শ্রমিকদের আন্দোলনের ফলে নিরাপত্তাজনিত কারণে কয়েক দিন ধরেই বন্ধ ছিল গাজীপুর ও ঢাকার সাভার এলাকার কারখানাগুলো। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কড়া নিরাপত্তায় গতকাল বৃহস্পতিবার থেকে কাজে যোগ দিতে শুরু করেছেন শ্রমিকরা। গাজীপুরের প্রায় সব কারখানার শ্রমিকরা এদিন কাজ শুরু করলেও ঢাকার সাভার ও আশুলিয়া এলাকায় সব কারখানার শ্রমিকরা কাজে যোগ দেননি। কোনো কোনো কারখানার শ্রমিকরা কাজ শুরু করে ফের বেরিয়ে গেছেন। আর তখনই তারা হামলার শিকার হয়েছেন। গতকাল আশুলিয়ায় বেশ কয়েকটি কারখানায় এমন ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ৩০ শ্রমিক।
গাজীপুর প্রতিনিধি জানান, গাজীপুরের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে তৈরি পোশাক কারখানাগুলোতে সকাল থেকে স্বাভাবিকভাবে উৎপাদন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। জেলার দুই হাজারেরও বেশি পোশাক কারখানার নিরাপত্তায় শিল্প পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা সমন্বিতভাবে কাজ করছেন। যেকোনো উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তাদের পর্যাপ্ত প্রস্তুতি রয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
কারখানা কর্র্তৃপক্ষ ও শিল্প পুলিশ জানায়, কয়েক দিন ধরে গাজীপুর মহানগরী ও জেলার বিভিন্ন এলাকায় শিল্প কারখানায় শ্রমিকদের অসন্তোষ চলে আসছিল। বিভিন্ন দাবি-দাওয়া নিয়ে শ্রমিকরা বিক্ষোভও করেছেন। তবে বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই শ্রমিকরা নিজেদের কারখানায় কাজে যোগ দিয়েছেন। কোনোভাবেই যাতে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হতে না পারে এ ব্যাপারে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে কারখানা কর্র্তৃপক্ষও।
পুলিশ জানায়, গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার সফিপুর এলাকার ইবনে সিনা ফার্মাসিটিক্যাল লিমিটেড কারখানাটি কয়েকদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। এ ছাড়া হাতেগোনা দু-তিনটি কারখানা শ্রমিকদের দাবির বিষয়ে আলোচনা করে সমাধানের চেষ্টা চলছে।
গাজীপুর শিল্প পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইমরান আহাম্মেদ বলেন, ইবনে সিনাসহ কয়েকটি কারখানা ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। শ্রমিকদের সঙ্গে সমস্যার সমাধান হলে সেগুলোও খুলে দেওয়া হবে। তবে বৃহস্পতিবার সকাল থেকে গাজীপুরে কোথাও শ্রমিক আন্দোলনের খবর আসেনি।
কয়েকদিন ধরে নানামুখী দাবি-দাওয়া নিয়ে কারখানার শ্রমিক ও চাকরিপ্রার্থী বহিরাগতরা আন্দোলন করে আসছিলেন। সড়ক অবরোধসহ বেশ কয়েকটি কারখানায় ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে। শ্রমিকদের নানা দাবিতে আন্দোলনের কারণে বুধবার গাজীপুরের ৬০ কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছিল। পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে এক কারখানা মালিক দেশ রূপান্তরকে বলেন, চাকরিচ্যুত শ্রমিকদের চাকরি, বেকারদের চাকরি ও পুরুষ শ্রমিক নিয়োগে সমতা এসব দাবি নিয়ে অতীতে কোনো সময়ই কোনো আন্দোলন হয়নি। পোশাক কারখানাগুলো শুরু থেকেই নারী শ্রমিকের সংখ্যা বেশি রয়েছে। এবার এসব দাবিগুলো তোলা হচ্ছে সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যমূলকভাবে। পোশাক খাতকে অস্থিতিশীল করার জন্য একটি চক্র পরিকল্পিতভাবে এসব দাবিকে সামনে নিয়ে আসছে। সরকারের সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্তের ফলে চক্রান্তকারীদের হাত থেকে পোশাক খাতকে রক্ষা করা গেছে।
এদিকে সাভার প্রতিনিধি জানান, আশুলিয়ায় চলমান অস্থিরতার মধ্যে আন্দোলনরত শ্রমিকদের সঙ্গে স্থানীয় লোকজনের সংঘর্ষের ঘটনায় অন্তত ৩০ শ্রমিক আহত হয়েছেন। তাদের উদ্ধার করে স্থানীয় নারী ও শিশু হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। শ্রমিক বিক্ষোভের মুখে বেশ কিছু কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। তবে অধিকাংশ কারখানাতেই স্বাভাবিক উৎপাদন কাজকর্ম অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছে শিল্প পুলিশ।
সরেজমিন দেখা যায়, গত বুধবার যেসব কারখানা বন্ধ ছিল, গতকাল সেগুলোর অধিকাংশেই কাজ চলছে। এর মধ্যে সকালে অনন্ত গার্মেন্টসের শ্রমিকরা কারখানায় প্রবেশ করলেও কাজ না করে বিভিন্ন দাবি আদায়ে কাজ বন্ধ করে বসে থাকেন। এ সময় মালিকপক্ষ শ্রমিকদের কিছু দাবি মেনে নেওয়ার আশ্বাস দিলেও শ্রমিকরা তা না মেনে কারখানা থেকে বেরিয়ে যান। বেরিয়ে যাওয়ার পথে অতর্কিতভাবে ৫০-৬০ ব্যক্তি লাঠিসোঁটা হাতে হামলা চালালে বেশ কয়েকজন শ্রমিক আহত হন। একই ঘটনা ঘটে পাশের নিউজ এইজ কারখানায়। সকালে শ্রমিকরা কারখানাটিতে প্রবেশ করলেও ভেতরে ঢোকার কিছুক্ষণ পরই দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত কাজ করবে না জানিয়ে বেরিয়ে যান। পরে মালিকপক্ষ কারখানাটি ছুটি ঘোষণা করে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও আহত শ্রমিকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সকালে আশুলিয়ার নরসিংহপুর এলাকার কয়েকটি কারখানার আশপাশে স্থানীয় ৫০-৬০ জনের একটি গ্রুপ লাঠিসোঁটা হাতে অবস্থান নেয়। পরে আন্দোলনকারী শ্রমিকরা কাজ না করে কারখানা থেকে বেরিয়ে এলে লাঠিয়াল গ্রুপটি তাদের ওপর হামলা চালায়। এ সময় উভয়পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনায় অন্তত ৩০ শ্রমিক আহত হন। শ্রমিকদের বিক্ষোভের মুখে বৃহস্পতিবার সকাল থেকে পর্যায়ক্রমে বাইপাইল-আবদুল্লাহপুর সড়কের জিরাবো এলাকা পর্যন্ত সড়কের দুপাশে অবস্থিত বেশ কয়েকটি পোশাক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। তবে ছুটি ঘোষণা করা কারখানাগুলোর সুনির্দিষ্ট কোনো সংখ্যা জানা যায়নি।
নরসিংহপুর এলাকার শারমিন গ্রুপের কারখানাগুলো বুধবার সকালে বন্ধ ঘোষণা করা হলেও গতকাল থেকে সেগুলোতে উৎপাদন চলছে। এ সময় কারখানার সামনে পুলিশের পাশাপাশি কয়েক যুবককে লাঠি হাতে পাহারা দিতে দেখা গেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক যুবক নিজেকে শারমিন গ্রুপের স্টাফ দাবি করে বলেন, ‘আমরা কারখানার নিরাপত্তায় সড়কের পাশে অবস্থান নিয়েছি। কারণ অন্য কারখানার শ্রমিক ও চাকরিপ্রত্যাশীর নামে বহিরাগতরা কারখানায় হামলা করে।
কারখানাটির নিরাপত্তাকর্মীরা জানান, দুপুর ১২টার পর কারখানার শ্রমিকরা কাজ না করে বেরিয়ে যাওয়ার সময় নিরাপত্তাকর্মীদের মারধর করেন। এতে রাশেদুল গুরুতর আহত হন। তাকে উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য আশুলিয়ার নারী ও শিশু হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির তৈরির অভিযোগে নরসিংহপুর এলাকা থেকে স্থানীয় জনতা দুজনকে আটক করে শিল্প পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেছে।
গতকাল বেলা সাড়ে ১১টার দিকে আশুলিয়ার নবীনগর-চন্দ্রা মহাসড়কের পলাশবাড়ী এলাকায় গিয়ে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন এপিক গ্রুপের পিজিসিএল গার্মেন্টসের শ্রমিকরা। পরে সেনাবাহিনী ও পুলিশ তাদের বুঝিয়ে সড়ক থেকে সরিয়ে দেয়। এ ছাড়া আশুলিয়ার কাঠগড়া এলাকায় বেশ কয়েকটি কারখানার সামনেও বিক্ষোভ করছেন শ্রমিকরা। সেখানেও অপ্রীতিকর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এবং বিশৃঙ্খলা এড়াতে শিল্পাঞ্চলে শিল্প পুলিশ, সেনাবাহিনী ও বিজিবির সদস্যরা সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন।
শিল্প পুলিশ-১-এর পুলিশ সুপার সারোয়ার আলম বলেন, আগের তুলনায় বৃহস্পতিবার পরিস্থিতি অনেকটাই ভালো রয়েছে। সকালে অধিকাংশ কারখানার শ্রমিকরা স্বাভাবিকভাবে কাজে যোগ দিয়েছেন। তবে হাতেগোনা কয়েকটি কারখানার শ্রমিকরা বিক্ষোভ করলে সেসব কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।