চার কারণে ডেঙ্গুতে মৃত্যু বাড়ছে

দেশে ডেঙ্গু রোগীর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মৃত্যুও বাড়ছে। এ বছরের প্রথম ছয় মাসের তুলনায় গত আড়াই মাসে রোগী বেড়েছে প্রায় ছয় গুণ এবং মৃত্যু বেড়েছে প্রায় তিন গুণ।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জুন মাস শেষে মোট রোগী ছিল ৩ হাজার ৬৫১ জন এবং মৃত্যু ছিল ৪৪ জন। আড়াই মাস পর গত ১৮ সেপ্টেম্বর রোগীর সংখ্যা দাঁড়ায় ২১ হাজার ৭৯ ও মৃত্যু ১১৯। এসব মৃত্যুর ৬৮ শতাংশই ঘটেছে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এলাকায়। এই দুই সিটিতে মোট মারা গেছে ৮১ জন। এর মধ্যে ঢাকা দক্ষিণে ৬৭ জন ও ঢাকা উত্তরে ১৪ জন।

এমনকি এ বছর সাড়ে আট মাসেই ডেঙ্গুতে মৃত্যু দেশে এযাবৎকালের চতুর্থ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। এর আগে গত ২০০০ সালের পর থেকে গত ২৪ বছরে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৭০৫ জনের মৃত্যু হয়েছে গত বছর। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মৃত্যু ছিল ২০২২ সালে ২৮১ জন ও তৃতীয় সর্বোচ্চ মৃত্যু ছিল ১৭৯ জন। এ বছর এখন পর্যন্ত মৃত্যু চতুর্থ সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে।

ডেঙ্গুতে মৃত্যু নিয়ে উদ্বিগ্ন বিশেষজ্ঞরা। আগামী দুই মাস রোগীর পাশাপাশি মৃত্যু আরও বাড়ারও আশঙ্কা করছেন তারা। এ বছর মৃত্যু বাড়ার পেছনে তারা তিনটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছেন। এগুলো হলো রোগীর দেরিতে হাসপাতালে আসা, হাসপাতালে দেরিতে চিকিৎসা শুরু হওয়া ও শকসিন্ড্রোম রোগীর সংখ্যা বেড় যাওয়া।

এ ব্যাপারে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ও সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, এমনিতেই ডেঙ্গু রোগী অনুপাতে মৃত্যু বেশি। এখন দৈনিক মৃত্যুও বেড়ে গেছে। মৃত্যু বাড়ার কারণ হলো রোগীরা চিকিৎসা নিতেই আসছে না। যারা আসছে তারাও দেরিতে আসছে। এমনকি হাসপাতালে আসার পরও সঠিক সেবা পেতে দেরি হয়ে যাচ্ছে। ফলে মৃত্যু বেড়ে যাচ্ছে।

এই বিশেষজ্ঞ বলেন, মৃত্যু কমাতে হলে ডেঙ্গু রোগীর দ্রুত চিকিৎসা শুরু দরকার। এ ধরনের রোগীদের অ্যাম্বুলেন্স থেকেই প্রাথমিক ও জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা দরকার। সেটা হচ্ছে না। এ ধরনের এপিডেমিক যখন হয়, তখন গতানুগতিক ধারার চিকিৎসা দিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব না।

ডেঙ্গু পরিস্থিতি সামনে আরও ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে জানিয়ে ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, বৃষ্টি ও অতিরিক্ত তাপ, এটা গত বছর নভেম্বর-ডিসেম্বর পর্যন্ত চলেছে। এখন সেপ্টেম্বর মাস। ফলে সামনে অক্টোবর নভেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গুঝুঁকি আরও বাড়ার আশঙ্কা আছে।

মৃত্যুর ৬৪ শতাংশ রাজধানীতে: স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গুর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত ১৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এ বছর ডেঙ্গুতে মোট ১১৯ জন মারা গেছেন। তাদের মধ্যে ৮১ জন বা ৬৪ শতাংশের মৃত্যু হয়েছে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এলাকায়। এর মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে মারা গেছেন ৬৭ জন ও ঢাকা উত্তরে ১৪ জন। এ বছর এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে সবচেয়ে বেশি মারা গেছে ঢাকা বিভাগে ৮৪ জন। এরপর চট্টগ্রাম বিভাগে ১৮ জন, বরিশাল বিভাগে ১১ জন, খুলনা বিভাগে পাঁচজন ও ময়মনসিংহ বিভাগে একজন মারা গেছে। এখনো তিন বিভাগ মৃত্যুশূন্য।

মোট মারা যাওয়া রোগীদের মধ্যে ৮২ জন সিটি করপোরেশন এলাকার হাসপাতালে এবং ৩৭ জন সিটি করপোরেশন এলাকার বাইরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিল।

মৃত্যু বেশি নারীদের: এ বছর ডেঙ্গুতে নারীদের মৃত্যু বেশি। মোট মৃত্যুর ৫৫ শতাংশ বা ৬৫ জন নারী ও ৪৫ শতাংশ বা ৫৪ জন পুরুষ। নারীদের মধ্যে বেশি মারা গেছেন ২৬-৩০ বছর বয়সীরা ১০ জন, যা মোট নারী মৃত্যুর ৮ শতাংশ। এরপর মারা যাওয়া ৬ শতাংশের বয়স ২১-২৫ বছর ও ৫ শতাংশ ৪৬-৫০ বছর বয়সী।

পুরুষদের মধ্যে বেশি মারা গেছেন ১৬-২০ বছর ও ২১-২৫ বছর বয়সীরা ৬ জন করে, যা মোট পুরুষ মৃত্যুর ৫ শতাংশ করে। এরপর ৩১-৩৫ বছর বয়সী পাঁচজন মারা গেছেন, যা মোট মৃত্যুর ৪ শতাংশ। ৩ শতাংশ করে মারা গেছেন ০-৫ বছর, ৬-১০ বছর ও ৪৬-৫০ বছর বয়সী চারজন করে।

মৃত্যু বাড়ার চার কারণ: বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে এ বছর মৃত্যুর চার কারণ জানা গেছে। এগুলো হলো ডেঙ্গু নিয়ে মানুষের অসচেতনতা ও অসতর্কতা, দেরিতে হাসপাতালে আসা, হাসপাতালে এসেও দেরিতে সেবা পাওয়া ও ডেঙ্গুর ধরন।

এ ব্যাপারে মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ও আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. এস এম হাসিবুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, মৃত্যু বাড়ার পেছনে বেশ কয়েকটা কারণ আছে। তার মধ্যে প্রধান কারণ, জনগণের অসচেতনতা। সবাইকে আমরা সতর্ক করছি। মানুষ ডেঙ্গু নিয়ে সতর্ক না।

নিজের হাসপাতালে মশার লার্ভা ঘুরে বেড়াচ্ছে জানিয়ে এ কর্মকর্তা বলেন, ‘আমাদের হাসপাতালের সামনে সাত দিন ধরে পুকুর হয়ে আছে। আমরা সিটি করপোরেশনে চিঠি দিয়েছি, একে ওকে মুখে মুখে বলছি, কিন্তু কারও কোনো সাড়া পাচ্ছি না। হাসপাতালের সামনে কোনো ড্রেন নেই, ড্রেনেজ সিস্টেম ঠিক নেই। সেই জমা পানিতে মশার লার্ভা ঘুরে বেড়াচ্ছে। কেউ দায়িত্ব নিচ্ছে না।’

মৃত্যুর দ্বিতীয় কারণ এবার ডেঙ্গুর দ্বিতীয় ও তৃতীয় ধাপ, অর্থাৎ ডেন-২ ও ডেন-২ ধরনের রোগী বেশি-জানিয়ে এই বিশেষজ্ঞ পরিচালক বলেন, প্রথম ধাপের রোগী গতবার বেশি ছিল। এবার তার পরের স্টেজের রোগী, অর্থাৎ শকসিন্ড্রোম, হেমোরেজিক ডেঙ্গু রোগী বেশি। তাদের মধ্যে অনেক রোগী আছে বাচ্চা রোগী, বয়স কম, বা অন্যান্য রোগী, যাদের অন্যান্য রোগ রয়েছে, তাদের অবস্থা এবার খারাপের দিকেই চলে যাচ্ছে। এসব কারণেই মৃত্যুহার বেশি।

পর্যালোচনার তথ্য বলতে মানা: ডেঙ্গুতে মৃত্যুর কারণ পর্যালোচনা করতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একটি কমিটি আছে মৃত্যু পর্যালোচনা কমিটি। এই কমিটির কথা স্বীকার করলেও সেই কমিটির কোনো তথ্য বাইরে প্রচার করা নিষেধ বলে জানিয়েছেন অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের পরিচালক ডা. শেখ দাউদ আদনান। তিনি গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে দেশ রূপান্তরকে বলেন, মৃত্যু পর্যালোচনা কমিটি আছে। আমরা ডেথ রিভিউ করছি। কিন্তু কী পেলাম, সেটা পাবলিকলি বলা যাবে না। এটা ডিজির নির্দেশনায় করা হয়।

এ বছর ডেঙ্গুতে মৃত্যুর কারণ হিসেবে এই কর্মকর্তা বলেন, এ বছর ডেঙ্গুতে যত মৃত্যু, তার বেশিরভাগেরই কারণ দেরিতে হাসপাতালে আসা। রোগ নিয়ে খুব খারাপ অবস্থায় আসে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পরামর্শ: ডেঙ্গুতে মৃত্যু কমাতে চিকিৎসাব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকরণ খুব দরকার, বলে মনে করেন ডা. মুশতাক হোসেন। তিনি বলেন, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রেই দিতে হবে। ডেঙ্গু শনাক্ত হবে কিন্তু এই মুহূর্তে তারা ক্রিটিক্যাল রোগী না অথচ তারা ঝুঁকিপূর্ণ বয়সের, বা ঝুঁকিপূর্ণ রোগ আছে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্ত চাপ, অ্যাজমা, ক্যানসার, কিডনি ডায়ালাইসিস হচ্ছে, তাদের জন্য সেকেন্ডারি হাসপাতাল করতে হবে। কারণ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রোগীর এত চাপ থাকে যে, এ ধরনের ডেঙ্গু রোগীরা ইমার্জেন্সি থেকে ওয়ার্ডে যেতে যেতে মারা যায়।

এই বিশেষজ্ঞ বলেন, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় যদি সরকারি রেটে ডেঙ্গু শনাক্তের ব্যবস্থা করা হতো, তা হলে রোগী শনা ক্ত আরও বেশি হতো ও রোগীরা সাবধান হয়ে যেত। এখন শনাক্ত হয় না। হঠাৎ করে অসুস্থ হয়ে পড়ে, জ্ঞান হারিয়ে ফেলে, হাসপাতালে আনতে আনতে শেষ।

এই বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, মশক নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে রোগীর সংখ্যা কমাতে হবে। এখন সিটি করপোরেশনগুলো অকার্যকর হয়ে আছে। কিন্তু জনসম্পৃক্ত তার মাধ্যমে মশক নিয়ন্ত্রণের কাজ সম্ভব।

বছরের সর্বোচ্চ রোগী: দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় (গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত) ৮৮৭ ডেঙ্গু রোগী বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এই সংখ্যা এ বছরের সর্বোচ্চ। এর আগে এক দিনে এর চেয়ে বেশি ৯৬৮ রোগী ভর্তি হয়েছিল গত বছরের ২৯ নভেম্বর।

নতুন রোগীদের মধ্যে ৩৪৫ জনই ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এলাকায় ভর্তি হয়েছে। এ ছাড়া ঢাকা বিভাগে ১৬০, চট্টগ্রামে ১৪৯, খুলনায় ৯৬, বরিশালে ৪৯, রংপুরে ৩৯, ময়মনসিংহে ৩৫ ও রাজশাহীতে ১৪ ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছে।

এ নিয়ে এ মাসে রোগীর সংখ্যা দাঁড়াল ৯ হাজার ১২৫ এবং বছরে মোট রোগী ২১ হাজার ৯৬৬ জন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় আরও তিনজন ডেঙ্গুতে মারা গেছে। তারা ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় চিকিৎসাধীন ছিল। এ নিয়ে এ মাসে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়াল ৩৯ ও বছরে মোট মারা গেল ১২২ জন।