একজন ধর্মীয় বক্তার করণীয় সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা থাকা দরকার। ওয়াজ কাকে বলে, ওয়াজের বিষয়বস্তু কী কীÑ তা একজন আলোচককে অবশ্যই জানতে হবে। একজন নসিহতকারী কোন কোন বিষয়ে সভা-সমাবেশে আলোচনার অধিকার রাখেন সে ব্যাপারে তার সঠিক ধারণা বা জ্ঞান না থাকলে সমাজে ফেতনা-ফ্যাসাদ সৃষ্টি হবে। একই ব্যক্তির পক্ষে সর্ববিদ্যায় পারদর্শী হওয়া সম্ভব নয়। তাই সব বিষয়ে তার কথা বলারও অধিকার নেই। যে বিষয়গুলো তিনি ভালো করে জানেন বা জানার চেষ্টায় আছেন সে সব বিষয়েই তাকে কথা বলতে হবে। এতে বক্তা নিজে যেমন উপকৃত হবেন শ্রোতারাও তেমন লাভবান হবেন। ভুলত্রুটি কম হবে। সমাজে ফেতনা কম বাড়বে।
আর যে বিষয়ে একজন বক্তার জ্ঞান নেই বা থাকলেও অল্প তিনি যদি ওই বিষয়ে আলোচনা করেন বা জ্ঞান দিতে যান তাহলে অবশ্যই সমাজে ভুল জ্ঞানের ছড়াছড়ি হবে। তাই একজন ধর্মীয় বক্তার সেই দিকে খেয়াল রাখা জরুরি। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখ ও পরিতাপের সঙ্গে বলতে হয়, আজকাল ওয়াজের মঞ্চে বক্তাদের মধ্যে সেসব বিষয় দেখা যায় না। বক্তা নামে অধিকাংশই ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞ। লেখাপড়া, শিক্ষা-দীক্ষার যথেষ্ট অভাব তাদের মধ্যে রয়েছে। তারা আসলে ইসলাম সম্পর্কে খুব বেশি কিছু জানেন না। অবশ্য জ্ঞানী আলোচকও অনেক আছেন। তাদের কাছে জাতির প্রত্যাশা অনেক। তাদের কথাবার্তার যথেষ্ট মূল্যায়ন সমাজে রয়েছে। মানুষ তাদের থেকে সঠিক ইসলাম জানতে চায়। কোরআন-হাদিসের সঠিক আলোচনা শুনতে চায়। কিন্তু সমস্যা হলো, একই ব্যক্তি সব বিষয়ে নিজেকে পারদর্শী ভেবে সর্বত্র সব আলোচনা করে বেড়ান। এতে করে অনেক সময় নানা ভুল-ভ্রান্তি হয়। সমাজে তখন বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।
ওয়াজ মাহফিলগুলো ধীরে ধীরে নিজস্ব জৌলুশ হারাচ্ছে। যে ভাবগাম্ভীর্য আর ঐতিহ্য ধারণ করে মাহফিলগুলো যুগ যুগ ধরে চলে আসছিল তা এখন আর তেমনভাবে নেই। সে কথা মুরব্বিরা আফসোস করে বলেন। কেউ কেউ বক্তাদের এই হট্টগোলকে কাজে লাগিয়ে ঠিকই ফায়দা লুটছে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, বর্তমান সময়ে ওয়াজের মঞ্চগুলো সমালোচনা, পরনিন্দা ও হিংসা-বিদ্বেষ ছড়ানোর মাধ্যম হয়ে উঠছে। অনেক সময় বক্তা নিজের ক্ষোভ-দুঃখ, ব্যক্তিগত ও পারিবারিক কথাবার্তাকেও ওয়াজের নামে চালিয়ে দিচ্ছেন যা কিছুতেই কাম্য নয়। কোরআন ইসলামি জ্ঞানের উৎস। হজরত শাহ ওয়ালি উল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভি (রহ.) কর্র্তৃক রচিত ‘আল-ফাউজুল কাবির ফি উসুলিত তাফসির’ গ্রন্থে উল্লেখ হয়েছে- কোরআনে পাঁচ ধরনের বিদ্যা বা আলোচনা রয়েছে। এক. শরিয়তের বিধিনিষেধ সম্পর্কিত বিদ্যা। দুই. তর্কবিদ্যা। তিন. আল্লাহর দান-অনুগ্রহ সম্পর্কিত বিদ্যা। চার. ইতিহাস বিদ্যা। পাঁচ. পরজগৎ সম্পর্কিত বিদ্যা। আরও উল্লেখ হয়েছে এই পাঁচ বিদ্যার প্রচার-প্রসারের দায়িত্ব তিন শ্রেণির মানুষের ওপর ন্যস্ত। প্রথম প্রকারের বিদ্যা প্রচারের দায়িত্ব ফকিহদের ওপর। দ্বিতীয় প্রকারের বিদ্যা প্রচারের দায়িত্ব ইসলামি দার্শনিক বা তর্কবিদদের ওপর। আর অবশিষ্ট তিন প্রকারের বিদ্যা প্রচার-প্রসারের দায়িত্ব ওয়াজ-নসিহতকারীদের ওপর।
কিন্তু আজকাল আলোচকদের মধ্যে তা লক্ষ করা যায় না। শরিয়তের মাসআলা-মাসায়েল আলোচনার দায়িত্ব ফকিহদের কাজ। সেগুলো আলোচনা করার জন্য নির্ধারিত স্থান আছে। বোঝার জন্যও নির্দিষ্ট শ্রোতা আছেন। স্থান-কাল-পাত্র বিশেষে তা আলোচনা করতে হয়। কিন্তু সে নীতিমালা অমান্য করে যে কেউ যে কোনো স্থানে তা আলোচনা শুরু করে দেন। এতে নিজেও যেমন ভুল-ভ্রান্তির শিকার হয়, শ্রোতাদের মধ্যেও ভুল বোঝাবুঝির সুযোগ তৈরি হয়। আবার ইসলামি আকায়েদ সংক্রান্ত আলোচনা যে কারও করার অধিকার নেই। সে বিষয়ে পারদর্শী লোকদেরই তা করার অধিকার আছে। কিন্তু এখানেও অনেকে অনধিকার চর্চা করেন। তর্কশাস্ত্রের তাত্ত্বিক আলোচনা সর্বমহলে করা যায় না। কিন্তু অনেক আলোচক সাধারণ মহলে সেসব বিষয় আলোচনা করে উপকারের চেয়ে অপকার বেশি করেন। এটা কাম্য নয়। সাধারণ বক্তা হিসেবে আপনার দায়িত্ব হলো, আল্লাহর নেয়ামতরাজির কথা আলোচনা করা। তার কুদরত নিয়ে কথা বলা। তার বড়ত্ব-মহিমার কথা মানুষের সামনে তুলে ধরা। ইবাদতের গুরুত্ব ও ফজিলতের আলোচনা করা। নবী-রাসুল, সাহাবি-তাবেয়ি ও নেককার লোকদের ইতিহাস আলোচনা করা। তাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ ও করুণার কথা উল্লেখ করে তাদের মতো নেককার হতে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা। মহান আল্লাহ ও নবী-রাসুলদের অবাধ্যদের পরিণতি স্মরণ করিয়ে পাপ থেকে দূরে থাকার মন্ত্রণা দেওয়া। মৃত্যুর আলোচনা, কবর জগতের কথা, পরকাল, হাশর-নাশর, জান্নাত-জাহান্নাম ইত্যাদি বিষয়ের আলোচনা করা। মানুষের অন্তরের অন্ধকার দূর করে সেখানে ইসলামের আলো ঢুকিয়ে সুন্দর ও সুস্থ সমাজ গঠনের চেষ্টা করা। কিন্তু তা না হয়ে যদি ওয়াজের নামে সমাজে অশান্তি তৈরি হয়, ওয়াজ দ্বারা যদি সমাজ বিভক্ত হয়ে পড়ে, তাহলে ওয়াজের সার্থকতা কোথায়? ব্যক্তিগত মতাদর্শ প্রচারের জন্য ওয়াজের মঞ্চ নয়। দলীয় প্রচারের ক্ষেত্র ওয়াজ মাহফিল নয়। একজন ধর্মীয় আলোচক দ্বীনের দাঈ। তার কথাবার্তা, চালচলন, পোশাক-আশাক সবকিছুই অনুসরণীয়। একজন বক্তাকে সেসবের প্রতি লক্ষ রাখা দরকার। বক্তাকে যথেষ্ট মার্জিত আচরণের অধিকারী হতে হবে। তবেই ওয়াজের জন্য তিনি যোগ্য হবেন। আজকাল ঘরে ঘরে বক্তা। এত বক্তার দরকার নেই। ইসলামের জ্ঞান থাকাটা দরকার। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলতেন, তোমরা এমন এক যুগে অবস্থান করছ, যে যুগে আলেম বেশি কিন্তু বক্তা ও আলোচক কম। কিন্তু তোমাদের পরে এমন এক যুগ আসবে যখন ফকিহ কম হবে আর বক্তা বা ওয়ায়েজ বেশি হবে। সে সময় মানুষের নফস হবে তার কাজের নিয়ন্ত্রক। (সহিহ বুখারি) সেই যুগ পূর্ণমাত্রায় চলছে এখন। ইসলাম মোতাবেক জীবন না গড়ে জীবন মোতাবেক ইসলাম গড়ার চেষ্টা চলছে। আল্লাহ আমাদের হেফাজত করুন।