যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে প্রথমবার একই মঞ্চে মুখোমুখি হয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী কমলা হ্যারিস ও রিপাবলিকান প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প। বাংলাদেশ সময় গতকাল বুধবার দুই প্রতিদ্বন্দ্বী সরাসরি টেলিভিশন বিতর্কে অংশ নেন। এবিসি নিউজ এ বিতর্কের আয়োজন করে। ফিলাডেলফিয়ার ন্যাশনাল কনস্টিটিউশন সেন্টারে অনুষ্ঠিত এই বিতর্কে অর্থনীতি, বেকারত্ব, কর্মসংস্থান, অভিবাসনসহ নানা বিষয়ে নিজেদের পরিকল্পনার কথা জানান দুজনেই। ৯০ মিনিটের এই বিতর্কের পুরোটা সময় ধরেই একে অন্যকে দোষারোপ করে গেছেন ট্রাম্প-কমলা। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে দুই প্রার্থীর বিতর্ক অনুষ্ঠানকে বেশ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়। সে ধারবাহিকতায় এই বিতর্কে কে জয়ী হয়েছেন সে প্রশ্ন ঘুরে ফিরছে সবার মনে। যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যমগুলোর জরিপ বলছে, বিতর্কে কমলার কাছে ধরাশায়ী হয়েছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ ভোটারদের মধ্যে এই নির্বাচনী বিতর্ক বেশ প্রভাব ফেলে। দেশটির নির্বাচন বিশ্লেষকদের বরাত দিয়ে ফক্স নিউজ জানিয়েছে, বিতর্কে কমলার কাছে পাত্তা পাননি ট্রাম্প। বিতর্ক বিষয়ে ভোটারদের মতামত বিশ্লেষণ করেছে ওয়াশিংটন পোস্ট। তাদের জরিপেও এগিয়ে রয়েছেন কমলা। ফক্স নিউজের রাজনৈতিক বিশ্লেষক ব্রিট হিউম বলেন, ‘বিতর্কের জন্য কমলা খুব ভালোভাবে প্রস্তুতি নিয়ে এসেছিলেন। পুরোটা সময় নিজের উত্তর নিয়ে তিনি সচেতন ছিলেন।’ বিতর্কের কমলা হ্যারিসের জয় সাধারণ ভোটারদের মধ্যে বেশ সাড়া ফেলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের নিবন্ধিত ভোটারদের একটি অংশ মনে করছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে কমলাই বেশি উপযুক্ত। যাদের মধ্যে রয়েছেন অনেক রিপাবলিকান ভোটাররাও। প্রথম বিতর্ক শেষ হতেই নির্বাচনের আগে ট্রাম্পের সঙ্গে আরেকটি ‘বিতর্ক’ আয়োজনের আহ্বান জানিয়েছে কমলা হ্যারিসের প্রচারণা শিবির। কমলার প্রচারশিবিরের মুখপাত্র জেন ও’ম্যালি ডিলন এক বিবৃতিতে আগামী মাসে ওই বিতর্ক আয়োজনের পরামর্শ দিয়েছেন। ডিলন বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ ব্যালট বাক্সে জবাব দেবেন, তারা কমলা হ্যারিসের সঙ্গে এগিয়ে যেতে চান, নাকি ট্রাম্পের সঙ্গে পিছিয়ে যেতে চান। তবে, এরই মধ্যে বিতর্কের আয়োজক প্রতিষ্ঠান এবিসি নিউজের সমালোচনা করেছেন রিপাবলিকানরা। তাদের অভিযোগ, আয়োজকরা পক্ষপাতমূলক আচরণ করেছেন। বিতর্ক মঞ্চে উঠেই সাবেক প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে করমর্দন করেন কমলা। এই প্রথম তারা মুখোমুখি হলেন। দেড় ঘণ্টার বিতর্কে কমলা-ট্রাম্প কথার লড়াই চালান। যুক্তি উপস্থাপন, পাল্টাপাল্টি আক্রমণে একে অন্যকে নাস্তানাবুদ করার চেষ্টা করেন। তবে পুরো বিতর্কে কমলার বিরুদ্ধে খুব একটা সুবিধে করে উঠতে পারেননি ট্রাম্প। বিতর্কে হ্যারিসের আক্রমণাত্মক বক্তব্যের সামনে ট্রাম্পকে রক্ষণাত্মক অবস্থান নিতে দেখা গেছে। হ্যারিস একের পর এক তোপ দাগছেন, আর প্রতিপক্ষকে তুলোধুনা করতে ব্যগ্র ট্রাম্প প্রতি পদে ভুল করছেন। এমনকি ট্রাম্পের আগের কৃতকর্মের জন্য তাকে কটাক্ষ করতে বিন্দুমাত্র ছাড় দেননি হ্যারিস।
বিতর্কের শুরুতেই ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বাজে ও ভঙ্গুর অর্থনীতি ব্যবস্থা রেখে যাওয়ার অভিযোগ করেন হ্যারিস। ট্রাম্প ক্ষমতা ছাড়ার সময় যুক্তরাষ্ট্রে বেকারত্বের হার সর্বোচ্চ পর্যায়ে ছিল উল্লেখ করে কমলা বলেন, ‘চার বছর ধরে আমরা তার রেখে যাওয়া ময়লা পরিষ্কার করছি।’ দেশজুড়ে নারীদের গর্ভপাতের অধিকার কেড়ে নেওয়ার বিষয়ে ট্রাম্পের দিকে আঙুল তোলেন কমলা। তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের নারীদের জন্য এই আইন অত্যন্ত অবমাননাকর।’ এমনকি অভিবাসন ইস্যুতেও কমলার বিপক্ষে দাঁড়াতে পারেননি ট্রাম্প। বিশাল জনসভা ও প্রতিপক্ষকে তাচ্ছিল্য করে কথা বলা ট্রাম্পের মূল দুটি কৌশলই হ্যারিসের সামনে কার্যত ব্যর্থ হয়। তবে সীমান্ত ও অভিবাসন নিয়ে কমলার বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠেন ট্রাম্প। অর্থনীতি ও মুদ্রাস্ফীতি নিয়েও সরব হয়ে ওঠেন তিনি। তবে এ ক্ষেত্রেও ট্রাম্পের কোর্টে বল ঠেলে দেন হ্যারিস। ট্রাম্পের চড়া আমদানি শুল্কের পরিকল্পনার কঠোর সমালোচনা করেন তিনি। সেই সঙ্গে আফগান ইস্যুতেও ট্রাম্পকে ধুয়ে দেন কমলা হ্যারিস। তিনি বলেন, তালেবান কর্মকর্তাদের সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের সমঝোতাই যুক্তরাষ্ট্রের আফগান ব্যর্থতার সূত্রপাত। ফলে আরেক মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হওয়ার জন্য ট্রাম্প আদৌ উপযুক্ত ব্যক্তি কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন কমলা হ্যারিস। সময় গড়ানোর সঙ্গে ট্রাম্পকে বিভিন্নভাবে নাস্তানাবুদ করতেই থাকেন হ্যারিস। এগুলো উপেক্ষা করা সম্ভব হলেও প্রতিটি বিষয়ে উত্তর দিতে গিয়ে আরও ফাঁদে জড়িয়ে পড়েন ট্রাম্প।
জর্জ ওয়াশিংটন থেকে জো বাইডেন। ১৭৮৯ সাল থেকে এখনো পর্যন্ত ৪৫ জন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রে। তবে দেশটির ইতিহাসে হোয়াইট হাউসে এখন পর্যন্ত কোনো নারী নেতৃত্ব আসেননি। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম নারী ভাইস প্রেসিডেন্টও কমলা হ্যারিস। এবার ট্রাম্পের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জিতলে ইতিহাস গড়বেন তিনি। এবার প্রেসিডেন্ট হিসেবে কমলা সে ইতিহাস গড়তে পারেন কি না, তা জানতে অপেক্ষা আগামী ৫ নভেম্বর পর্যন্ত।