শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর গত ৮ আগস্ট অন্তর্র্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার প্রথমেই মূল্যস্ফীতি কমানোকে অন্যতম চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করে। সরকার গঠনের কয়েক দিনের মধ্যেই বিভিন্ন কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে পণ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে রাজধানীর কাঁচাবাজারগুলো তদারকি করা হচ্ছে। পাশাপাশি বাজারে পণ্যের দাম স্থিতিশীল রাখার জন্য পেঁয়াজ, আলু ও ডিমের আমদানি শুল্ক প্রত্যাহার করা হয়েছে। আশার কথা, আগস্টে গড় মূল্যস্ফীতি ও খাদ্য মূল্যস্ফীতি দুটোই কমেছে। আগস্টে গড় মূল্যস্ফীতি কমে ১০ দশমিক ৪৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, জুলাইয়ে যা ছিল ১১ দশমিক ৬৬ শতাংশ। এ ছাড়া খাদ্য মূল্যস্ফীতিও কিছুটা কমে ১১ দশমিক ৩৬ শতাংশে এসেছে, আগের মাসে তা ছিল ১৪ দশমিক ১ শতাংশ। আবার হাসিনা সরকার অসময়ে টাকা ছাপিয়ে মূল্যস্ফীতি বাড়িয়েছিল। দেশ রূপান্তরে সোমবার দুটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। সিপিআই তথ্যে দেখা যায়, দেশের গড় মূল্যস্ফীতি এখন ১০ দশমিক ৪৯ শতাংশ। আওয়ামী সরকারের বিদায়ী মাস জুলাইয়ে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ১১ দশমিক ৬৬ শতাংশ। নতুন সরকার আসার পর দেশে পণ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে চাঁদাবাজি বন্ধ হওয়ায় এর প্রভাব পড়েছে খাদ্যপণ্যসহ অন্য পণ্যগুলোতে। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পাইকারি বাজারসহ পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি হওয়ায় দেশে পণ্যমূল্য বেড়ে যাওয়ার অভিযোগ করেছিলেন খুচরা বিক্রেতারা। তবে পটপরিবর্তনের পর এখন এ ধরনের অভিযোগ কম আসছে। ফলে কাঁচামালসহ অন্য পণ্যের দামও কমছে। এটা অবশ্যই শুভ লক্ষণ।
চলতি বছরের শুরুতে আইএমএফ বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে তাদের এক মূল্যায়নে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে তিনটি পথের কথা বলেছিল অ্যাকটিভ, হকিশ ও দোভিশ। অ্যাকটিভ পলিসির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতি প্রান্তিকে প্রত্যাশার তুলনায় মূল্যস্ফীতি কমানোর বিষয়ে নীতি সুদহার নির্ধারণ করবে, চাহিদার চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখবে এবং নীতি সুদহারের কাছাকাছি পর্যায়ে যাতে কলমানি সুদের হার বজায় থাকে সেটি নিশ্চিত করবে। হকিশ পলিসির ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংক চলতি অর্থবছরের মধ্যে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রায় মূল্যস্ফীতি নামিয়ে আনতে পদক্ষেপ নেবে। হকিশ পলিসি অনুসরণ করলে দ্রুত মূল্যস্ফীতি কমতে থাকবে, তবে এটি হবে ব্যয়বহুল। এক্ষেত্রে আগ্রাসীভাবে সুদের হার বাড়াতে হবে, অন্যদিকে রাশ টানতে হবে সরকারের ব্যয়ে। আর দোভিশ পলিসির ক্ষেত্রে সংস্থাটি বলেছে, এটি বাংলাদেশ ব্যাংকের (সেই সময়) নীতির সঙ্গে যায় এবং এ নীতি চলতি অর্থবছরের শেষ পর্যন্ত বজায় থাকবে। আইএমএফ মনে করছে, বাংলাদেশের জন্য হকিশ ও দোভিশ পলিসির মাঝামাঝি নীতি অনুসরণ করা সুবিধাজনক হবে।
অর্থনীতিবিদদের পর্যবেক্ষণ, সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতার কারণেই মূলত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল উচ্চ মূল্যস্ফীতির হার যা বর্তমানে অর্থনীতির সূচকগুলোকে টেনে ধরছে, অস্বস্তি তৈরি করছে। ফলে ডলারের দাম যেমন বেড়েছে, তেমনি ঋণের সুদের হারও বেড়েছে। এতে শিল্প উৎপাদন, ব্যবসা-বাণিজ্যের ব্যয় বেড়েছে। তখন ঋণের সুদহার বাড়িয়ে সামাল দেওয়ার চেষ্টাও কোনো কাজে আসেনি। বিশ্লেষকরা বলছেন, লক্ষ্যমাত্রা অনুসারে মূল্যস্ফীতি যতদিন পর্যন্ত সহনীয় পর্যায়ে না আসবে ততদিন পর্যন্ত সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি বজায় রাখা দরকার। আমাদের দেশের অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট অনুযায়ী দেখতে হবে, কেন মূল্যস্ফীতি ঘটেছে এবং কী ধরনের সমাধান দরকার? মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে স্বস্তিদায়ক রিজার্ভ রেখে বাকিটা দিয়ে আমদানিতে ব্যয় করা হবে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কথার পুরোপুরি বাস্তবায়ন দেখতে চাই। এর ফলে পণ্যমূল্য নিশ্চিতভাবেই কমে আসবে। নিয়মিত মূল্যস্ফীতির প্রকৃত তথ্য প্রকাশ করার কথা জানিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। এটা স্বস্তিদায়ক খবর যে, নিয়মিতভাবে মূল্যস্ফীতির প্রকৃত তথ্য প্রকাশ করা হবে। তাতে জনগণ বাজার পরিস্থিতি অনুযায়ী, ব্যয় সংকোচন-প্রসারণ করতে পারবে।
আশা করা যায়, অল্প সময়ের মধ্যেই মূল্যস্ফীতির পাগলা ঘোড়া নিয়ন্ত্রণে আসবে। বিশ্বাস করি এ মুহূর্তে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং সুষ্ঠু বাজার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে মানুষকে স্বস্তিতে রাখাই অন্তর্বর্তী সরকারের আন্তরিক চাওয়া। এক্ষেত্রে তাদের আন্তরিকতার অভাব রয়েছে, এমনটি যেন কেউ না বলতে পারেন।