চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ পদটি কার? এ পদে প্রধানের দায়িত্বে কি একজন প্রকৌশলী থাকবেন, না একজন পরিকল্পনাবিদ থাকবেন? এ দুইয়ের বিবাদ চলছে সিডিএতে। গত ১৫ আগস্ট এ পদে একজন প্রকৌশলীকে পদায়নের পর অচলাবস্থা দেখা দেয়। এতে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে। প্রকৌশলীকে পদায়নের বিষয়ে পরিকল্পনা বিভাগের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মন্ত্রণালয় থেকে ব্যাখ্যাও চাওয়া হয়েছে।
এদিকে নিরাপত্তাহীনতায় অফিস করছিলেন না চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া সাবেক সিডিএর চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ইউনুছ। গত সোমবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে তাকে অব্যাহতি দেওয়ার পর গতকাল মঙ্গলবার নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ পেয়েছেন প্রকৌশলী মো. নুরুল করিম।
গত ১৫ আগস্ট প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ হিসেবে প্রকৌশলী এজিএম সেলিমকে প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ (চলতি দায়িত্ব) হিসেবে পদায়ন করা হয়। সিডিএ সচিব রবীন্দ্র চাকমা স্বাক্ষরিত সেই অফিস আদেশ জারির পর গত ১৮ আগস্ট গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর এ পদায়ন বাতিলের আবেদন করেন সাত নগর পরিকল্পনাবিদ। সেই আবেদনে বলা হয়েছে, নগর পরিকল্পনায় স্নাতক ডিগ্রি এবং উপপ্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ হিসেবে ১০ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। কিন্তু পরিকল্পনা বিষয়ে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেই এজিএম সেলিমের। এ ছাড়া পরিকল্পনাবিদ হিসেবেও দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা নেই।
একই মন্তব্য করেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স চট্টগ্রাম চ্যাপ্টারের সভাপতি ড. রাশিদুল হাসান। তিনি বলেন, ‘প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ পদে পদায়নের জন্য স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নগর পরিকল্পনায় ডিগ্রি রয়েছে এমন ব্যক্তিরাই নিয়োগ পেতে পারেন। এর বাইরে এই পদে কাউকে পদায়নের সুযোগ নেই।’ এই পদে সিডিএ থেকে কাউকে নিয়োগ দিতে হবে অথবা বাইরে (নগর উন্নয়ন অধিদপ্তর বা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বা অন্য কোনো উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ) থেকে কাউকে নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে।
রাশিদুল হাসান আরও বলেন, ‘রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ এবং সর্বশেষ গঠিত গাজীপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষেও প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ হিসেবে একজন পরিকল্পনাবিদ রয়েছেন। তাই চট্টগ্রামেও এই পদে একজন পরিকল্পনাবিদ রাখার দাবি জানিয়েছি আমরা।’
তবে রাশিদুল হাসানের মতের বিরুদ্ধ মতও রয়েছে। ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন অব চট্টগ্রামের ভাইস চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রশিদ আহমেদ চৌধুরী বলেন, ‘আমি মনে করি এই পদে একজন প্রকৌশলীর থাকা উচিত। স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে অভিজ্ঞ একজন প্রকৌশলীকে রাখা গেলে দীর্ঘমেয়াদি প্ল্যান তৈরিতে সহায়ক হতে পারে।’
কিন্তু এই পদের যোগ্যতায় নগর পরিকল্পনায় ডিগ্রিধারীর কথা বলা হয়েছে তা স্মরণ করিয়ে দেওয়ার পর প্রকৌশলী রশিদ আহমেদ চৌধুরী বলেন, ‘প্রয়োজনে যোগ্যতা সংশোধন হবে। যেখানে এখন সংবিধান সংশোধনের কথা উঠে আসছে সেখানে এটাও সংশোধন হতে পারে।’
এই পদে প্রকৌশলী এজিএম সেলিমকে কেন পদায়ন করা হলো? এই প্রশ্নের জবাবে সিডিএ তৎকালীন চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ইউনুছ বলেন, ‘এর আগেও এই পদে সিডিএর প্রধান প্রকৌশলী কাজী হাসান বিন শামস ভারপ্রাপ্ত হিসেবে ছিল। তখন তো কেউ প্রতিবাদ করেনি। এখন এজিএম সেলিমকে দেওয়াতে সমস্যা হচ্ছে কেন?’
এর জবাবে রাশিদুল আলম বলেন, ‘তখনো আমরা লিখিতভাবে এর প্রতিবাদ জানিয়েছিলাম। কিন্তু তখন পরিস্থিতির কারণে কোনো অ্যাকশন হয়নি। এখন পরিবর্তিত পরিস্থিতিতেও প্রতিবাদ জানালাম।’ এর আগে প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ স্থপতি শাহীনুল ইসলাম খান ২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি সিডিএ থেকে অবসরে যাওয়ার পর এই পদে প্রথমে প্রকৌশলী কাজী হাসান বিন শামস, পরবর্তী সময়ে প্রকৌশলী মনজুর হাসান ও পরে আবারও কাজী হাসান বিন শামসকে ভারপ্রাপ্ত হিসেবে পদায়ন করা হয়েছিল।
মন্ত্রণালয়ের ব্যাখ্যার জবাব দিতে সময় চাইল সিডিএ : গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের কাছে আবেদন করা সাত নগর পরিকল্পনাবিদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গণপূর্ত মন্ত্রণালয় থেকে সিডিএ চেয়ারম্যানের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। ২৭ আগস্ট গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন অধিশাখা-৬-এর যুগ্ম সচিব মোহাম্মদ মিজানুর রহমান স্বাক্ষরিত সেই আদেশে তিন কার্যদিবসের মধ্যে ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে মিজানুর রহমান গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিষয়টি আমাদের নজরে রয়েছে এবং এজন্য সিডিএ চেয়ারম্যানের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। লিখিত ব্যাখ্যা পাওয়া সাপেক্ষে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’
সেই চিঠি স্বাক্ষরের পর গত রবিবার তিন কার্যদিবস শেষ হয়েছে। চিঠির জবাব দেওয়া হয়েছে গত রবিবার বিকেলে জানতে চাইলে তখন সিডিএ চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ইউনুছের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেছিলেন, ‘সিডিএ সচিব ঢাকা গেছেন। তিনি ব্যাখ্যা দিয়ে আসার কথা।’ ব্যাখ্যার বিষয়ে সিডিএ সচিব রবীন্দ্র চাকমা গতকাল বিকেলে বলেন, ‘ব্যাখ্যা প্রদানের জন্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কথা বলে সময় নিয়েছি। সিডিএতে যোগদান করা নতুন চেয়ারম্যানের নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যাখ্যা দেওয়া হবে।’
সিডিএর প্রধান প্রকৌশলী কাজী হাসান বিন শামস তার অধীনে থাকা তিনটি পদ ছেড়ে দেওয়ায় এসব পদে সিডিএর তিন প্রকৌশলীর মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়। এর মধ্যে নির্বাহী প্রকৌশলী মনজুর হাসানকে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী-১ হিসেবে, নির্বাহী প্রকৌশলী আশরাফুল ইসলামকে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে চট্টগ্রাম সিটি আউটার রিং রোডের প্রকল্প পরিচালকের পদে এবং নির্বাহী প্রকৌশলী এজিএম সেলিমকে প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদের দায়িত্ব দেওয়া হয়।