‘ছাত্র-জনতার আন্দোলনের চূড়ান্ত বিজয় এখনো আসেনি। গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী রাষ্ট্র সংস্কার নিয়ে এখনো অনেক কাজ করতে হবে। তবে যখন সংস্কারের প্রশ্ন আসে, তখনই বিভাজন তৈরি হয়েছে।’ গতকাল রবিবার চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় এসব কথা বলেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক হাসনাত আবদুল্লাহ। বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান অনুষদের মিলনায়তনে এই মতবিনিময় সভা হয়।
এদিকে মতবিনিময় সভা চলার সময় প্রশ্ন করা নিয়ে শিক্ষার্থীদের দুপক্ষের মধ্যে হট্টগোল হয়। পরে হাসনাত আবদুল্লাহসহ উপস্থিত অন্য সমন্বয়কদের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি শান্ত হয়।
ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী রাষ্ট্র সংস্কার নিয়ে চবির সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে এই মতবিনিময় সভার আয়োজন করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। এতে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের হাজারো শিক্ষার্থী এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক হাসনাত আবদুল্লাহ। এ ছাড়া রাসেল আহমেদ, খান তালাত মাহমুদ রাফিসহ চবির অন্য সমন্বয়করাও উপস্থিত ছিলেন।
মতবিনিময় সভায় হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, ‘যখন বিভাজনের সময় আসে, তখন আমরা এক হয়ে যাই, যেমন ৪৭-এর দেশভাগের সময়, ৯০-এর অভ্যুত্থানে, ২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানে আমরা এক হয়ে গিয়েছিলাম। এ সময় আমরা কাউকে জিজ্ঞেস করিনি কে সরকারি চাকরি করে, কে করে না, কে বিসিএস ক্যাডার, কে ক্যাডার না। এভাবে পৃথিবীর সবকিছুতেই ভাঙার সময় এক হয়ে যাই, কিন্তু যখন গঠনের সময় আসে, তখন বিভাজন হয়ে যাই। ২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানে ৫ আগস্টের আগে আমাদের মাঝে কোনো ধরনের বিভেদ ছিল না। যখন রাষ্ট্র সংস্কারের ও পুনর্গঠনের প্রশ্ন এসেছে, তখনই বিভাজন তৈরি হয়েছে। যেমন হয়েছিল ৪৭-এর পর মাত্র ৫ বছরের ব্যবধানে। ঠিক তেমনি ৭১ সালেও।’
সভায় শিক্ষার্থীরা রাষ্ট্র ও বিশ্ববিদ্যালয় সংস্কার প্রসঙ্গে সমন্বয়কদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। এ সময় শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বাগ্বিতণ্ডা ও উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
হট্টগোলের আগে হাসনাত আবদুল্লাহ মঞ্চে দাঁড়িয়ে বক্তব্য দিচ্ছিলেন। একই সঙ্গে তিনি শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন মতামত নিয়ে প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছিলেন। একপর্যায়ে স্নাতকোত্তরের এক শিক্ষার্থী সমন্বয়কদের প্রয়োজনীয়তা শেষ উল্লেখ করে কিছু প্রশ্ন করেন। ওই প্রশ্নকর্তার আশপাশ থেকে সময়ন্বকদের ব্যাপারে আরও কিছু আপত্তি আসে। সমন্বয়করা বিষয়গুলোর উত্তর দেন।
এই প্রশ্ন-উত্তরের মাঝে মাইক্রোফোন হাতে একজন ‘আন্দোলনের কর্মী’ পরিচয়ে নিজের বক্তব্য রাখেন। একপর্যায়ে তিনি বলেন, ‘আজকে যারা আন্দোলনের নাম দিয়ে আসতে চাচ্ছেন, তারা শেখ হাসিনার দোসর ছিল।’ হাসিনার দোসর বলার পর আশপাশ থেকে আপত্তি আসতে শুরু করে। কিছুক্ষণ পর দু-তিন শিক্ষার্থী কিছুটা উত্তেজিতভাবে ওই বক্তার দিকে এগিয়ে যেতে চাইলে সামনের শিক্ষার্থীরা তাদের গতিরোধ করেন ও বক্তার মাইক্রোফোন নিয়ে তাকে পাশে সরিয়ে দেন। এতেই শুরু হয়ে যায় হট্টগোল। কিছু শিক্ষার্থী উচ্চবাচ্য করতে থাকেন। প্রায় আধা ঘণ্টা ধরে চলে এমন অবস্থা। পরে হাসনাত আবদুল্লাহসহ উপস্থিত অন্য সমন্বয়কদের সহায়তায় পরিস্থিতি শান্ত হয়।
লালদীঘি ময়দানে মতবিনিময় : তরুণ প্রজন্মের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক হাসনাত আবদুল্লাহ বলেছেন, ‘স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে স্বাধীনতা রক্ষা করা কঠিন। অনেকেই আমাদের প্রশ্ন করেন এ সরকার কত দিন থাকবে। তাদের উদ্দেশে বলতে চাই, যত দিন না এ দেশের আইন বিভাগ, বিচার বিভাগ, আইনের শাসনের প্রতি জনগণের আস্থা ফিরে না আসবে, তত দিন পর্যন্ত থাকবে ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার। আমরা এই সরকারকে দেশের আর্থিক খাত, শিক্ষা খাত, বিচার বিভাগ, আইন বিভাগ সংস্কারে সময় এবং সমর্থন দিয়ে যাব।’ গতকাল বিকেল সাড়ে ৪টায় নগরের লালদীঘি ময়দানে গণ-অভ্যুত্থানের ছাত্র-নাগরিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় দেওয়া বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
দুর্নীতিবাজদের সতর্ক করে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, ‘ছাত্রদের আন্দোলনটি হয়েছিল ফ্যাসিস্টদের বিরুদ্ধে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে, অসাম্যের বিরুদ্ধে, সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ও টেন্ডারবাজদের বিরুদ্ধে। আমরা টেন্ডারবাজ এবং দুর্নীতিবাজদের সতর্ক করতে চাই। আপনারা ১৬ বছর একটি দলের ছত্রছায়ায় ছিলেন। এখন যদি আর একটা দলের ছত্রছায়ায় এসে আপনারা দুর্নীতি করার চেষ্টা করেন, ছাত্র-জনতা আপনাদের দেখে নেবে। আমরা এখনো ত্যাগ করতে প্রস্তুত। আমরা বুলেট-বোমাকে ভয় পাই না। আপনারা সাবধান হয়ে যান। প্রশাসনে যারা রয়েছেন, তারা অন্তর্বর্তী সরকারকে সহযোগিতা করুন।’