এক মাস ধরে অডিটর পদকে ১১তম গ্রেড থেকে ১০ম গ্রেডে উন্নীত করার দাবিতে অবস্থান কর্মসূচি পালন করে যাচ্ছেন দেশের নিরীক্ষা ও হিসাব বিভাগের অডিটররা। তারা একই পদে দুই গ্রেডের বিষয়টি বৈষম্য দাবি করে এ কর্মসূচি পালন করছেন। ফলে মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (সিএজি), হিসাব মহানিয়ন্ত্রক (সিজিএ) ও কন্ট্রোলার জেনারেল অব ডিফেন্স ফাইন্যান্স (সিজিডিএফ) কার্যালয় এবং এর অধীন সব দপ্তরের কার্যক্রম বিঘ্নিত হচ্ছে। ফলে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে দপ্তরগুলোর অধীন সেবাগ্রহীতাদের।
জানা গেছে, পেনশনারের লাম্পগ্রান্ট বিল, আনুতোষিকসহ জিপিএফের চূড়ান্ত পরিশোধের অনেক কাজই অডিটরের আইডি দিয়ে আইবাস সফটওয়্যারে এন্ট্রি করা হয়। মূলত গত এক মাস ধরে অডিটররা আন্দোলনে থাকায় এ কাজগুলো বন্ধ রয়েছে। একই রকমভাবে পে-ফিক্সেশন বন্ধ রাখায় ও শেষ বেতনের প্রত্যয়নপত্র বা এলপিসি না দিতে পারায় অনেকে বেতনও তুলতে পারছেন না। কারও জিপিএফ এন্ট্রি করা যাচ্ছে না, আনুষঙ্গিক বিল প্রদান, আর্থিক অথরিটির পৃষ্ঠাঙ্কন, বিদেশের মিশনসমূহে রেমিট্যান্স পাঠানো কোনো কাজই করা যাচ্ছে না। দেশের সরকারি, বেসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কোনো বিলই পাস হচ্ছে না। ফলে দেশের আর্থিক কার্যক্রম স্থবিরতা দেখা দিয়েছে।
এদিকে কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেলের (সিএজি) কার্যালয়ের আওতাধীন অডিটরদের গ্রেড বৈষম্য দূর করে ১১ থেকে ১০ম গ্রেডে উন্নীত করা ও বর্তমান অর্থ সচিবসহ সিএজি কার্যালয়ে কর্মরত বিগত সরকারের দোসরদের পদত্যাগের দাবি জানিয়ে গতকাল রবিবার সংবাদ সম্মেলন করেছে অডিটর ১০ম গ্রেড বাস্তবায়ন সমন্বয়ক কমিটি।
অডিটররা বলছেন, রবিবারের মধ্যে অডিটর পদকে ১০ম গ্রেডে উন্নীত করে সরকারি আদেশ (জিও) জারি না করা হলে ১৭ সেপ্টেম্বর থেকে রাষ্ট্র সংস্কারের নির্দেশনা অনুযায়ী অডিট অ্যান্ড অ্যাকাউন্টস বিভাগের সংস্কারের জন্য কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে।
সংবাদ সম্মেলনে অডিটরদের পক্ষে লিখিত বক্তব্যে আহমেদুর রহমান ডালিম বলেন, ‘একই পদে দুই ধরনের বেতন থাকাটা কখনো প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হতে পারে না। এমন বিষয় কর্তৃপক্ষকেই নৈতিকভাবে এবং দায়িত্বশীল হয়ে সমাধান করা প্রয়োজন।’ তিনি বলেন, ২০১৬ সালের ২ ফেব্রুয়ারি সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে করা রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সিএজি ও অধীন অফিসের পদকে ১১তম গ্রেড থেকে ১০ম গ্রেডে উন্নত করার পক্ষে রায় দেওয়া হয়। পরে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ শুধু ৬১ জন মামলার পক্ষভুক্ত রিট আবেদনকারীকে ১১তম থেকে ১০ম গ্রেডে উন্নীত করার আদেশ দেওয়া হয়। পরে অন্যান্য অডিটর ধারাবাহিক কনটেম্পট পিটিশন দায়ের করতে থাকে এবং আদালত সব মামলায় অডিটর পদকে ১০ম গ্রেডে উন্নীত করার পক্ষে রায় দেয়। কিন্তু অর্থ বিভাগের একটি দুষ্টচক্রের কারণে আর কেউ ১০ম গ্রেডে উন্নীত হতে পারেননি।
আহমেদুর রহমান ডালিম বলেন, গত ১২ আগস্ট অ্যাডিশনাল ডেপুটি কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল (পার্সোনাল) অর্থ বিভাগের সচিবের কাছে বিষয়টি সুরাহা করার জন্য তাগিদ দিয়ে একটি চিঠি দেন। পরদিন (১৩ আগস্ট) অর্থ বিভাগের প্রশাসন ও সমন্বয়ে অনু বিভাগের প্রশাসন-২ অধিশাখা আইন ও বিচার বিভাগের সচিবের কাছে ১০ম গ্রেডে উন্নীত করা যাবে কি না, সে বিষয়ে মতামত দেওয়ার জন্য এক চিঠিতে অনুরোধ জানান। এরপর গত ২০ আগস্ট আইন ও বিচার বিভাগের বিচার শাখা-৫ থেকে অর্থ সচিবের কাছে মতামতসহ একটি চিঠি পাঠিয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বলেন। ওই মতামতে সিএজি কার্যালয় ও এর অধীন দপ্তরগুলোর অন্যান্য অডিটর পদের বেতন গ্রেড ১১তম থেকে ১০ম গ্রেডে উন্নীত করা যেতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়। পরে ২৫ আগস্ট অর্থ বিভাগের প্রশাসন ও সমন্বয় অনুবিভাগ থেকে ব্যয় ব্যবস্থাপনা অনুবিভাগের কাছে দেওয়া একটি চিঠিতে বলা হয়, কনটেম্প পিটিশনে অন্তর্ভুক্ত অডিটরসহ অডিটর পদকে গ্রেডে-১১ থেকে ১০-এ উন্নীতকরণের প্রস্তাবটির বিষয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য নির্দেশক্রমে পাঠানো হলো। সর্বশেষ চলতি মাসের ৮ সেপ্টেম্বর কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেলের কার্যালয় থেকে অর্থ বিভাগের সচিবের কাছে সিএজি কার্যালয় ও এর অধীন দপ্তরগুলোর অডিটর পদের বেতন গ্রেড ১১তম থেকে ১০-এ উন্নীত করার জন্য বাস্তবায়ন আদেশ জারি করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পুনরায় বিশেষভাবে অনুরোধ করে। কিন্তু এতদিন হয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো নির্দেশনা জারি হয়নি।
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের শান্তিপূর্ণ অবস্থান কর্মসূচিকে বিতর্কিত করার প্রয়াসে বহুমুখী ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। আমাদের এ অধিকার আদায়ের আন্দোলনে ১০ম গ্রেড (উন্নীতকরণ) বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কর্তৃপক্ষকে শান্তিপ্রিয়ভাবে আহ্বান করা হলেও তা উপেক্ষা করা হচ্ছে।’ দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত সেগুনবাগিচার হিসাব ভবন চত্বরে গত ৮ আগস্ট থেকে শুরু হওয়া গণঅবস্থান কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে।
সংবাদ সম্মেলনে অর্থ সচিবের পদত্যাগ দাবি করে অন্য বক্তারা বলেন, ফ্যাসিবাদের দোসর বর্তমান অর্থ সচিব দেশের অডিট অ্যান্ড অ্যাকাউন্টস বিভাগকে অকার্যকর করার মাধ্যমে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। বর্তমান উদ্ভূত পরিস্থিতির জন্য অর্থ সচিব দায়ী এবং এর দায় তাকেই নিতে হবে। কারণ মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের চিঠির ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে অডিট অ্যান্ড অ্যাকাউন্টস বিভাগের অডিটর পদটি ১১ থেকে ১০ম গ্রেডে উন্নীত না করার জন্য বিভিন্ন ধরনের টালবাহানা করছেন।
তারা কোনো আন্দোলন চান না উল্লেখ করে বক্তারা বলেন, আন্দোলন তাদের কাজ নয়। তারা তাদের কাজে ফিরে যেতে চান। তারা আদালতের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী অডিটর পদটি ১০ম গ্রেডে বাস্তবায়ন চান।
অডিটরদের অবস্থান কর্মসূচির ফলে সারা দেশের অডিট অ্যান্ড অ্যাকাউন্টস ডিপার্টমেন্টের আওতাধীন বিভিন্ন কার্যালয়ে আসা সেবাপ্রার্থীদের সেবাপ্রাপ্তি বিঘিœত হচ্ছে বলে জানিয়েছে সিএজি কার্যালয়। অবিলম্বে নিজ নিজ কার্যালয়ের দাপ্তরিক কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে সম্পাদন করার জন্য গত ১২ সেপ্টেম্বর সিএজি কার্যালয়ের অতিরিক্ত উপ-মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (প্রশাসন) শাহজাহান সিরাজ স্বাক্ষরিত এক সার্কুলারে এ নির্দেশ দেওয়া হয়।