যুগের পর যুগ কাড়াকাড়ি!

খুলনায় অবৈধ আয়ের বড় উৎস নৌঘাট, বালুমহাল ও সোনাডাঙ্গা বাসস্ট্যান্ড। লোভনীয় খাত তিনটি সব সময়ই সব দলের নেতাদের নজরে থাকে। ১৫ বছর ধরে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের দখলে ছিল। সরকার পতনের পর এখন দখলও বদলে গেছে। নিয়ন্ত্রণে নিয়েছেন বিএনপি নেতারা। এর আগে বিএনপি ক্ষমতা হারানোর সঙ্গে সঙ্গে দখলে নিয়েছিল আওয়ামী লীগ। নিয়ন্ত্রণ বদলের এমন প্রক্রিয়া চলছে যুগ যুগ ধরে।

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, রূপসা ব্রিজের দক্ষিণ থেকে চালনা পূর্বপাশ পর্যন্ত খুলনা জেলা প্রশাসনের একমাত্র সরকারি বালুমহাল। বাংলা ১৪৩১ সনের জন্য মহালটি আলী রেজা হায়দারের নামে ইজারা নেওয়া হয়। ইজারা মূল্য ছিল ২৩ লাখ ১০ হাজার টাকা। তবে সাড়ে ৪ মাস অতিবাহিত হলেও সেই রাজস্বও পরিশোধ করেননি ইজারাদার। এ ছাড়া তার নামে খাতা-কলমে ইজারা থাকলেও ব্যবসা করেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চাচাতো ভাই শেখ সোহেল।

আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর শেখ সোহেল আত্মগোপনে চলে গেলে বালুমহালটি নিয়ন্ত্রণে নিতে এখন মরিয়া বিএনপি। এ ব্যাপারে বালুমহালের ইজারাদার আলী রেজা হায়দার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার নামে ইজারা আছে। তবে বিভিন্ন গ্রুপ নেওয়ার চেষ্টা করছে। ফোন দিচ্ছেন।’ নেওয়ার তালিকায় খুলনা জেলা বিএনপির আহ্বায়ক আমীর এজাজ খানের নামও উচ্চারণ করেন তিনি।

রাজস্ব পরিশোধ না করার বিষয়ে আলী রেজা বলেন, ‘এখন সব টাকা পরিশোধ করে দেব। এরপর তাদের সঙ্গে সমঝোতা করতে হবে।’

এ ব্যাপারে খুলনা জেলা বিএনপির আহ্বায়ক আমীর এজাজ খান বলেন, ‘বালুমহাল কারও নামে ইজারা থাকলে অন্য কেউ নিতে পারে না। ইজারাদার চালাতে ব্যর্থ হলে তার একজন প্রতিনিধির মাধ্যমেই নির্ধারিত সময় পর্যন্ত চালাতে হবে। সে হিসেবে অন্য কেউ টাকা দিয়ে হয়তো ব্যবসা করতে চাচ্ছেন। তবে আমি এর সঙ্গে জড়িত না।’

অন্যদিকে বাস-মালিকরা জানান, দেশের তৃতীয় বৃহত্তম খুলনা শহরের সোনাডাঙ্গা বাসস্ট্যান্ড। এখান থেকে প্রতিদিন ১৮টি রুটে অন্তত ৫০০টি বাস যাতায়াত করে। বাসপ্রতি দৈনিক ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত চাঁদা তোলা হয়।

তারা জানান, ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর খুলনা জেলা বাস, মিনিবাস, কোচ-মালিক সমিতি নামে একটি সংগঠনের আত্মপ্রকাশ হয়। খুলনা মহানগর আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান মিজান ওই কমিটির সভাপতি হন। এ ছাড়া খুলনা মহানগর যুবলীগের সাবেক আহ্বায়ক আনিসুর রহমান পপলু হন সাধারণ সম্পাদক। ২০১৮ সাল পর্যন্ত তাদের কমিটির নিয়ন্ত্রণে ছিল ওই বাসস্ট্যান্ডটি। তবে নানা বিতর্কে ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগে কোণঠাসা হয়ে পড়েন মিজানুর রহমান মিজান। ধীরে ধীরে শহর থেকে তার নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা কমতে থাকে। তখন প্রধানমন্ত্রীর চাচাতো ভাই ও যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য শেখ সোহেলের নির্দেশে ওই কমিটির নেতাদের বাসস্ট্যান্ডে প্রবেশ বন্ধ করে দেওয়া হয়। তখন সোনাডাঙ্গা বাসস্ট্যান্ডের একক নিয়ন্ত্রণ নেন শেখ সোহেল। তার হয়ে স্ট্যান্ডটি পরিচালনা শুরু করেন খুলনা মহানগর শ্রমিক লীগের সহসভাপতি আনোয়ার হোসেন সোনা।

এখন সোনাডাঙ্গা বাসস্ট্যান্ডটি দখলে নিয়েছেন বিএনপিপন্থিরা। বর্তমানে সেখানে খুলনা বিভাগীয় বাস-মিনিবাস কোচ মালিক সমিতি নতুন একটি সংগঠনের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এই সমিতির সভাপতি হয়েছেন মোকাম্মেল হোসেন ও সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব নিয়েছেন রবিউল করিম। তারা সরাসরি বিএনপি বা অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের কোনো পদে না থাকলেও বিএনপি-সমর্থিত হিসেবে পরিচিত।

এ ব্যাপারে কথা বলার জন্য আনোয়ার হোসেন সোনার মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করলে তা বন্ধ পাওয়া যায়। আত্মগোপনে ও ফোন বন্ধ থাকায় শেখ সোহেলের বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।

তবে এই প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সমিতির সভাপতি মোকাম্মেল হোসেন বলেন, ২০০৮ সালে তিনিই নির্বাচিত সভাপতি ছিলেন। ওই বছর হঠাৎ মহানগর আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান মিজান জোর করে দখল করেন। সেটি এখন পুনরুদ্ধার করা হয়েছে।

অস্থিরতা বিরাজ করছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) মালিকানাধীন পণ্য ওঠানামার ঘাটগুলোতেও। ঘাট দখল নিয়ে মহড়া ও হুমকির ঘটনা ঘটছে। অনেকে আপসে ঘাটের নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দিচ্ছেন।

বিআইডব্লিউটিএ সূত্র জানায়, খুলনা, বাগেরহাট, গোপালগঞ্জ, সাতক্ষীরা জেলার নদীবন্দর এলাকার সংস্থার ৪৯টি ঘাট রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে লাভজনক ঘাট হচ্ছে মোংলা-ঘষিয়াখালী চ্যানেল। প্রায় পাঁচ কোটি ২৫ লাখ টাকা ইজারা মূল্যে ঘাটটি পরিচালনা করতেন খুলনা মহানগর যুবলীগ সভাপতি শফিকুর রহমান পলাশ। পলাশ ইতিমধ্যে রাজস্বের অর্ধেক টাকা পরিশোধ করেছেন। তবে বিভিন্ন গ্রুপ ঘাট ছেড়ে দিতে বলায় আসিফউজ্জামান নামে একজনকে ঘাটটি হস্তান্তর করেছেন। মহানগরী খুলনার ৪ ও ৫ নম্বর ঘাটের ইজারাদার ছিলেন ২৩ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ সভাপতি চৌধুরী মিনহাজ উজ জামান সজল। গত ১৪ আগস্ট রাতে অর্থবছরের বাকি সময়ের জন্য ঘাট পরিচালনা অন্যের দায়িত্বে ছেড়ে দেন। শিরোমণি শুল্ক ঘাটে থানা যুবলীগ সভাপতি সাজ্জাদুর রহমান লিংকন ব্যবসা করতেন। এখন ঘাটটি শামীমুর রহমান নামের একজন চালাচ্ছেন।

খুলনা অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের যুগ্ম পরিচালক মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান জানান, রাজনৈতিক দলের পরিচয় দানকারী বিভিন্ন গ্রুপ অনেক ইজারাদারকে ঘাটগুলো ছেড়ে দিতে বলেছে। ফলে ইজারাদাররা তাদের মনোনীত প্রতিনিধির কাছে হস্তান্তর করছেন। খুলনায় দায়িত্বে থাকা নৌবাহিনী এ ব্যাপারে অফিসে এসে খোঁজ নিয়েছে। তাদের কাছে সব তথ্য সরবরাহ করা হয়েছে।

জানতে চাইলে খুলনা মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক শফিকুল আলম মনা দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিএনপি অফিসে অভিযোগ সেল রয়েছে। বিএনপির কোনো নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে দখলের অভিযোগ থাকলে সেটি সেলে জানাতে হবে। জানানোর পর তদন্তে দোষী হলে তার বিরুদ্ধে শোকজ ও বহিষ্কার করা হবে।