কমলা কি ইতিহাস তৈরির পথে?

মার্কিন নির্বাচনের দুই মাসের কম সময় বাকি আছে, আগামী ৫ নভেম্বর ভোটগ্রহণ শুরু হবে। ইতিমধ্যে নির্বাচনের ডামাডোলের মধ্যে ডেমোক্র্যাট পার্টি তাদের প্রার্থী বদল করতে বাধ্য হয়েছে। নির্বাচনের প্রথম বিতর্কে সাবেক প্রেসিডেন্ট ও রিপাবলিকান প্রার্থী ডোনাল্ট ট্রাম্পের কাছে বর্তমান প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন চরমভাবে ব্যর্থ হওয়াতে তিনি ডেমোক্র্যাটদের মধ্য থেকেই প্রবল বিরোধিতার সম্মুখীন হন। যার ফল নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে জো বাইডেন সরে যেতে বাধ্য হন এবং প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে কমলা হ্যারিসকে সমর্থন দেন। কমলা হ্যারিসকে পেয়ে ডেমোক্র্যাটরা যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচেন। কমলা হ্যারিসকে পেয়ে ডেমোক্র্যাটরা শুধু নির্বাচনে টিকেই থাকেননি, আরও চাঙ্গা হয়েছেন। 

আমেরিকার নির্বাচনের দিকে সারা পৃথিবীর মানুষের আগ্রহ। কারণ এই নির্বাচনের ফলাফল বিশ^কে দারুণভাবে প্রভাবিত করে। এর যেমন রাজনৈতিক প্রেক্ষিত আছে, তেমনি এর আর্থ-সামাজিক প্রভাবও অনেক। যেমন এই মুহূর্তে বিশ্বের বড় বড় যে সংঘাতগুলো ঘটছে তার প্রতি বর্তমান মার্কিন বাইডেন প্রশাসনের নীতির কথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। যা ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, মধ্য আমেরিকা, কিংবা দক্ষিণ এশিয়া থেকে শুরু করে চীন-ভিয়েতনাম বা কোরিয়া উপদ্বীপ পর্যন্ত বিস্তৃত। রাজনৈতিক অস্থিরতাসহ পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে যে সংঘাতগুলো টিকে আছে তার পেছনের রাজনীতিতে মার্কিন নীতির ভূমিকা অন্য যেকোনো দেশের থেকে বেশি। মূলত বিশ^ব্যাপী রাজনীতি ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে তাদের স্বার্থ ও প্রভাব বলয় ধরে রাখাই যার কারণ।

গত ২৭ জুন বর্তমান প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যে প্রথম প্রেসিডেন্টশিয়াল বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এর ফল স্বরূপ ডেমোক্র্যাটরা নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে প্রায় ছিটকে গিয়েছিল। দ্বিতীয় বিতর্কটি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে আগামীকাল ১০ সেপ্টেম্বর ফিলাডেলফিয়ায়। এবারের বিতর্কে মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার ডেমোক্র্যাট প্রতিদ্বন্দ্বী কমলা হ্যারিস। মনে করা হচ্ছে আগামী নভেম্বরে নির্বাচনের আগে আর কোনো নির্বাচনী বিতর্ক হওয়ার সম্ভাবনা নেই। সেই বিচারে এবারের বিতর্কে কে কেমন করেন তা দেখার জন্য মার্কিন জনগণ তো বটেই, সারা পৃথিবীর রাজনৈতিক মহল বুঁদ হয়ে থাকবে।

যদিও গত চার বছর ধরে ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তেমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা বা প্রভাব বিস্তার করতে না পারলেও নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আসার পর কমলা হ্যারিস একের পর এক চমক দেখিয়ে যাচ্ছেন। মার্কিন রাজনীতিতে একজন উদারপন্থি হিসেবে কমলার পরিচিতি আছে। তাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গর্ভপাত অধিকারের পক্ষে ভূমিকা রাখা একজন অন্যতম অধিকার কর্মী হিসেবে দেখা হয়। ২১ জুলাই থেকে তার নির্বাচনী ক্যাম্পেইন শুরু করার পর এবারের নির্বাচনে তিনি আবাসন সমস্যার সমাধান, দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য আর্থিক প্রণোদনা, ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি, শিশু যত্ন কেন্দ্রে সহায়তা, স্বাস্থ্য খাতে সহায়তায় প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছেন। অভিবাসন প্রশ্নে তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্পের থেকে নমনীয়, প্রতিরোধ থেকে প্রতিকারের প্রতি বেশি মনোযোগ দিতে চান। একই সঙ্গে ইসরায়েল প্রশ্নে তার অবস্থান হচ্ছে তিনি ইসরায়েলের আত্মরক্ষার অধিকারের পক্ষে কিন্তু হামাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সাধারণ মানুষের ওপর হামলা ও ক্ষয়ক্ষতির প্রশ্নে তিনি নীরব থাকবেন না।

মার্কিন রাজনীতিতে বড় ইস্যুগুলোর মধ্য রয়েছে গর্ভপাতের অধিকার, ধনীদের ওপর ট্যাক্স, গান ভায়োলেন্স নিয়ন্ত্রণ, অভিবাসন ইস্যু প্রভৃতি। ঐতিহাসিকভাবে ডেমোক্র্যাটরা অভিবাসন ইস্যুতে ও গর্ভপাতের অধিকার বিষয়ে কিছুটা উদারপন্থি, অন্যদিকে ধনীদের ওপর বেশি কর আরোপের ও গান (বন্দুক) ভায়োলেন্স নিয়ন্ত্রণে গান কন্ট্রোলের পক্ষে। অন্যদিকে রিপাবলিকানরা অভিবাসন ও গর্ভপাতের ইস্যুতে রক্ষণশীল, অর্থনৈতিক প্রশ্নে বড় ব্যবসায়ীদের সহায়ক করনীতির পক্ষে। এবারের নির্বাচনে টেসলার ইলান মাক্সসহ বড় বিলিনিয়ারা ডোনাল্ট ট্রাম্পকে সমর্থন জানিয়েছেন।  নীতিনির্ধারণে ‘গানলবির’ রিপাবলিকানদের ওপর ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ২০২৩ সালে বন্দুক সহিংসতায় প্রায় ৪৩ হাজার মানুষ নিহত হয়। অভিবাসন বন্ধে ডোনাল্ড ট্রাম্প মেক্সিকো বর্ডারে ওয়াল নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন, শিশুসহ শত শত মানুষকে ডিটেনশন কেন্দ্রে রেখেছিল। যদিও ইসরায়েল নীতিতে উভয় দল প্রায় একই নীতি ধারণ করে থাকে, কারণ মার্কিন রাজনীতিতে ইহুদি লবির ব্যাপক প্রভাব। সাধারণত ডেমোক্র্যাটরা মার্কিন প্রগতিশীল শ্রেণি ও অভিবাসী জনগোষ্ঠীর সমর্থন পেয়ে থাকে। তবে এবারে জো বাইডেনের ইসরায়েলের নীতি ও নেতানিয়াহুর প্রতি অন্ধ সমর্থন ও অর্থনৈতিক কারণে এই শ্রেণির ভোটার বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে ডেমোক্র্যাট সম্পর্কে একটা অনীহা ভাব তৈরি হয়। ফলে নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের প্রার্থী বদল শুধু জো বাইডেনের বয়সের ভার কিংবা প্রথম বিতর্কে বিব্রতকর অবস্থাই কারণ না এই ভোটারদের ডেমোক্রেটিক পার্টির সমর্থনে ফিরিয়ে আনাও ছিল একটি বড় উদ্দেশ্য। কারণ দোদুল্যমান রাজ্যগুলোতে ভোটের ফল পক্ষে আনতে এদের সমর্থন লাগবে।

নির্বাচনের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আসার পর ডোনাল্ট ট্রাম্প কমলা হ্যারিসের প্রতি তার আক্রমণ শানিত করেছেন। তিনি কমলাকে একজন মার্ক্সিস্ট বা কমিউনিস্ট বলছেন। তার মতে, কমলা হ্যারিস যে বিষয়গুলো নিয়ে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন তিনি সেই ইস্যুগুলো নিয়ে হোয়াইট হাউজে ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে থাকাকালীন সময়ে কোনো উদ্যোগ নেননি। তার মতে, কমলা হ্যারিসের অধীনে কোনো ভবিষ্যৎ নেই, কারণ তিনি আমাদের তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধে বাঁধিয়ে দিতে পারেন। অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটরা ডোনাল্ট ট্রাম্পকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একজন ক্ষতিকর চরিত্র হিসেবে উপস্থাপন করতে চাচ্ছেন।

নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় শামিল হওয়ার পরে কমলা হ্যারিস বেশ ভালো করছেন। আগস্টে তার ক্যাম্পেইন টিম ডোনাল্ট ট্রাম্পের তুলনায় প্রায় তিনগুণ তহবিল সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছেন। এ সময় তার টিম ৩৬১ মিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করেন, যেখানে ডোনাল্ট ট্রাম্পের টিম ১৩০ মিলিয়ন ডলার অর্থ সংগ্রহ করেন। নির্বাচনী প্রচারণায় কমলা হ্যারিসের সফলতা হচ্ছে নির্বাচনের মাঠে তিনি ডেমোক্র্যাটদের ঐক্যবদ্ধ করতে পেরেছেন। তবে বাইডেন প্রশাসনের ব্যর্থতা তাকে আদতে ভোগাতে পারে। যদিও সর্বশেষ গত ৬ সেপ্টেম্বরের জনমত জরিপ অনুযায়ী ডোনাল্ট ট্রাম্পের তুলনায় কমলা হ্যারিস ৩ শতাংশ ভোটে এগিয়ে রয়েছেন। যেখানে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি ৪৬ শতাংশ ভোটার সমর্থন ব্যক্ত করেছেন, সেখানে ৪৯ শতাংশ ভোটার কমলা হ্যারিসকে সমর্থন করছেন। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন শুধু ভোটের হিসাব নয়, এখানে একজন প্রার্থীকে নির্বাচিত হতে গেলে ন্যূনতম ২৭০টি ইলেকটোরাল ভোট নিশ্চিত করতে হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্যগুলোর মধ্যে কিছু কিছু অঙ্গরাজ্য আছে যেখানে সাধারণভাবে রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাটরা বিজয়ী হয়ে থাকেন এবং সেখানকার জন্য ইলেকট্রোরাল ভোটগুলো কবজা করে থাকেন।

সেই হিসেবে, প্রায় নিশ্চিত ভোট হিসেবে এখন পর্যন্ত ডোনাল্ড ট্রাম্প ২১৯টি ইলেক্টোরাল ভোট এবং কমলা হ্যারিস ২২৬টি ভোট পাবেন বলে মনে করা হচ্ছে। তবে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা পালন করে সুইং বা দোদুল্যমান স্টেটগুলো। যে প্রার্থী এগুলোতে ভালো করবেন সেই প্রার্থীই প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হন। ২০২০ সালের নির্বাচনে এ রকম ৭টি অঙ্গরাজ্যে ডোনাল্ট ট্রাম্প ও জো বাইডেনের মধ্যে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছিল। এই রাজ্যগুলো হচ্ছে উইসকনসিন, মিশিগান, পেনসিলভেনিয়া, নেভাদা, জর্জিয়া, নর্থ ক্যারোলিনা, আরিজোনা। এখনকার জনমত জরিপে এই রাজ্যগুলোর মধ্যে উইসকনসিন (১০টি ইলেকটোরাল ভোট), মিশিগান (১৫টি) ও পেনসিলভেনিয়াতে (১৯টি) কমলা হ্যারিস দুই থেকে এক শতাংশ ভোটে এগিয়ে আছেন, অন্যদিকে নেভাদা (৬টি), জর্জিয়া (১৬টি), নর্থ ক্যারোলিনা (১৬টি) ও আরিজোনা (১১টি)। এই রাজ্যগুলোতে উভয়ের জনসমর্থন প্রায় সমান সমান। এই রাজ্যগুলোতে মোট ৯৩টি ইলেকটোরাল ভোট রয়েছে। ২৭০টি ভোট পেতে ডোনাল্ট ট্রাম্পের জন্য নর্থ ক্যারোলিনা, আরিজোনার পাশাপাশি  তাকে জর্জিয়া, নেভাদা ও পেনসিলভেনিয়ার সমর্থন আদায় করতে হবে, একই কথা প্রযোজ্য কমলা হারিসের ক্ষেত্রে। তাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জনমত জরিপের গড় হিসাবে এগিয়ে থাকাই প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার নিশ্চয়তা দেয় না।

এই মুহূর্তে বিভিন্ন জরিপের ফলাফলে কমলা হ্যারিস এগিয়ে থাকলেও তার জন্য চূড়ান্ত নির্বাচনে জয়ী হওয়া মোটেও সহজ হবে না। কারণ রক্ষণশীল শে^তাঙ্গ আমেরিকানদের কাছে ডোনাল্ট ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা অনেক। পাশাপাশি ইহুদি লবির ভূমিকা কী হবে সেটাও একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। তারপর ফলাফল কোন দিকে যাবে তার অনেক কিছুই নির্ভর করছে ১০ সেপ্টেম্বরের বিতর্কের ওপর। বিতর্কে যে ভালো করবেন নির্বাচনে তার জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যাবে। তারপরও আমেরিকা সব সম্ভাবনার দেশ। এ দেশেই সব প্রতিকূলতা ও রক্ষণশীলতা ডিঙিয়ে বারাক ওবামা প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন আবার ডোনাল্ড ট্রাম্পও নির্বাচিত হয়েছিলেন। এ ছাড়া নির্বাচনী বৈতরণী পারি দিতে কমলা হ্যারিসের নারী পরিচয়ও একটা আলাদা অনুষঙ্গ হিসেবে থাকতে পারে। এখন দেখার বিষয়, কমলা হ্যারিস সব কিছু অতিক্রম করে নতুন কোনো ইতিহাস রচনা করতে পারেন কিনা!

লেখক: উন্নয়নকর্মী ও কলামিস্ট

psmiraz@yahoo.com