একযোগে পেজার বিস্ফোরণের ঘটনায় বিপর্যস্ত লেবানন। গত মঙ্গলবার দেশটির রাজধানী বৈরুতসহ বেশ কয়েকটি শহরে এই বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এতে দুই শিশুসহ অন্তত ১২ জন নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে প্রায় তিন হাজার মানুষ। দেশটির স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, আহতদের মধ্যে দুই শতাধিকের অবস্থা আশঙ্কাজনক। হামলায় আহত হয়েছেন লেবাননে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত মুজতাবা আমানি।
ইরান-সমর্থিত লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ এই যোগাযোগযন্ত্র ব্যবহার করত। নিহতদের মধ্যে দুজন হিজবুল্লাহ যোদ্ধাও রয়েছেন বলে জানিয়েছে সশস্ত্র গোষ্ঠীটি। বিস্ফোরণের জন্য ইসরায়েলকে দায়ী করেছে হিজবুল্লাহ ও লেবানন সরকার। ইসরায়েল এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য না করলেও, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, ভয়াবহ এই হামলার পেছনে কলকাঠি নেড়েছে ইসরায়েলের গুপ্তচর সংস্থা মোসাদ। স্থানীয় সময় মঙ্গলবার বিকেলে প্রথম পেজার বিস্ফোরণের পর থেকে ঘণ্টাব্যাপী দেশের বিভিন্ন স্থানে সেগুলো বোমার মতো বিস্ফোরিত হতে থাকে। নিজেদের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ সুরক্ষিত রাখতে বার্তা আদান-প্রদানের জন্য এই পেজার ব্যবহার করত দেশটির সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ। পাঁচ মাস আগে তাইওয়ানের গোল্ড অ্যাপোলো কোম্পানি থেকে পাঁচ হাজার পেজার কিনেছিল হিজবুল্লাহ। পেজারগুলোর বেশিরভাগই ছিল এপি৯২৪ মডেলের। তবে গোল্ড অ্যাপোলোর প্রতিষ্ঠাতা হসু চিং-কুয়াং দাবি করেন, বিস্ফোরিত পেজারগুলো তার কোম্পানি উৎপাদন করেনি। ‘বিএসি’ নামে ইউরোপীয় একটি প্রতিষ্ঠান এগুলো তৈরি করেছে। তাদের গোল্ড অ্যাপোলোর ব্র্যান্ড ব্যবহারের অনুমতি ছিল। তবে বিএসি কোথায় অবস্থিত সে বিষয়টি জানায়নি প্রতিষ্ঠানটি। সামরিক কর্মকর্তা ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, শুধু ব্যাটারিজনিত বিষয় নয়, বিস্ফোরক উপকরণের কারণেই এ ঘটনা ঘটেছে। প্রতিটি পেজারের ব্যাটারির পাশে এক থেকে দুই আউন্স পরিমাণ বিস্ফোরক রেখে দেওয়া হয়েছিল। দূর থেকে যেন তা বিস্ফোরিত করা যায়, তা নিশ্চিত করতে সেখানে একটি সুইচও লাগিয়ে দেওয়া হয়। নিউ ইয়র্ক টাইমসসহ একাধিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে জানায়, চলতি বছরের শুরুর দিকে পেজারের চালানটি লেবাননে পৌঁছানোর আগে সেটি মোসাদের কারসাজিতে পড়েছিল। হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে যুদ্ধে অভিযান চালাতে পেজারগুলোয় বিস্ফোরক স্থাপন করেছিল মোসাদ। একটি বার্তার মাধ্যমে বিস্ফোরকগুলো সক্রিয় করে তোলা হয় এবং বিস্ফোরণের আগে কয়েক সেকেন্ডের জন্য যন্ত্রগুলোয় সংকেত বেজে ওঠে। লেবাননি নিরাপত্তা বাহিনী ও হিজবুল্লাহ এই হামলার জন্য ইসরায়েলকে দায়ী করেছে। গতকাল বুধবার এক বিবৃতিতে হিজবুল্লাহ জানিয়েছে, ‘এই অপরাধমূলক আগ্রাসনের জন্য সম্পূর্ণভাবে ইসরায়েল দায়ী। এর জবাবে তাদের কঠোর শাস্তি পেতে হবে।’ লেবানেন নিরাপত্তা বাহিনীর এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, ‘উৎপাদনের পর্যায়ে’ ওই ডিভাইসগুলোয় বিস্ফোরক স্থাপন করেছিল মোসাদ। কোনো স্ক্যানার বা ডিভাইস ব্যবহার করেও তা শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। তবে হামলার বিষয়ে ইসরায়েল কোনো মন্তব্য করেনি। পেজার বিস্ফোরণের ঘটনায় আহত হয়েছেন লেবাননে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত মুজতাবা আমানি। ইরানের আধা সরকারি বার্তা সংস্থা ফার্স জানায়, আমানি ত্বকের উপরিভাগে আঘাত পেয়েছেন এবং বর্তমানে একটি হাসপাতালে পর্যবেক্ষণে রয়েছেন। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি এটিকে ‘সন্ত্রাসী হামলা’ আখ্যা দিয়ে এর তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। এদিকে, ইরান-সমর্থিত আঞ্চলিক মিত্রদের সহায়তায় আরও প্রায় এক বছর ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা আছে বলে মন্তব্য করেছেন ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের প্রধান ইয়াহিয়া সিনওয়ার।
পেজারকে বিপার বা ব্লিপারও বলা হয়। বেতার তরঙ্গ ব্যবহার করে এটি কাজ করে। এর মাধ্যমে শুধু খুদে বার্তা পাঠানো যায়। একদম মৌলিক প্রযুক্তি ব্যবহার করার জন্য এর ওপর নজরদারি করা কঠিন। ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নজরদারি এড়াতে যোদ্ধাদের মোবাইল ফোন ব্যবহারের কড়াকড়ি আরোপ করেন হিজবুল্লাহ নেতা হাসান নসরুল্লাহ। এরপর থেকেই হিজবুল্লাহ যোদ্ধারা যোগাযোগের জন্য পেজার প্রযুক্তি ব্যবহার করত।