এক নজরে কমলা ট্রাম্পের বিতর্ক

নানা ইস্যুতে তর্ক-বিতর্ক, পাল্টাপাল্টি আক্রমণ ও বাক্যবাণে জর্জরিতের পর শেষ হয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের মূল দুই প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প ও কমলা হ্যারিসের সরাসরি বিতর্ক। ৯০ মিনিটের বিতর্ক জুড়েই একে অপরকে দোষারোপ করে গেছেন দুজন।

যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়া অঙ্গরাজ্যের ফিলাডেলফিয়ায় গতকাল মঙ্গলবার স্থানীয় সময় রাত ৯টায় (বাংলাদেশ সময় আজ বুধবার) বিতর্ক শুরু হয়ে শেষ হয় সাড়ে ১০টায়। মার্কিন সম্প্রচারমাধ্যম এবিসি নিউজের আয়োজনে বিতর্কটি শুরু হয়।

বিতর্ক মঞ্চে প্রবেশ করেই ট্রাম্পের দিকে এগিয়ে যান এবং হাত বাড়িয়ে দেন কমলা। একে ওপরের সাথে করমর্দন করেন ট্রাম্প ও হ্যারিস। অর্থনীতি দিয়েই বিতর্কের শুরু করেন তাঁরা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে এই প্রথম কমলা ও ট্রাম্প সরাসরি বিতর্কে অংশ নিলেন।

একনজরে কমলা-ট্রাম্পের বিতর্কে উঠে আসা বিষয়গুলো জেনে নেওয়া যাক—

১. বিতর্কের শুরু হয় অর্থনীতি, বেকারত্ব, কর্মসংস্থান বিষয়গুলো দিয়ে। বক্তব্যের শুরুতেই ট্রাম্পকে আক্রমণ করে কমলা বলেন, তিনি (ট্রাম্প) ক্ষমতা ছাড়ার সময় মার্কিন কর্মসংস্থান অত্যন্ত বাজে অবস্থায় ছিল। বেকারত্বের হার ছিল মহামন্দার পর সবচেয়ে বাজে।

ট্রাম্পের নীতি বাস্তবায়িত হলে আগামী বছরের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে মন্দা শুরু হয়ে যাবে বলে অভিযোগ করেন কমলা। ধনকুবের ও করপোরেশনগুলোর করছাড় দেওয়া ছাড়া মার্কিনিদের জন্য ট্রাম্পের কোনো পরিকল্পনা নেই বলেও জানান কমলা।

এ সময় অর্থনীতিতে সবার জন্য সুযোগ তৈরি করা এবং আবাসনের খরচ কমিয়ে আনার কথা জানান ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস।

তবে কমলার তীব্র সমালোচনার জবাব দেন ট্রাম্প। বলেন, কমলার নিজস্ব কোনো পরিকল্পনা নেই। তিনি বাইডেনের পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করছেন। এছাড়া অন্য দেশের ওপর শুল্ক বসানোর পরিকল্পনার কথা জানান ট্রাম্প। বলেন, মাসুলের অর্থ দিয়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের মানুষের কর কমাবেন।

২. গর্ভপাতের অধিকারের বিষয় নিয়ে তীব্র তর্ক-বিতর্ক হয় কমলা ও ট্রাম্পের। বিতর্কে এ বিষয়ে একে অপরের দলের নীতিকে দোষারোপ করেছেন দুই প্রার্থী।

বিতর্কে গর্ভপাতের বিষয়ে ট্রাম্প বলেন, ডেমোক্রেটরা নয় মাসের গর্ভাবস্থায় গর্ভপাতের অধিকার দিতে চায়। নারীদের গর্ভপাতের অধিকারের বিষয়টি নিষ্পত্তির অধিকার অঙ্গরাজ্য পর্যায়ে ফিরিয়ে আনতে সহায়তা করবেন বলেও জানান সাবেক প্রেসিডেন্ট।

ট্রাম্প বলেন, কিছু কিছু অঙ্গরাজ্য জন্মের পর নবজাতককে মৃত্যুদণ্ডের অনুমতি দেয়। ট্রাম্পের অভিযোগের পর কমলা বলেন, এই দেশে এমন কোনও রাজ্য নেই যেখানে একটি শিশুর জন্মের পরে হত্যা করা বৈধ।

হ্যারিস উল্লেখ করেন, ট্রাম্প সুপ্রিম কোর্টে যে তিন বিচারপতিকে নিয়োগ করেছিলেন, ‘তারাই দুই বছর আগে নারীদের গর্ভপাতের অধিকার কেড়ে নিয়েছিল।‘

এমন সময় আবেগপ্রবণ হয়ে উঠেন ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা। তিনি বলেন, নারীরা এটা চায় না।

৩. কমলা হ্যারিস নির্বাচনে জয়ী হলে ইসরায়েলের অস্তিত্ব হুঁমকির মুখে পড়বে বলে বিতর্কে দাবি করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি অভিযোগ করেন, কমলা ইসরায়েলকে ঘৃণা করেন। ট্রাম্প আরও বলেন, তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট থাকলে এই যুদ্ধ শুরু হতোই না।

তবে ট্রাম্পের অভিযোগ অস্বীকার করে কমলা গাজা যুদ্ধের বিষয়ে তাঁর অবস্থান স্পষ্ট করেন। বলেন, অবিলম্বে এই যুদ্ধ বন্ধ করতে হবে। যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়ে গাজার পুনর্গঠনের জন্য দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের পক্ষে নিজের অবস্থান জানান কমলা।

৪. বিতর্কে উঠে আসে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রসঙ্গও। এক প্রশ্নের জবাবে কমলা বলেন, তাঁর সঙ্গে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির ভালো সম্পর্ক রয়েছে।

ট্রাম্পকে উদ্দেশ করে কমলা বলেন, ‘আপনি এখন আর প্রেসিডেন্ট নেই—এতে আমাদের ন্যাটো (পশ্চিমা সামরিক জোট) মিত্ররা খুবই কৃতজ্ঞ। অন্যথায় পুতিন কিয়েভে (ইউক্রেনের রাজধানী) বসে ইউরোপের বাকি অংশের ওপর নজরদারি করতেন।

এ সময় ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা বলেন, ‘পুতিন একজন স্বৈরশাসক। তিনি সহজেই আপনাকে (ট্রাম্প) দুপুরের খাবার হিসেবে খেয়ে ফেলবে।‘

যুদ্ধে ইউক্রেনের জয় দেখতে চান কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, তিনি চান এই যুদ্ধ বন্ধ হোক।

৫. বিতর্কের এক পর্যায়ে আলোচনায় উঠে আসে ২০২১ সালের ৬ জানুয়ারি ক্যাপিটল হিলে ট্রাম্পের সমর্থকদের হামলার ঘটনা। উপস্থাপক ট্রাম্পের কাছে সেই ঘটনায় তার ভূমিকা জানতে চান। জবাবে ট্রাম্প বলেন, দেশপ্রেম লালন করে তিনি শান্তিপূর্ণভাবে বক্তব্য দিয়েছেন। পরে কিছু বলেননি।

ট্রাম্প আরও বলেন, তাঁর বক্তব্যে সহিংসতার কোনো আহ্বান ছিল না। বরং ক্যাপিটল হিলে বাড়তি নিরাপত্তা নিশ্চিত না করায় প্রতিনিধি পরিষদের তৎকালীন ডেমোক্রেট দলীয় স্পিকার ন্যান্সি পেলোসিকে দোষারোপ করেন ট্রাম্প।

তবে এ প্রসঙ্গে কমলা অভিযোগ করেন ক্যাপিটল হিলে হামলা করতে সহিংসতা উসকে দিয়েছিলেন ট্রাম্প। সাবেক প্রেসিডেন্ট ঠিক সেই কারণেই অভিযুক্ত ও অভিশংসিত হয়েছেন।

৬. নানা ইস্যুতে বিতর্কের এক পর্যায়ে ট্রাম্প ও কমলা একে অপরকে ব্যক্তিগত আক্রমণ করেন। বিশ্ব এবং সামরিক নেতারা ট্রাম্পকে সম্মান করেন না, তাকে নিয়ে হাসাহাসি করেন বলে মন্তব্য করেন কমলা।

অন্যদিকে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন হ্যারিসকে সমর্থন করায় বাইডেন তাকে (হ্যারিসকে) ঘৃণা করেন বলে মন্তব্য করে বসেন ট্রাম্প।

এছাড়া তিনি বাইডেন এবং হ্যারিসকে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে খারাপ প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্ট অভিহিত করেন এবং বিতর্কের অবসান ঘটান।