আলেমদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি বদলানো জরুরি

আলেমরা এ দেশের আদর্শ নাগরিক। তারা নীতি-নৈতিকতার উৎকর্ষে অবস্থানকারী। শতকরা ৯০ ভাগ মুসলিমের ধর্মীয় বিষয়াবলির নেতৃত্ব দেন তারা। ধর্মীয় জ্ঞান-বিজ্ঞানের শিক্ষা প্রদান, প্রচার-প্রসার এবং সে অনুপাতে মানুষের জীবন গড়ার নিরন্তর চেষ্টায় তারা রত আছেন। সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা করা, সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখা এবং দেশ গঠনে তাদের অবদান অসামান্য। দেশের মানুষের যেকোনো দুঃখ-দুর্দশায় তারা নিজেদের সবটুকু উজাড় করে দেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রাকৃতিক দুর্যোগকালীন তাদের সেই মনোভাব, সদিচ্ছার বহিঃপ্রকাশ দেশের মানুষ লক্ষ্য করেছে। রাষ্ট্রের প্রতি তাদের অকৃত্রিম দরদ আর শ্রদ্ধাভক্তি চোখে পড়ার মতো।

দেশের স্বার্থবিরোধী যেকোনো দল, গোষ্ঠী বা শক্তির আগ্রাসনের বিপক্ষে তারা সদা সোচ্চার। দেশ ও জাতির উন্নয়ন নিয়ে সবসময় ভাবেন তারা। রাষ্ট্রের উচিত তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। তাদের বিরুদ্ধে যাবতীয় হয়রানিমূলক কর্মকাণ্ড বন্ধের উদ্যোগ নেওয়া। তাদের কর্মের যথাযথ মূল্যায়ন করা। তাদের উপযুক্ত সম্মান ও প্রাপ্য প্রদান করা। কিন্তু আমরা দেখছি রাষ্ট্রের জন্য তারা যতটা করেন রাষ্ট্র সেই তুলনায় তাদের জন্য কিছুই করে না। স্বাধীনতার ৫০ বছর পেরিয়েছে। এ সময়ে দেশের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের নানামুখী সুযোগ-সুবিধা এবং জীবনমানের পরিবর্তন ঘটেছে। তাদের নিয়ে রাষ্ট্র ভেবেছে। উত্তরোত্তর উন্নতির চিন্তা করেছে। এখনো করছে। ভবিষ্যতেও করে যাবে। এটা করাই রাষ্ট্রের কাজ। কিন্তু আলেমদের জীবনমানের পরিবর্তন ঘটেনি। তারা রাষ্ট্রীয় নানা সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছে যুগ যুগ ধরে। তারা না পায় কোনো সরকারি চাকরি-বাকরি। না পায় রাষ্ট্রীয় সম্মানী। আর না আছে তাদের কাজের কোনো রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি, এটা রাষ্ট্রের সুস্পষ্ট বৈষম্যমূলক আচরণ।

বর্তমানে সব অনিয়ম, অনাচার, দুর্নীতি রোধ দূর করে একটি বৈষম্যহীম রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়ে দেশ এগোচ্ছে। কিন্তু রাষ্ট্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে অস্থিমজ্জার মতো কাজ করা আলেম সমাজের কথা রাষ্ট্র ভাবছে না। তাদের অধিকার-প্রাপ্য নিয়ে কর্তাব্যক্তিরা কার্যত কথা বলছে না। কওমি মাদ্রাসায় পড়ে আলেম হওয়া এই জনগোষ্ঠীর সংখ্যা নির্দিষ্ট করে বলা না গেলেও বিশাল অঙ্কের যে হবে, তা বলাই যায়। বিশাল এই জনগোষ্ঠীকে পাশ কাটিয়ে, তাদের অধিকারের কথা না ভেবে, তাদের যথাযোগ্য মর্যাদা না দিয়ে একটি বৈষম্যহীন, সুন্দর ও আদর্শ রাষ্ট্রের পরিকল্পনা কতটা বাস্তবায়িত হতে পারে তা বড় প্রশ্নের সম্মুখীন।

তাদের বাকস্বাধীনতা হরণ করা হয়। তাদের রাজনৈতিক অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। ধর্ম প্রচারে তাদের বাধা দেওয়া হয়। তাদের শিক্ষাক্রম নিয়ে মিথ্যা প্রোপাগান্ডা ছড়ানো হয়। তাদের দাড়ি-টুপির সমালোচনা করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে তাদের মতাদর্শ ও প্রতিবাদকে জঙ্গি কার্যক্রম বলে আখ্যা দেওয়া হয়। ধর্মান্ধ, মৌলবাদী বলে তাদের কটাক্ষ করা হয়। যখন যে সরকারই ক্ষমতায় যায় নিজেদের স্বার্থে কিংবা কখনো বিদেশি প্রভুদের ইশারায় কমবেশি তাদের দমনের চেষ্টা চালায়। তাদের নিয়ে জঙ্গি নাটক সাজানো হয়। তাদের কোরআন-হাদিস ও ধর্ম শিক্ষার মারকাজগুলোকে জঙ্গি তৈরির আখড়া বলা হয়। সেখানে পড়ালেখা করা লাখ লাখ শিক্ষার্থীকে অবহেলার দৃষ্টিতে দেখা হয়। তাদের অকর্মণ্য এবং সমাজের বোঝা বলে অবজ্ঞা করা হয়। অথচ আলেমদের দ্বারা পরিচালিত সেই মারকাজ বা মাদ্রাসাগুলো সমাজের সুবিধাবঞ্চিত, হাজার হাজার এতিম ও অনাথ শিশুর অন্ন, বস্ত্র, খাদ্য, বাসস্থান ও চিকিৎসা নিশ্চিতকরণসহ সুশিক্ষায় শিক্ষিত করার দায়িত্বভার পালন করে থাকে। সেখান থেকে পড়াশোনা শেষ করে শিক্ষার্থীরা দেশ গড়ার কাজে নিজেদের আত্মনিয়োগ করে। কীভাবে সমাজে শান্তি আসবে, কীভাবে সমাজ থেকে অন্যায়-অবিচার বিদূরিত হবে, কীভাবে বৈষম্যহীন সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে, সে প্রচেষ্টা তারা চালাতে থাকে।

বক্তৃতার মঞ্চে, মসজিদের মিম্বারে সর্বত্র তারা স্বজাতির কল্যাণে কথা বলে। জাতিকে সত্যের প্রতি আহ্বান জানায়। মিথ্যা পরিহারের উপদেশ দেয়। তারা মাদকের বিরুদ্ধে বলে। সুদ-ঘুষ ও জুয়াবাজির নিন্দা করে। চুরি-ডাকাতির তীব্র সমালোচনায় লিপ্ত হয়। নারীর অধিকার নিয়ে জাতিকে সতর্ক করে।

কৃষক-মজুর ও শ্রমজীবী মানুষের অধিকার সম্পর্কে জাতিকে ওয়াজ শোনায়।

তারা নামমাত্র বেতনে মসজিদ-মাদ্রাসায় চাকরি করে। কিন্তু নীতির উৎকর্ষে অবস্থান করে। কাউকে ঠকায় না। কারও সঙ্গে প্রতারণা করে না। তারা হয় মিতব্যয়ী, অল্পে থাকে সন্তুষ্ট। প্রচুর আত্মসংযম আর খোদাভক্তি নিয়ে জীবন পার করে। তাদের দ্বারা সমাজ কলুষিত হয় না; নিষ্কলুষ হয়। তাই তাদের অধিকারের প্রতি সজাগ হওয়া রাষ্ট্রের কর্তব্য কাজ।

এ দেশে নানা ধরনের ভাতা প্রথা চালু আছে। মসজিদের ইমাম, খতিব ও মুয়াজ্জিনদের ভাতা প্রথা চালু করতে সমস্যা কোথায়? মসজিদে নামাজ পড়া লোকগুলো তো এ দেশেরই নাগরিক। তারা তো সরকারকে টেক্স দেয়। রাজস্ব আয়ে তাদের ভূমিকা আছে। তাদের সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাজের দায়িত্ব পালন করা লোকগুলো কেন রাষ্ট্রীয় সুবিধা থেকে বঞ্চিত থাকবে? দেশের হাজার হাজার কওমি মাদ্রাসা আদর্শ নাগরিক গড়ার কেন্দ্র। সেসব মাদ্রাসা কেন সরকারি কোনো সুযোগ-সুবিধা পাবে না? কেন সবকিছুর জন্য জনগণের ওপরই তাদের নির্ভর করতে হবে? প্রতিটি স্কুল-কলেজে একাধিক ভবন করে দিতে পারলে রাষ্ট্র কেন এতিমখানায় একটি করে বিল্ডিং করে দিতে পারবে না? এতসব ‘কেন’-এর উত্তর জাতি শুধু খোঁজেই যাবে নাকি কার্যকর কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করে আলেমদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা হবে, তা আজ বড়ই প্রাসঙ্গিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।