শারদীয় দুর্গাপূজা চলেই এসেছে। আর পূজা মানেই ম-পে ম-পে ঘোরাঘুরি, আড্ডা ও খাওয়াদাওয়া। পূজার দিনগুলোতে নতুন পোশাক যেমন পরতে হবে তেমনি করতে হবে সাজগোজ। শাড়ির সঙ্গে ব্লাউজ বা পোশাকের সঙ্গে মেকআপ সবকিছু পারফেক্ট করতে চাই প্রস্তুতি। আসছে পূজার সাজপোশাক নিয়ে লিখেছেন রবিউল কমল
সাধারণত সনাতন ধর্মাবলম্বীরা বছরের এই চারটে দিনের জন্য মুখিয়ে থাকেন। ছোট থেকে শুরু বাড়ির বয়স্ক মানুষটাও অপেক্ষা করেন পূজার জন্য। পূজা হলো তাদের কাছে বছরের সেরা উৎসব। যথাযথ সাজগোজ ছাড়া সেই উৎসবের আমেজটা জমে ওঠে না। তাই পূজা মানেই বাড়তি ফ্যাশন। শাড়ির সঙ্গে পরতে হবে নতুন কাটের ব্লাউজ, ড্রেসের সঙ্গে মানিয়ে পরতে হবে হাই হিল। তার সঙ্গে থাকবে ম্যাচিং কানের দুল, গলার হারটাও পরতে হয় মিলিয়ে।
তরুণদের কাছে পূজা হলো হাল ফ্যাশনের সঙ্গে নিজেকে ঝালিয়ে নেওয়া। বছর ধরে চলা ট্রেন্ডগুলো ব্যবহারের সুবর্ণ সময় পূজা। অনেক আগে থেকেই পূজার ফ্যাশনধারা এভাবে চলে আসছে। এখনো সবাই পূজার চার দিন কীভাবে সাজবেন তা নিয়ে নানা জল্পনাকল্পনা করেন। কারণ চার দিনে সকাল-বিকেল মিলিয়ে সাজগোজ করতে হয়।
তবে সাজগোজ মানে শুধুই নতুন পোশাক পর নয়। সাজ হলো পোশাক থেকে শুরু করে ব্যাগ, জুতা, অ্যাকসেসরিজের সামঞ্জস্য থাকা। সেটাই যদি ঠিকঠাক থাকে তাহলে তাতে আপনার রুচির পরিচয় পাওয়া যাবে। আর এটাই তো সাজনীতির অন্যতম শর্ত।
সাজগোজের জন্য দ্বিতীয় যে বিষয়টা মাথায় রাখতে হবে তা হলো স্বাচ্ছন্দ্য। আপনি যে পোশাক পরেন না কেন, তাতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ না করলে পুরো সাজটাই মাটি হয়ে যাবে। কেউ শাড়িতে কমফোর্টেবল হলে, তাকে শাড়িই পরা উচিত। আবার কেউ ডেনিমে পরতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করলে তার জন্য সেটাই ঠিক আছে। অন্য কেউ পরছে বলে তাকে অনুকরণ করার মানে নেই। বরং আপনি আপনার মতোই থাকুন। কারণ সাজপোশাক মানে নিজের ভোলবদল নয়। বরং নিজের রুচিকে অন্যের কাছে তুলে ধরা। নিজেকে ইতিবাচকভাবে অন্যের কাছে উপস্থাপন করা। হ্যাঁ, মানছি ফ্যাশন ট্রেন্ডগুলো জানা থাকা ভালো। তার মানে এই নয়, অন্যকে অন্ধের মতো অনুকরণ করতে হবে।
পূজার সাজপোশাকের অনেক কথাই হলো। এবার আসি কেনাকাটার কথায়। শুরুতে বলব, কেনাকাটার আগে অবশ্যই পরিকল্পনা করে নিতে হবে। যেমন শাড়ি পরার অভ্যাস না থাকলে, একগাদা শাড়ি কিনে আলমারি বোঝাই করার মানে হবে না। তার চেয়ে একটি ভালো শাড়ি কিনুন। তাহলে পরে নিজের ইচ্ছেমতো পরা যাবে। শাড়ির দোকান, বুটিক ও ব্র্যান্ড ঘুরে ভালো শাড়িটাই কিনুন।
কেউ যদি সালোয়ার-কামিজ পছন্দ করেন তাদের জন্য ফ্যাশন হাউজগুলো নতুন কালেকশন এনেছে। বিভিন্ন শপিংমল, মার্কেট ও দোকানেও পাওয়া যাবে পূজার নতুন পোশাক। পূজার পোশাকের জন্য ফ্যাশন হাউজগুলো ফেব্রিক নির্বাচনে কটন, হ্যান্ডলুম কটন, সুইস কটন, জ্যাকার্ড কটন, লিনেন, হাফ সিল্ক, জর্জেট, সিল্ক, অরগাঞ্জাকে প্রাধান্য দিয়েছে। মিডিয়া হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে হাতের কাজ, এমব্রয়ডারি, স্ক্রিন ও ব্লক প্রিন্ট, ডিজিটাল প্রিন্ট ও কারচুপির কাজ। পোশাকে নানা রঙে থাকছে রেড, হোয়াইট, অফহোয়াইট, ক্রিম, পিঙ্ক, পাউডার পিঙ্ক, মেরুন, ম্যাজেন্টা, ব্রিক রেড, অরেঞ্জ, টেন ব্রাউন, মেরিগোল্ড, ল্যাভেন্ডার, নেভি, গোল্ডেন, কোরাল রেড, ক্রিমসন রেডসহ অন্যান্য শেড।
নতুন পোশাক তো হলো, এবার আসি জুতা ও ব্যাগের কথায়। নিশ্চয়ই নতুন পোশাকের সঙ্গে পুরনো জুতা বা ব্যাগ ভালো লাগবে না! তাই আলাদা বাজেট রেখে সেগুলোও কিনে ফেলুন। তবে জুতা বা ব্যাগ কেনার আগে জামাকাপড়ের শপিংটা করে নিন। তাহলে ম্যাচিং করে অ্যাকসেসরিজ কিনতে পারবেন। জুতা কেনার সময় কেবল স্টাইল না দেখে আরামের দিকটাও দেখতে হবে। পূজার ভিড়ে ঘুরতে হলে স্টিলেটো বা হাই হিল জুতা একেবারেই চলবে না। ওয়েজ হিল বা ফ্ল্যাট জুতা পরে বের হলে আরাম পাবেন। আর উচ্চতা যদি বেশি হয়, তাহলে ফ্ল্যাট জুতাই বেশি ভালো। তবে যে ধরনের জুতা কিনুন ভালো কোয়ালিটির কিনবেন। এতে পা ভালো থাকবে, বেশি হাঁটলেও ফোসকা বা কড়া পড়বে না।
জুতার মতোই জরুরি ব্যাগ। ব্যাগ কেনার সময় খেয়াল রাখবেন, যেন জুতার রঙের সঙ্গে সামঞ্জস্য থাকে। ব্যাগ ও জুতার রঙ দুই রকম হলে দেখতে বেখাপ্পা লাগবে। সালোয়ার বা স্কার্টের সঙ্গে জুটি, কাপড় বা বিডসের স্লিং ব্যাগ, বটুয়া ভালো লাগবে। ভারী শাড়ির সঙ্গে ব্রোকেড বা লেদারের ব্যাগ নিতে পারেন।
সাধারণত আমাদের সারা বছর একটি নির্দিষ্ট ড্রেস কোড মেনে চলতে হয়। অফিসে ফরমাল, সেমিফরমাল। বন্ধুদের সঙ্গে গেট টুগেদার মানে ডেনিম, টি-শার্ট। কখনো কখনো বিয়েবাড়িতে শাড়ি পরার সুযোগ পাওয়া যায়। তাই পূজার কটা দিন এথনিক পোশাকে সাজলে খারাপ হবে না। এখন অনেকে শুধু রাতে নয়, দিনেও ঠাকুর দেখতে বের হন। তাই সকালে ভারী সিল্ক পরা ঠিক হবে না। রোদে ঘুরে ঘুরে ঠাকুর দেখতে হলে হালকা কিছু পরাই ভালো। তাতে আরাম পাওয়া যাবে। বর্তমানে হাতে বোনা সুতির শাড়ির কদর বেড়েছে। দেখতেও ভালো লাগে, আবার সহজে ম্যানেজ করা যায়। তা ছাড়া সুতির শাড়িতেও নানারকম ভেরিয়েশন দেখতে পাওয়া যায়। কালার প্যালেট থেকে শুরু করে প্রিন্ট, প্যাটার্নেও দেখা যায় অভিনবত্ব। সঙ্গে শুধু চাই ভালো কাটের ব্লাউজ ও মানানসই হালকা গয়না। কানে ঝোলা দুল ও হাতে ঝুরো চুড়ি। সিল্ক পরতে চাইলে হালকা লিনেন বেছে নিতে পারেন। রঙে, রেখায়, প্যাটার্নে বেশ লাগবে।
খুব বেশি সাজতে না চাইলে টাঙ্গাইলের মতো হালকা শাড়ি বেছে নিতে পারেন। এতে ফ্যাশনেবল যেমন লাগবে, আবার খুব বেশি সাজতে হবে না। আর শাড়ি পরতে না চাইলে পালাজো বা পাতিয়ালাও পরতে পারেন। এখন পালাজোর সঙ্গে লং স্ট্রেট কুর্তার কম্বিনেশন বেশ চলছে।
পোশাকের মতো সকালের মেকআপও হালকা হলেই ভালো। ফাউন্ডেশন, পাউডার মেখে ঘেমে জবুথবু হয়ে ঘোরাঘুরির চেয়ে হালকা ময়েশ্চারাইজার, সানস্ক্রিন লাগানোই ভালো। চোখে লাগাতে পারেন হালকা কাজল। ছোট্ট টিপ পরলেও একেবারে মন্দ লাগবে না। ব্যাগে ওয়েট টিস্যু, চিরুনি, লিপগ্লস, ছোট ডিওডোরেন্ট রাখুন। সকালে ঘোরা হলেও পূজা জমজমাট মজাটা রাতেই পাওয়া যায়। রাতের জন্য সাজটাও চাই একদম জমকালো। শাড়িতে অনেক অপশন আছে। তসর সিল্ক আছে, কাতান সিল্ক বেনারসিও পরতে পারেন। রাতের জন্য উজ্জ্বল রঙই ভালো। সঙ্গে অবশ্যই চাই স্টাইলিশ ব্লাউজ। ব্লাউজের কাট ভালো হলে সাধারণ শাড়িতেও গ্ল্যামারস দেখায়। বেছে নিতে পারেন অ্যাম্বেলিশড ব্লাউজ, হল্টারনেক, সিক্যুইনড ব্লাউজ। শাড়ির সঙ্গে ম্যাচ করে পরতে পারেন। তবে শাড়িই পরতে হবে তার কোনো মানে নেই। গর্জিয়াস সালোয়ার-কামিজও পরতে পারেন। বড় ঘেরের আনারকলি, হাতের কাজ করা চুড়িদার কুর্তা, সঙ্গে বাহারি দোপাট্টাও পূজার রাতের জন্য আদর্শ পোশাক। যারা একটু লম্বা তাদের আনারকলি গাউন মানাবে।
সবকিছুর সঙ্গে হেয়ার স্টাইলটাও যেন ভালো হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। শাড়ির সঙ্গে কখনো খোলা চুল, কখনো রেট্রো স্টাইল। আবার ড্রেসের সঙ্গে স্মোকি আইজ বা বোল্ড লিপস। একসঙ্গে অনেক কিছু করতে যাবেন না। অর্থাৎ জমকালো শাড়ি, জমকালো গয়না আবার জমকালো মেকআপ ভালো লাগবে না। মেকআপ মূলত একটা শিল্প। এই শিল্পে সবাই সমান পারদর্শী নয়। সে ক্ষেত্রে ন্যাচারাল লুকটাই ধরে রাখুন। ফাউন্ডেশন, কমপ্যাক্ট, ব্লাশ-অন সব একসঙ্গে ব্যবহার করতে গিয়ে এলোমেলো করা মানে বোকামি।
পূজার সময় সাজগোজের পাশাপাশি নিজের যত্ন নেওয়া জরুরি। পূজার আগে হয়তো ফেসিয়াল, হেয়ার স্পা করাবেন। কিন্তু এক দিনে ত্বক সুন্দর হয় না। এজন্য দরকার নিয়মিত যতœ। সবসময় ত্বকের যতœ নিন। ত্বক পরিষ্কার রাখুন, নিয়মিত ময়েশ্চারাইজার লাগান। দেখবেন ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়বে। তখন চোখে হালকা কাজলে লাগালেও আপনাকে অসাধারণ লাগবে।