ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) সক্রিয় রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠনগুলোর শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছে বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রশাসন। বৈঠকে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ না করে সংস্কারের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিনির্ধারণী ফোরাম সিন্ডিকেট ভেঙে দিয়ে শিক্ষার্থীবান্ধব শিক্ষক-বিশিষ্টজনদের নিয়ে নতুন সিন্ডিকেট গঠনের দাবি জানিয়েছেন ছাত্রনেতারা। এ ছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) চালুর আগে একটি কমিশন গঠনের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ছাত্রনেতারা। ওই কমিশন ছাত্ররাজনীতি ও অ্যাকাডেমিক সংস্কারসহ বিভিন্ন বিষয়ে সুপারিশ করবে।
গতকাল শনিবার দুপুর সাড়ে ১১টা থেকে উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমেদ খানের উপস্থিতিতে উপাচার্য লাউঞ্জে দুই দফায় রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠনগুলোর সঙ্গে আলোচনা হয়।
ছাত্রনেতারা বলেন, সিন্ডিকেট সদস্যদের তথ্যের বরাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ শিরোনামে গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন বিভ্রান্তি ছড়িয়েছে। ক্যাম্পাসে পুলিশি হামলার নির্দেশদাতা সিন্ডিকেট সদস্যদের সঙ্গে বৈঠক ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান এবং গণতান্ত্রিক আকাক্সক্ষার পরিপন্থী। ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের ব্যাপারে স্বৈরাচার সরকারের শিক্ষকরূপী দোসররা ষড়যন্ত্র করছে। ছাত্রলীগের বিভিন্ন গ্রুপকে সক্রিয় করার চেষ্টা করছে। তাই সব ছাত্র সংগঠন বিগত সরকারের প্রতিনিধিত্বকারী সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়ার ব্যাপারে একমত হয়েছে।
এ বিষয়ে ঢাবি শাখা ইসলামী ছাত্রশিবিরের সভাপতি সাদিক কায়েম বলেন, ‘গণভ্যুত্থানের প্রত্যাশার আলোকে ছাত্ররাজনীতি গড়ে উঠবে। আমরা ইনক্লুসিভ ছাত্ররাজনীতি চাই। এখানে কোনো বিভাজন থাকবে না। শিক্ষার্থীরা তাদের কথা বলার অধিকার পাবে, স্বাধীনতা পাবে। প্রত্যেকেই তাদের আদর্শ চর্চা করবে, কিন্তু কেউ কাউকে বলপ্রয়োগ করে চাপিয়ে দিতে পারবে না। বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররাজনীতির সংস্কার কেমন হবে, তা নিয়ে আমরা শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ সব ছাত্র সংগঠনগুলো নিয়ে একটি পলিসি ডিসকাশনের আহ্বান করেছি। সেখানে ছাত্র সংগঠনগুলো তাদের মতামত তুলে ধরবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিবির শিক্ষার্থীদের দাবি-দাওয়াকে প্রাধান্য দেবে।’
ঢাবি ছাত্রদল সভাপতি গণেশ চন্দ্র রায় সাহস বলেন, ‘ছাত্রলীগের অত্যাচার-নিপীড়নের রাজনীতির ফলে স্বৈরাচার হাসিনার শাসনে সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে ছাত্ররাজনীতি সম্পর্কে একটি ট্রমা তৈরি হয়েছে। শিক্ষার্থীরা এখন ছাত্রলীগের অপরাজনীতিকেই ছাত্ররাজনীতি মনে করছে। আমাদের প্রথম পদক্ষেপ হলো ক্যাম্পাসে ভয়মুক্ত একটি পরিবেশ নিশ্চিত করা, যেখানে সব মতাদর্শের শিক্ষার্থী অবস্থান করবেন। আগামীর ছাত্ররাজনীতি হবে শিক্ষার্থীদের সেন্টিমেন্টকে ধারণ করে।’
উপাচার্যের সঙ্গে বৈঠকে দ্রুত ছাত্র সংসদ নির্বাচন আয়োজনের দাবি জানিয়েছেন বলে জানান সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের সাংগঠনিক সম্পাদক মোজাম্মেল হক। তিনি বলেন, ‘আমরা ক্যাম্পাসে সন্ত্রাস-দখলদারিত্ব বন্ধ করতে প্রথম বর্ষ থেকে প্রশাসনিক তত্ত্বাবধানে সিট বণ্টন এবং জোর করে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে নেওয়া বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছি। আমরা অবিলম্বে পরিবেশ পরিষদের মিটিং আহ্বান এবং ছাত্র সংসদ নির্বাচন আয়োজনের দাবি জানিয়েছি।’
ইসলামী ছাত্র আন্দোলন বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় সম্পাদক খায়রুল আহসান মারজান বলেন, ‘ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় অফিশিয়াল কোনো নোটিস দেয়নি। ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি নিয়ে ছাত্রলীগের বিভিন্ন গ্রুপ সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে। ডাকসু নির্বাচন আয়োজনে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ইতিবাচক, তবে এতে সময়ের প্রয়োজন। তার আগে ছাত্ররাজনীতি কীভাবে পরিচালিত হবে, সে বিষয়ে একটি কমিশন গঠনের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। কমিশনের প্রস্তাবের ওপর ভিত্তি করে বিশ্ববিদ্যালয় সিদ্ধান্ত নেবে।’
ছাত্র ফেডারেশন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার আহ্বায়ক আরমানুল হক বলেন, ‘আমরা রাজনীতি নিষিদ্ধের পক্ষে না, আমরা সংস্কার চাই। ভবিষ্যতে কোনো সংগঠন যেন একাধিপত্য বিস্তার করতে না পারে, সে বিষয়ে আমরা সব সংগঠন একমত। সব ছাত্র সংগঠনের সহাবস্থান থাকবে, পড়াশোনা এবং গবেষণার বিষয়টি প্রাধান্য পাবে।’
দুই দফা বৈঠকে বেলা ১১টায় ছাত্রশিবিরের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি সাদিক কায়েম ও সাহিত্য সম্পাদক রেজাউল করিম শাকিল, গণতান্ত্রিক ছাত্র কাউন্সিলের আহ্বায়ক কমিটির সাজেদুল ইসলাম ও প্রজ্ঞা চৌধুরী, বিপ্লবী ছাত্র যুব আন্দোলনের পক্ষ থেকে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের আতিক চৌধুরী এবং নৃবিজ্ঞানের নাইম উদ্দিন, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের আদনান আজিজ বৈঠকে অংশ নেন।
এরপর দুপুর ২টায় ছাত্রদল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি গণেশ চন্দ্র রায় সরকার ও সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপন, ইসলামী ছাত্র আন্দোলনের ঢাবি শাখার সভাপতি ইয়াছিন আরাফাত, সাবেক সাধারণ সম্পাদক খায়রুল আহসান মারজান, বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রীর ঢাবি শাখার সভাপতি নূজিয়া হাসিন রাশা ও সাধারণ সম্পাদক সামি আব্দুল্লাহ; ছাত্র ফেডারেশনের ঢাবি শাখার আহ্বায়ক আরমানুল হক, ছাত্র ইউনিয়নের ঢাবি শাখার সাধারণ সম্পাদক মাঈন আহমেদ; সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের (মার্ক্সবাদী) ঢাবি শাখার সভাপতি সাদেকুল ইসলাম সাদিক ও সাংগঠনিক সম্পাদক মোজাম্মেল হক, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের (বাসদ) ঢাবি শাখার সভাপতি সুহাইল আহমেদ শুভ প্রমুখ বৈঠকে অংশ নেন।