প্রাথমিক শিক্ষায় ‘স্বরাজ’

প্রাথমিক শিক্ষায় নজরদারির এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করতে মাঠে মূল প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেন সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ও উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তারা। আর প্রশিক্ষণ, পরিদর্শনের কাজ করেন ইউআরসি ইনস্ট্রাক্টররা। এসব পদে থাকা কর্মকর্তাদের বছরের পর বছর একই কর্মস্থলে রাখায় সীমাহীন দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ভর করেছে মাঠ প্রশাসনে।

দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বড় অংশই কর্মস্থলে আছেন ৪ থেকে ১১ বছর ধরে। ফলে সাধারণ শিক্ষকরা হয়রানি, দুর্নীতির শিকার হচ্ছেন। সাধারণ শিক্ষক ও নীতিবান কর্মকর্তাদের দাবি, শিক্ষা প্রশাসনে শৃঙ্খলা ফেরাতে নীতিমালা কার্যকর করা জরুরি।

ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলায় সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা পদে মোহাম্মদ আজিজুর রহমান খান আছেন ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে। তার বিরুদ্ধে শিক্ষকরা হয়রানি, তুচ্ছ কারণে শোকজ করা, ঘুষ বাণিজ্য প্রভৃতি অভিযোগ এনে দুদককে জানিয়েছেন। আজিজুর রহমান বলেন, ‘আমি এখনো বদলির চেষ্টা করে যাচ্ছি, ৫ বার আবেদন জমা দিয়েছি, উচ্চ পর্যায় থেকে সুপারিশ করিয়েছি কিন্তু আমাকে বদলি করা হচ্ছে না।’ ১১ বছর কীভাবে একই কর্মস্থলে আছেন এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘এটা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বলতে পারবে।’

সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ও উপজেলা রিসোর্স সেন্টারের (ইউআরসি) কর্মকর্তাদের কর্মস্থলে ২ বছরের বেশি হলে বদলি করার কথা উল্লেখ আছে বদলি নীতিমালায়। দেশে সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার (এইউইও) ২ হাজার ৬০১টি পদের বিপরীতে এখন কর্মরত রয়েছেন ১ হাজার ৯০০’র বেশি কর্মকর্তা। দীর্ঘদিন ধরে একই কর্মস্থলে আছেন অর্ধেকের বেশি এইউইও। রাজবাড়ী সদর, পাংশা, নড়াইলের লোহাগড়া, সদর, ফরিদপুরের বোয়ালমারী, আলফাডাঙ্গা, মুকসুদপুর, ফরিদপুর সদর, চরভদ্রাসন ও সদরপুরে ৬-১০ বছর ধরে আছেন অনেক কর্মকর্তা। ঝিনাইদহ, শরিয়তপুর, চাঁদপুর, যশোর, খুলনা, কুষ্টিয়া, চট্টগ্রাম, বাগেরহাট, গোপালগঞ্জ, বরিশাল, পিরোজপুর, ভোলা, পটুয়াখালী ও ঢাকা জেলার ৩ শতাধিক উপজেলায় সহস্রাধিক এইউইও আছেন বছরের পর বছর।

২০২২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে অনলাইনে বদলির জন্য সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা, উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা, ইউআরসি ইনস্ট্রাক্টর এবং পিটিআই ইনস্ট্রাক্টরদের আবেদনের নির্দেশনা দেওয়া হয়। শত শত আবেদন জমা হলেও অদৃশ্য কারণে তা বাস্তবায়িত হয়নি।

রাজবাড়ী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা অহীন্দ্র কুমার মন্ডলের বিরুদ্ধে কর্মস্থলে না থাকাসহ অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। পরপর দুবার শিক্ষামেলা না করে টাকা মেরে দেওয়ার ঘটনা জানাজানি হলে দায়সারাভাবে শিক্ষামেলা করা, টাকা ছাড়া ফাইল আটকে রাখার ঘটনায় ক্ষুব্ধ শিক্ষকরা। বিষয়টি মহাপরিচালককে জানানো হলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে দাবি একাধিক শিক্ষকের।

কর্মস্থলে শিক্ষা কর্মকর্তা দীর্ঘদিন থাকায় অনেক শিক্ষক মাসের পর মাস বিদ্যালয়ে না গেলেও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয় না বলে অভিযোগ রয়েছে। বগুড়ার কাহালু উপজেলার ঢাকস্তা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মোছা: যায়েদা খাতুন ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ১ মাসের চিকিৎসা ছুটি নিয়ে বিদ্যালয় ত্যাগ করেন। প্রধান শিক্ষক হাবিবুর রহমান বলেন, ৫ বছর পেরিয়ে গেছে কিন্তু তার পদটি শূন্য হচ্ছে না; পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে।

দেশে অর্ধশত শিক্ষকের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা চলছে যারা বছরের পর বছর বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত। অথচ ৬০ দিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকলে তার চাকরি থাকার কথা নয়। এটা হচ্ছে মাঠ প্রশাসনে স্বজনপ্রীতি-দুর্নীতির কারণে।

দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষকদের দাবি তুলে ধরছেন শিক্ষক মু. মাহবুবর রহমান। তিনি বলেন, ‘প্রাথমিক শিক্ষায় কোনো শৃঙ্খলা নেই, দুর্নীতিবাজদের দৌরাত্ম্য বেশি, অভিযোগ দিয়েও লাভ হয় না বরং হয়রানির শিকার হতে হয়। ডিজি অফিসে অনেক অফিসার বছরের পর বছর থাকায় সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। অনেক উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার বছরের পর বছর কর্মরত থাকার কারণে দালাল-শিক্ষকদের নিয়ে এ সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। অনলাইন বদলিতে পছন্দের প্রার্থীদের আবেদন বিবেচনা করা হচ্ছে।’

শাহিনুর আক্তার শরিয়তপুর জেলার ভেদরগঞ্জ উপজেলা রিসোর্স সেন্টারে ২০১৪ সাল থেকে ইনস্ট্রাক্টর হিসেবে আছেন। তার বিরুদ্ধে প্রশিক্ষণার্থী শিক্ষকদের ভাতা কম দেওয়া, অডিটের নামে ভাতা থেকে টাকা কেটে নেওয়া, চাঁদা তুলে নিজের জন্য উপহার নেওয়া, খাবার ভাতায় নিম্নমানের খাবার পরিবেশন করা, ব্যাগের জন্য ৫শ টাকা বরাদ্দ, অথচ নিম্নমানের ব্যাগ দেওয়া প্রভৃতি অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। শুধু তাই নয়, তিনি প্রশিক্ষণের বাইরে অফিসে অনুপস্থিত থাকেন প্রায়শ। টাকার বিনিময়ে তিনি অনিয়মকে নিয়মে পরিণত করেছেন। এসব কথা উল্লেখ করে গত জুন মাসে শরীয়তপুর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে ৪৫ জন শিক্ষক লিখিত অভিযোগ দেন। এর অনুলিপি উপজেলা প্রেস ক্লাব থেকে মহাপরিচালক পর্যন্ত গেছে। অভিযোগের সত্যতা পেয়ে বিভাগীয় মামলার কথা বলেছেন শরীয়তপুর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা। ২০২০ সালেও তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তুলেন শিক্ষকরা। এখনো স্বপদে আছেন এ কর্মকর্তা।

শাহিনুর আক্তার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। আমি অনেকদিন ধরে বদলির চেষ্টা করছি, দুবার আবেদনও জমা দিয়েছি কিন্তু আমাকে বদলি করা হচ্ছে না।’ 

সারা দেশে ৪৯২ জন ইনস্ট্রাক্টর কর্মরত। অনেক ইনস্ট্রাক্টর আছেন যারা এক কর্মস্থলে ৪ বছর থেকে ১০ বছর পর্যন্ত কর্মরত।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন প্রধান শিক্ষক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কারিকুলাম প্রশিক্ষণে ৫০০ টাকার তথ্যপত্র ১২০ টাকায় সম্পন্ন করা হয়, ২২০ টাকার ব্যাগ দিয়ে ৫শ টাকার বিল করা হয়, আবার ১০০ টাকার প্রশিক্ষণ সামগ্রীর বিপরীতে ২৫ থেকে ৩০ টাকা ব্যয় করা হয়। অনেকেই প্রশিক্ষণের বদৌলতে বাড়ি-গাড়ির মালিক বনে গেছেন। প্রশিক্ষকের ভাতার সঙ্গে কো-অর্ডিনেটরের ভাতাও নিচ্ছেন তারা।’ 

ঢাকা ও খুলনা বিভাগের কয়েকজন সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা বলেন, ‘অবাক করার মতো আর্থিক বরাদ্দ ইউআরসি অফিসগুলোতে। রাজস্ব খাতে নিয়মিত বেতন-ভাতা পেয়েও ইউআরসি ইনস্ট্রাক্টররা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোতে প্রশিক্ষক ভাতা, কো-অর্ডিনেটর ভাতাসহ নানা আর্থিক সুবিধা পান। কেনাকাটায় দুর্নীতি তো আছেই। অনেক ইনস্ট্রাক্টর বছরের পর বছর একই কর্মস্থলে আছেন, দুর্নীতির অভিযোগ উঠলেও কর্তৃপক্ষ আমলে নিচ্ছে না।’

এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আব্দুস সামাদ।