দেশে চলতি সেপ্টেম্বর মাসের ২৩ দিনে ডেঙ্গুতে মারা গেছে ৫০ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় (গতকাল সোমবার সকাল ৮টা পর্যন্ত) নতুন করে আরও দুজন মারা গেছে। মৃত্যুর এই সংখ্যা এ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এর আগে সর্বোচ্চ ২৭ জনের মৃত্যু ছিল গত মাসে।
দেশে এ মাসে ডেঙ্গু রোগী ১২ হাজার ছাড়াল। গত ২৪ ঘণ্টায় (গতকাল সোমবার সকাল ৮টা পর্যন্ত) বিভিন্ন হাসপাতালে ৮৬৬ জন রোগী ভর্তি হয়েছে। এ নিয়ে এ মাসের গত ২৩ দিনে রোগীর সংখ্যা বেড়ে ১২ হাজার ৫৯ জনে পৌঁছেছে। এ সময় দৈনিক গড় রোগী ছিল ৫২৪ জন। অথচ গত মাসেও দৈনিক গড় রোগী ছিল ২১০ জন। সে হিসেবে এ মাসে রোগী বেড়েছে আড়াই গুণ।
এ সময় আরও দুজন ডেঙ্গুতে মারা গেছে। তাদের মধ্যে একজন ঢাকা বিভাগে ও অন্যজন বরিশাল বিভাগে ভর্তি ছিল। তারা দুজনই পুরুষ এবং একজনের বয়স ৬১-৬৫ বছর ও আরেকজন ৬৬-৭০ বছর বয়সী।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণ কক্ষ এই তথ্য জানায়।
অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, নতুন রোগীদের মধ্যে ৩১৮ জনই ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এলাকায় ভর্তি হয়েছে, যা দৈনিক মোট রোগীর ৩৭ শতাংশ। এর মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটিতে ভর্তি হয়েছে ১৭০ জন ও দক্ষিণে ১৪৮ জন। এরপর ঢাকা বিভাগে ১৬৭, চট্টগ্রামে ১২১, খুলনায় ৮৫, বরিশালে ৫৫, রাজশাহীতে ৫৪, ময়মনসিংহে ৩৬, রংপুরে ১৮ জন ও সিলেটে ১২ জন ভর্তি হয়েছে।
নতুন রোগীদের মধ্যে ৬৬ শতাংশ বা ৫৭১ জন পুরুষ ও ৩৪ শতাংশ বা ২৯৫ জন নারী।
এ নিয়ে এ বছর ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা দাঁড়াল ২৪ হাজার ৯০০ জন। এর মধ্যে এ মাসেই ভর্তি হয়েছে ১২ হাজার ৫৯ জন। মোট রোগীর মধ্যে ১৫ হাজার ৬২১ জন বা ৬৩ শতাংশ পুরুষ ও ৯ হাজার ২৭৯ জন বা ৩৭ শতাংশ নারী।
এ বছর এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মারা গেছে ১৩৩ জন। তাদের মধ্যে এ মাসেই মারা গেছে ৫০ জন। মৃত্যুর ৫৩ শতাংশ বা ৭১ জন নারী ও ৪৭ শতাংশ বা ৬২ জন পুরুষ।
ডেঙ্গু মোকাবিলায় উচ্চপর্যায়ের ১০ টিম: ঢাকাসহ সারা দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় উচ্চপর্যায়ের ১০টি টিম গঠন করেছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। গতকাল সোমবার স্থানীয় সরকার বিভাগে অনুষ্ঠিত এক সভায় এসব টিম গঠন করা হয়। স্থানীয় সরকার বিভাগের অতিরিক্ত সচিব ও যুগ্ম সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তারা এসব টিমের নেতৃত্বে রয়েছেন। তাছাড়া চিরুনি অভিযানসহ মশক নিধনে নানা কার্যক্রম পরিচালনা করেছে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশার লার্ভা পাওয়ায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জরিমানাও করা হয়েছে।
সচিবালয়ের সম্মেলন কক্ষে স্থানীয় সরকার বিভাগ সচিব আবু হেনা মোরশেদ জামানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় ডেঙ্গু রোগের সংক্রমণ থেকে নাগরিকদের রক্ষাকল্পে জনসচেতনতা সৃষ্টি, মশার প্রজননস্থল বিনষ্টকরণ, পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা এবং লার্ভা ও মশা নিধন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা নিয়ে আলোচনা হয়। ডেঙ্গু রোগের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় মশক নিধন অভিযান যথাযথভাবে বাস্তবায়ন, সমন্বয় ও নিবিড়ভাবে তদারকির জন্য ১০টি টিম গঠন করা হয়। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে (ডিএসসিসি) কাজ করবে চারটি টিম, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে (ডিএনসিসি) তিনটি টিম কাজ করবে। অন্য সিটি করপোরেশনে কার্যপরিচালনার জন্য গঠিত হয়েছে একটি টিম। তাছাড়া সাভার, দোহার, তারাব, রূপগঞ্জ ও অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ পৌরসভার জন্য আরও একটি টিম গঠন করা হয়েছে। ডেঙ্গু রোগের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলার কাজটি সমন্বয় সাধন এবং তথ্য সংগ্রহের জন্য সাত সদস্যবিশিষ্ট আরেকটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
গঠিত টিমগুলোর দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাদের সঙ্গে সমন্বয়পূর্বক দৈনিক কমপক্ষে তিনটি ডেঙ্গু রোগের প্রাদুর্ভাব এলাকা পরিদর্শন করবেন এবং ডেঙ্গু রোগ প্রতিরোধ কার্যক্রম মনিটরিং ও তদারকি করবেন। স্থানীয় সরকার বিভাগের তথ্য সংগ্রহ কমিটির কাছে নিয়মিতভাবে ডেঙ্গু রোগের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় গৃহীত পদক্ষেপ এবং অভিযান পরিচালনা-সংক্রান্ত সচিত্র প্রতিবেদন দাখিল করবেন। প্রথম দিনেই টিমের সদস্যরা কাজ শুরু করে দিয়েছেন বলে জানা গেছে। গতকাল সোমবার বিকেলে ডিএনসিসির স্বাস্থ্য বিভাগ ও মশককর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন মন্ত্রণালয়ের টিমের সদস্যরা।
কমিটির সদস্যরা জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ডেঙ্গু রোগের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় গৃহীত পদক্ষেপ এবং অভিযান পরিচালনা-সংক্রান্ত প্রতিবেদন নিয়মিতভাবে ওয়েবসাইট, গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারের ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।
২০ হাজার টাকা জরিমানা : ডিএনসিসি এলাকায় মশক নিধনে বিশেষ অভিযান চালিয়ে ২০ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করেছে সংস্থাটির ভ্রাম্যমাণ আদালত। অঞ্চল-২-এ বিশেষ অভিযানে এই জরিমানা করা হয়। ডিএনসিসি জানিয়েছে, তাদের সবগুলো ওয়ার্ডে ৭ হাজার ৭৬টি স্থাপনা পরিদর্শন করা হয়। এর মধ্যে ৪৩টি স্থাপনায় এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেছে। ২৯টি স্থাপনার মালিককে নোটিস দিয়ে সতর্ক করা হয়েছে এবং একজনকে জরিমানা করা হয়েছে। তাছাড়া ৪ হাজার ৮২৭ জায়গায় অ্যাডাল্টি সাইট (মশার লার্ভা ধ্বংস করার ওষুধ) স্প্রে করা হয়।
ডিএসসিসির ১৪ ওয়ার্ডে চিরুনি অভিযান : মশক নিয়ন্ত্রণে দৈনন্দিন নিয়মিত কার্যক্রমের পাশাপাশি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ১৪টি ওয়ার্ডে ‘বিশেষ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও মশক নিধন’ কার্যক্রম তথা চিরুনি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। সংস্থাটির স্বাস্থ্য ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সমন্বয়ে ৬, ১৪, ১৬, ২২, ২৪, ২৯, ৩২, ৪৭, ৫৯, ৬৪, ৬৫, ৬৭, ৭২ ও ৭৫ নম্বর ওয়ার্ডে এসব চিরুনি অভিযান পরিচালনা করা হয়।
ডিএসসিসি জানিয়েছে, চিরুনি অভিযানে লার্ভিসাইডিং কার্যক্রমে ১৩ জন ও অ্যাডাল্টিসাইডিং কার্যক্রমে ১৩ জন মশককর্মী এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রায় ৩০০ পরিচ্ছন্নতাকর্মী অংশ নেন। এ ছাড়া স্বাস্থ্য অধিদপ্তর প্রেরিত গত ২২ সেপ্টেম্বর তারিখের তালিকা অনুযায়ী ডেঙ্গু রোগীর আবাসস্থল ও চারপাশে বিশেষ লার্ভিসাইডিং ও অ্যাডাল্টিসাইডিং কার্যক্রমের মাধ্যমে এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা হয়েছে।