়িচং উপজেলা প্রকৌশলী আলিফ মাহমুদ অক্ষর দেশ রূপান্তরকে বলেন, পুরো উপজেলায় এখনো পানি। কিছু কিছু জায়গায় পানি কমতে শুরু করেছে। আমরা যত দ্রুত সম্ভব গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো আগে মেরামত করার চেষ্টা করব।
একই অবস্থা ফেনীর সীমান্তবর্তী উপজেলা পরশুরামে। এখানকার গ্রামীণ সড়ক ভয়াবহ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। যানবাহন চলাচলের ক্ষেত্রেও ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ভাঙনের কবলে অনেক সড়কে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে যোগাযোগ ব্যবস্থা।
স্থানীয়রা জানায়, উপজেলার পরশুরাম ও মির্জানগর ইউনিয়নের পশ্চিম সাহেবনগর সড়ক বন্যায় ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। রাস্তা সংস্কারের জন্য মসজিদের মাইকে ঘোষণা দেওয়া হয়। এতে পশ্চিম সাহেবনগর, পূর্ব সাহেবনগর, মনিপুরসহ একাধিক এলাকার ছাত্র, যুবক ও গ্রামবাসী বিভিন্ন সরঞ্জাম নিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক মেরামতে নেমে পড়েন।
একই সঙ্গে বন্যায় ভেঙে পড়া উপজেলার মির্জানগর ইউনিয়নের জয়চাঁদপুর-সত্যনগর সড়কের প্রায় ৩০ ফুট রাস্তায় স্বেচ্ছাশ্রমে একটি সাঁকো তৈরি করে যাতায়াত ব্যবস্থা সচল করেন স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন তারুণ্যের আলো ফাউন্ডেশনের সদস্যরা।
জানতে চাইলে পরশুরাম উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী এসএম শাহআলম ভূঞা বলেন, গ্রামবাসী স্বেচ্ছাশ্রমে ভাঙা রাস্তা মেরামত করে দিয়েছেন। এ সপ্তাহের মধ্যে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত সবগুলো সড়ক সংস্কারের কাজ শুরুর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
অন্তর্র্বর্তী সরকারের দুর্যোগ ব্যস্থাপনা ও ত্রাণ উপদেষ্টা ফারুক-ই-আজম বীরপ্রতীক গতকাল ফেনী জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে চলমান বন্যা পরিস্থিতির মূল্যায়ন এবং ত্রাণ তৎপরতা সমন্বয়-সংক্রান্ত মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে বলেছেন, বন্যাদুর্গতদের জন্য সারা দেশ ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে শিক্ষার্থীদের কার্যক্রম দেখেছি। ৭৫ বছর জীবনে সবার মধ্যে এমন উদ্যোম দেখিনি।
উপদেষ্টা বলেন, পরশুরামে তরুণ-যুবকরা পাঁচ কিলোমিটার সড়ক সংস্কারের দৃশ্য আমার নজরে এসেছে। তারা সরকারি কোনো বরাদ্দ বা সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তাদের জন্য অপেক্ষা করেননি। তরুণদের এ কর্মউদ্যোম দেখে আমি অভিভূত হয়েছি। দেশের তরুণরা বুকের তাজা রক্ত দিয়ে এ পরিবর্তন এনেছেন। এটিকে আমরা হারাতে চাই না। তিনি বলেন, আগের মতো কোনো ভাই, দল বা প্রভাব নেই যেখানে তার সড়ক অথবা তার বাড়িতে আগে কাজ করে দিতে হবে। এজন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তাদের প্রয়োজন বিবেচনায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দুর্গতদের জন্য কাজ করতে হবে।