মিয়ানমারে জান্তার ‘ঢাল’ জনতা

সামরিক বাহিনী ও সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর মধ্য চলমান যুদ্ধে সংঘাত-সংঘর্ষের ঘটনায় উত্তপ্ত মিয়ানমার। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে অভ্যুত্থানের মাধ্যমে অং সান সু চির নেতৃত্বাধীন বেসামরিক সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। এরই পরিপ্রেক্ষিতে দেশ জুড়ে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। কিন্তু সামরিক বাহিনী সহিংসভাবে বিক্ষোভ দমন শুরু করে। এরপর জান্তাবিরোধী বিক্ষোভ রূপান্তরিত হয়ে বিস্তৃত সশস্ত্র বিদ্রোহে। বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে একাধিক লড়াইয়ে হারের মুখে পড়ে সামরিক বাহিনী। এসব পরাজয় ও বিরোধীদের কণ্ঠ রোধ করতে, মিয়ানমারের সামরিক সরকার হত্যা, নির্যাতন ও গ্রেপ্তারের ঘটনা বাড়িয়েছে বলে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে জাতিসংঘ।

সশস্ত্র বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নিজেদের অবস্থান মজবুত করার চেষ্টায় গত ফেব্রুয়ারিতে সামরিক বাহিনীতে যোগদান বাধ্যতামূলক করেছে সরকার। মিয়ানমারের যুদ্ধ পরিস্থিতি ও মানবিক সংকট নিয়ে গত মঙ্গলবার জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ফলকার টুর্ক এই প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। সেখানে বলা হয়, দেশটিতে অভ্যুত্থান সংঘটিত হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত ৫ হাজার ৩৫০ জন বেসামরিক নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন। তাদের মধ্যে ২ হাজার ৪১৪ জনের মৃত্যু হয় গত বছরের এপ্রিল থেকে চলতি বছরের জুনের মধ্যে, যা সংস্থাটির আগের প্রতিবেদনের থেকে এই প্রতিবেদন তৈরির সময় নিহতের সংখ্যা বেড়েছে ৫০ শতাংশের বেশি। এসব মানুষের মধ্যে শত শত জন মারা যান বিমান হামলা ও কামানের গোলার আঘাতে। মিয়ানমারে জাতিসংঘ ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তদন্তকারীদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। শত শত ভুক্তভোগী ও প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষাৎকার ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছে ওই প্রতিবেদন।

জাতিসংঘ মানবাধিকার কার্যালয়ের মিয়ানমারবিষয়ক দলের প্রধান জেমস রোডহেভার বলেন, ‘মানবাধিকার লঙ্ঘনের দিক থেকে মিয়ানমার অতল সাগরে ডুব দিচ্ছে।’ জেনেভায় এক সংবাদ সম্মেলনে জাতিসংঘের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘মিয়ানমারের সেনাবাহিনী আইনি ব্যবস্থাকে ঢাল বানিয়ে বর্তমান সংকট তৈরি করেছে।’

জাতিসংঘের প্রতিবেদনে দেশ জুড়ে সামরিক বাহিনীর আটকের মাত্রা নিয়েও শঙ্কা প্রকাশ করা হয়। এতে বলা হয়, সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে প্রায় ২৭ হাজার ৪০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তাদের মধ্যে গত এপ্রিল থেকে চলতি বছরের জুনের মধ্যবর্তী সময়ে গ্রেপ্তার হয়েছে ৯ হাজারেরও বেশি মানুষ। তাদের অনেককেই সেনাবাহিনীতে বাধ্যতামূলক নিয়োগ দেওয়ার জন্য সামরিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গ্রেপ্তারদের মধ্যে শিশু-কিশোরও রয়েছে। তবে জাতিসংঘসহ অপরাপর মানবাধিকার সংগঠনগুলোর ধারণা, তাদের অবস্থান শনাক্ত করা যায়নি। বাবা-মায়ের রাজনৈতিক ভিন্নমত পোষণের শাস্তি দিতে এই শিশুদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে।