আড়াই বছর ধরে রাশিয়ার সঙ্গে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ করছে ইউক্রেনের সেনাবাহিনী। দীর্ঘ এই যুদ্ধে দেশটির সামরিক বাহিনীর অনেক ইউনিট ধ্বংস হয়ে গেছে। নতুন সেনাসদস্য মোতায়েনের হারও কমেছে উল্লেখযোগ্য হারে। এর ফলে যুদ্ধক্ষেত্রে থাকা সেনাদের বড় একটি অংশ ক্লান্ত ও আশাহত হয়ে পড়েছে। তাতে রুশ সেনাদের অগ্রগতি থামানো এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে পড়েছে ইউক্রেনের জন্য। এরই মধ্যে ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলের কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ শহর পোকরোভস্কের দিকে অনেকটাই অগ্রসর হয়েছে রুশবাহিনী। এ ছাড়া পূর্বাঞ্চলের অন্যান্য সম্মুখসারির পদাতিক বাহিনীতে পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।
সম্প্রতি ইউক্রেনে যুদ্ধরত সামরিক বাহিনীর ছয় শীর্ষ কর্মকর্তা ও কমান্ডার মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের সঙ্গে কথা বলেন। এক প্রতিবেদনে সংবাদমাধ্যমটি জানায়, দীর্ঘ সময় ধরে চলমান যুদ্ধের বিভীষিকায় চরম মনোবল সংকটে ভুগছে ইউক্রেনের সেনারা। যুদ্ধ পরিস্থিতির নেতিবাচক প্রভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন তারা। পাশাপাশি অবাধ্য ও দলত্যাগ সেনাবাহিনীর জন্য বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত সৈন্যদের মধ্যে এই প্রবণতা বেশি।
সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে তাদের কথা বলার অনুমতি না থাকায়, নিজেদের নাম পরিবর্তন বা গোপন রাখার অনুরোধ জানিয়েছেন এই সেনা কর্মকর্তারা। তেমনই এক সেনা কর্মকর্তা ডিমা। ব্যাটালিয়ন কমান্ডার হিসেবে ৮০০ সেনার দায়িত্বে ছিলেন তিনি। বেশ কিছু ভয়ংকর ও রক্তাক্ত যুদ্ধে রুশ সেনাদের মোকাবিলা করেছেন। সবশেষ পোকরোভস্ক শহরের কাছে যুদ্ধ করেন ডিমা। শহরটি বর্তমানে রাশিয়ার কাছে পতনের দ্বারপ্রান্তে। যুদ্ধে ডিমার ব্যাটালিয়নের বেশির ভাগ সেনার মৃত্যু হয়েছে। যারা বেঁচে গেছেন, তারাও মারাত্মকভাবে আহত হয়ে যুদ্ধক্ষেত্র ত্যাগ করেছেন। যুদ্ধের এই বিভীষিকা বর্ণনা করে ডিমা জানান, চোখের সামনে একের পর এক মৃত্যু তিনি আর নিতে পারছিলেন না। তাই যুদ্ধক্ষেত্র থেকে অব্যাহতি নিয়ে কিয়েভে সামরিক বাহিনীর দাপ্তরিক কাজে যোগ দিয়েছেন তিনি।
যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুদের নিক্ষেপ করা ড্রোন, কামান ও মর্টারের গোলার মুখোমুখি হতে হয় সেনাদের। ফলে শত্রুর আক্রমণ থেকে বেঁচে যাওয়া সেনাদের মধ্যে যুদ্ধে ফেরার প্রবণতা কমেছে, বিশেষ করে নতুন সেনাসদস্যদের। কেউ সরাসরি অস্বীকৃতি জানান, কেউ আবার সেনাবাহিনী ছেড়ে দেওয়ার উপায় খোঁজেন এমনটাই জানিয়েছেন সাম্প্রতিক সময়ে পোকরোভস্কে লড়াই করা আরেকটি ইউনিটের কমান্ডার।
যুদ্ধ শুরুর দিকে যারা স্বেচ্ছায় অংশ নিয়েছিলেন, তাদের চেয়ে নতুনদের একদমই ভিন্ন পরিস্থিতির মুখে পড়তে হয়েছে। গত বছর যুদ্ধে সেনা বাড়াতে সেনাবাহিনীতে যোগদানে বয়সসীমা কমানোর নতুন আইন কার্যকর হয় ইউক্রেনে। ফলে বাধ্য হয়েই যুদ্ধে যোগ দিতে হয়েছে বহু ইউক্রেনীয় তরুণকে। ফলে সরকার এ আইনের পরিবর্তন না করা পর্যন্ত বিশেষ অনুমতি ছাড়া এসব সেনা যুদ্ধক্ষেত্র ছাড়তে পারছেন না। তবে এর অনেক আগেই সেনা ইউনিটগুলোয় শৃঙ্খলা-সংক্রান্ত সমস্যা দেখা দিয়েছিল। গত বছর সময়মতো পশ্চিমাদের অস্ত্র সহায়তা না পাওয়ায় গোলাবারুদের তীব্র সংকটে পড়ে ইউক্রেনের সেনারা। তাতে সেনাসদস্যদের মনোবলে ব্যাপক ফাটল ধরে। ইউক্রেনীয় সেনাসদস্যদের দাবি, যুদ্ধক্ষেত্রে প্রায় সময়ই ভালো অবস্থানে থাকলেও, অস্ত্র ও গোলার অভাবে শক্রপক্ষকে প্রতিরোধে ব্যর্থ হয়েছেন তারা। ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলের আরেক গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধক্ষেত্র চাসিভ ইয়ার এলাকায় যুদ্ধ করছেন অ্যান্দ্রি হোরেৎস্কি ও তার ইউনিট। তিনি জানান, ক্রমাগত বিমান ও ড্রোন হামলার কারণে সেনারা লম্বা সময় ধরে ইউনিটে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে একদিকে যেমন মনোযোগে বিঘ্ন ঘটছে, তেমনি মানসিকভাবেও পিছিয়ে পড়ছেন সেনারা। অনেকে আবার পদাতিক বাহিনীকে যথেষ্ট সহায়তা দিতে না পারায় অপরাধবোধে ভোগার কথাও জানিয়েছেন সিএনএনকে।
ইউক্রেনের পার্লামেন্টের দেওয়া তথ্যই বলছে যুদ্ধাবস্থার অবনতি হওয়ায় বিপুলসংখ্যক সৈন্য হাল ছেড়ে দিতে শুরু করেছেন। চলতি বছরের প্রথম চার মাসেই প্রায় ১৯ হাজার সেনার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলার প্রক্রিয়া শুরু করে ইউক্রেনের প্রসিকিউটররা। দেশটির প্রায় ১০ লাখেরও বেশি বেসামরিক নাগরিক দেশটির প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা বাহিনীতে কাজ করছেন।