ছয় বছর আগে একনেকে অনুমোদন মেলে খুলনার তিনটি সংযোগ সড়ক নির্মাণ প্রকল্প। মাস ছয়েক আগে তিনটির মধ্যে শুরু হয় একটির কাজ। বাকি দুটি সড়ক নির্মাণ এখনো অধরা। অথচ এরই মধ্যে সময় বাড়ানো হয়েছে দুই দফা। আর ব্যয়ও ৩৯৫ কোটি থেকে বেড়ে হয়ে গেছে ৭১৭ কোটি। প্রকল্পের এমন ধীরগতিতে ভৌত অগ্রগতি মাত্র ১৫ শতাংশ। তবে এ কাজ করেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বিল তুলে নিয়েছে ১৫ শতাংশ। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কেডিএ)।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে কেডিএর নির্বাহী প্রকৌশলী ও প্রকল্প পরিচালক মোরতোজা আল মামুন বলেন, প্রকল্প রিভাইজ, করোনা ও জমি অধিগ্রহণে মূলত সময়ক্ষেপণ হয়েছে। তবে জমি অধিগ্রহণের ৪২০ কোটি টাকার মধ্যে জেলা প্রশাসনকে ২৭০ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। ২০২৩ সালের শেষের দিকে কিছু জমি বুঝে পাওয়া যায়। ইতিমধ্যে নিরালা সড়কে কাজ শুরু হয়েছে। বাকি দুটি সড়কের দরপত্র চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। প্রকল্পে অগ্রগতি সম্পর্কে প্রকল্প পরিচালক বলেন, ভৌত অগ্রগতি হয়েছে ১৫ শতাংশ। কাজ বাবদ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বিল তুলেছেন ১৫ শতাংশ।
কেডিএ সূত্রে জানা গেছে, তিনটি সংযোগ সড়ক নির্মাণ প্রকল্প গ্রহণ করা হয় ২০১৬ সালে। প্রকল্পটি ২০১৮ সালের ২২ মে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) অনুমোদন হয়। প্রশাসনিক অনুমোদন পায় ওই বছরই ৮ নভেম্বর। উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে (ডিপিপি) তখন ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩৯৫ কোটি টাকা। মেয়াদ ছিল ২০২১ সালের
ডিসেম্বর পর্যন্ত। কিন্তু প্রকল্প বাস্তবায়ন বিলম্ব হওয়ায় ব্যয় বৃদ্ধি ছাড়াই ২০২২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় বাড়ানো হয়। কিন্তু তার আগেই প্রকল্প প্রস্তাব সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়, যা ওই বছরের ১৬ নভেম্বর গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সভায় অনুমোদন করা হয়। সুপারিশসহ সংশোধনের প্রস্তাবটি পাঠানো হয় পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে। অনুমোদনের পর সংশোধিত প্রকল্পে ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭১৭ কোটি টাকা। মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে ২০২৫ নভেম্বর পর্যন্ত।
সূত্রটি আরও জানায়, প্রথম সড়কটি নিরালা আবাসিক এলাকার ১ নম্বর সড়ক থেকে কবরখানার ওপর দিয়ে সরাসরি রূপসা সিটি বাইপাসের লবণচরা থানার সামনের সড়কে যুক্ত হবে। এ সড়কটি ২ দশমিক ৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ ও ১৮ দশমিক ৩০ মিটার প্রশস্ত হবে। এটি হবে চার লেনের। দ্বিতীয় সড়কটি গল্লামারী মোড় থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশের লিনিয়ার পার্কের সামনে দিয়ে ময়ূরী সেতু অতিক্রম করে রায়েরমহল পর্যন্ত যাবে। সড়কটি ৪ দশমিক ৯০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ হবে ১৮ দশমিক ৩০ মিটার। এটি দুই লেনের হবে। এ ছাড়া নগরীর দৌলতপুর কৃষি কলেজ (পুরনো সাতক্ষীরা রোড) থেকে বাস্তুহারা কলোনি পর্যন্ত হবে আরেকটি সড়ক। এর দৈর্ঘ্য হবে ২ দশমিক ৭০ কিলোমিটার ও প্রশস্ত হবে ১৮ দশমিক ৩০ মিটার। এটিরও লেন হবে দুটি। তিনটি সড়কের জন্য জমি অধিগ্রহণ করতে হচ্ছে। এর মধ্যে নিরালা সড়কের জন্য ৭ দশমিক ৫৪ একর, গল্লামারী থেকে রায়ের মহলের জন্য ১৩ দশমিক ৮৮ একর, বাস্তুহারা থেকে বাইপাস সড়কের জন্য ১২ দশমিক ৫৭ একর জমি অধিগ্রহণ করতে হবে।
প্রকল্প এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, নিরালা সড়কে ওভারপাস ব্রিজ নির্মাণ ও একাংশে বালু বিছানো কাজ চলছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ডিয়েনকো ও মীর আক্তার (জেভি) এ কাজ বাস্তবায়ন করছে। তবে বাকি বাস্তুহারা থেকে বাইপাস ও গল্লামারী থেকে রায়ের মহল সড়কে কোথাও দৃশ্যমান কাজ শুরু হয়নি।
নিরালা থেকে লবণচরা থানার সামনের সড়কে কাজ করছেন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ডিয়েনকো ও মীর আক্তার (জেভি)। এ প্রতিষ্ঠানের প্রকল্প ম্যানেজার আবদুর রাজ্জাক বলেন, ওভারপাস ব্রিজ নির্মাণে ৬০ কোটি ৪৯ লাখ টাকা এবং সড়ক নির্মাণে ৮০ কোটি টাকা চুক্তিমূল্যে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। ওভারপাস নির্মাণে চলতি বছর ১৪ মার্চ মাস ও ২৯ মে সড়ক নির্মাণে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। কার্যাদেশ পাওয়ার পরই তারা কাজ শুরু হয়েছে।
ব্যয় বৃদ্ধিও ব্যাপারে কেডিএর উপসহকারী প্রকৌশলী শরীফ ওয়াহিদুজ্জামান বলেন, ২০১৪ সালের রেটে প্রকল্প অনুমোদন হয়। সময় মতো প্রকল্প বাস্তবায়ন না হওয়ায় নির্মাণসামগ্রীর দামও বেড়েছে। জমি অধিগ্রহণ খরচ ২০১৮ সালে ছিল দেড়গুণ। পরে এ খরচ বেড়ে তিনগুণ হয়। এসব কারণেই প্রকল্প বাস্তবায়নে খরচ বেড়েছে।
এ ব্যাপারে খুলনা জেলা প্রশাসনের সার্ভেয়ার (অধিগ্রহণ শাখা) মো. মোতালেব বলেন, ২০১৮ সালে প্রকল্প অনুমোদন হলেও ২০২১ সালের শেষ দিক থেকে পর্যায়ক্রমে জমি অধিগ্রহণে প্রস্তাব দেয় কেডিএ। তিনটি সংযোগ সড়কের জন্য ৫০ বিঘার বেশি জমি অধিগ্রহণ প্রয়োজন হচ্ছে। সরকারের অনুমতি পেতেও জেলা প্রশাসনের সময় লেগেছে। কিন্তু আট মাস আগে দৌলতপুর কৃষি কলেজ থেকে বাস্তুহারা কলোনি পর্যন্ত সড়কটির জায়গা বুঝে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সেটির কাজ শুরু হয়নি। তবে নিরালা সড়কের জায়গা আগামী সপ্তাহে বুঝে দেওয়া হবে। এ ছাড়া গল্লামারী মোড় থেকে রায়ের মহল সড়কে ক্ষতি নিরূপণ কাজ চলমান। সেটিও দ্রুত বুঝে দেওয়া হবে।
এদিকে কেডিএ কর্মকর্তারা জানান, প্রথম যখন প্রকল্পটি অনুমোদন পায়, তখন প্রকল্পের কাজ দেখাশোনায় কেনা হয় ৫০ লাখ টাকার পিকআপ, রড পরীক্ষায় ১ কোটি ৩০ লাখ টাকায় কেনা হয় ২ হাজার কেএন ক্ষমতার ইউনিভার্সাল টেস্টিং মেশিন (ইউটিএম)। অভিজ্ঞতা অর্জনে কর্মকর্তারা ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছিলেন। কেডিএ ভবনের পেছনে একটি কক্ষে ইউটিএম বাক্সবন্দি রয়েছে। গাড়িটি ব্যবহৃত হচ্ছে অফিসের কাজে।
এ সম্পর্কে প্রকল্প পরিচালক বলেন, ২০১৯ সালে মেশিনটি কেনা হয়েছে। সেটি সংরক্ষণে রয়েছে। গাড়ি ব্যবহৃত হচ্ছে। এ ছাড়া ওই সময় তিনি প্রকল্প পরিচালকের (পিডি) দায়িত্বে ছিলেন না। তাই বিদেশ সফর নিয়ে কিছু বলতে রাজি হননি।
তবে পরিকল্পনা ছাড়া প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে দাবি করে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) খুলনার সম্পাদক কুদরত-ই-খুদা দেশ রূপান্তরকে বলেন, দুর্নীতি করার জন্য কর্মকর্তারা প্রকল্পের কাজ শুরু করে। পরে দফায় দফায় সময় ও ব্যয় বাড়িয়ে দুর্নীতির আরও ক্ষেত্র তৈরি করেছে। কিন্তু প্রকল্পের কাজ এগোয়নি। এতে জনগণের অর্থের অপচয় হচ্ছে। এ ছাড়া নিয়মের বাইরে গিয়ে ১৫ শতাংশ কাজ করে ১৫ শতাংশ বিল দেওয়া সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। এজন্য সংশ্লিষ্ট কর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত বলে তিনি অভিমত ব্যক্ত করেন।