রাজস্ব আয়, আন্তর্জাতিক রুটে ফ্লাইট ও যাত্রী বাড়লেও নানা সংকটে ধুঁকছে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। দুর্যোগ এবং জরুরি অবস্থা মোকাবিলায় বিশ্বের প্রতিটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইমারজেন্সি অপারেশন সেন্টার (ইওসি) থাকলেও এই বিমানবন্দরে এখনো তা স্থায়ীভাবে গড়ে উঠেনি। বিমানবন্দরের ফায়ার ভবনের দোতলায় অনেকটা জোড়াতালি দিয়ে ইওসির কার্যক্রম চলছে। ফলে জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় এই বিমানবন্দরের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অ্যাভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, বিমানবন্দরটিতে অধিকতর আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের সম্ভাবনা বাড়লেও সুবিধা বাড়েনি সেভাবে।
কর্মকর্তারা জানাচ্ছেন, সরকারি বাজেট বরাদ্দ না পাওয়ায় স্থায়ীভাবে ইওসি স্থাপন করা যাচ্ছে না। এ ছাড়া বর্তমানে পরীক্ষামূলক চালু আছে ইন্সট্রুমেন্ট ল্যান্ডিং সিস্টেম বা আইএলএস (বিমান চালনায় একটি নির্ভুল রেডিও নেভিগেশন সিস্টেম)। আইএলএস একটি বিমানকে রাতে বা খারাপ আবহাওয়ায় রানওয়ের কাছে যাওয়ার জন্য স্বল্প-পরিসরের নির্দেশিকা দেয়। এই তথ্য ব্যবহার করে পাইলট একটি বিমানকে রানওয়েতে নামিয়ে আনেন।
শাহ আমানতে আইএলএস পরীক্ষামূলক চালু থাকলেও সেটি নিজ দায়িত্বে ব্যবহারের জন্য পাইলটদের বলা হয়েছে। বিদ্যমান আইএলএস আন্তর্জাতিক কোম্পানির মাধ্যমে কমিশনিং বা পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়নি। এদিকে রানওয়ের উচ্চতা বাড়ানো হলেও জিপিএস (গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম) পদ্ধতি অনুসরণ করে উড়োজাহাজ উড্ডয়ন ও অবতরণ করছেন পাইলটরা। ফলে বিমান উড্ডয়ন ও অবতরণে কিছুটা ঝুঁকি থাকছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। তবে চলতি বছর শেষে আন্তর্জাতিক কোম্পানি দিয়ে আইএলএস কমিশনিং করা হবে বলে জানিয়েছেন বিমানবন্দরের জনসংযোগ কর্মকর্তা ইব্রাহিম খলিল।
নানা সমস্যার কথা তুলে ধরে সিভিল অ্যাভিয়েশনের এই কর্মকর্তা জানান, বিমানবন্দরে বডি স্ক্যানার সচল নেই। এএসআর এবং পিএসআর (রাডার) সিস্টেমের জন্য রানওয়ের সেন্টার লাইন অ্যালাইমেন্ট সংশোধন করতে হবে। ৪ নম্বর গেটে স্থাপন করতে হবে এক্স-রে স্ক্যানিং মেশিন। এ ছাড়া স্থাপন করতে হবে হোল্ড ব্যাগেজ স্ক্রিনিং ও ইনলাইন ব্যাগেজ সিস্টেম। প্যাট্রল, পেরিমিটার চেক, জরুরি পরিদর্শনের জন্য নেই পর্যাপ্ত গাড়ি। কার্গোতে দরকার সিকিউরিটি স্ক্যানার মেশিন।
সিভিল অ্যাভিয়েশনের আরেক কর্মকর্তার দাবি, ২০১৯-২০ অর্থবছরে চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে সার্ভিল্যান্স রাডার স্থাপন, যোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণে ভয়েস কমিউনিকেশন ও কন্ট্রোল সিস্টেম, আন্ডার ভেহিক্যাল স্ক্যানিং মেশিন, মাস্ট লাইট ও ডুয়েল ভিউ স্ক্যানিং মেশিন স্থাপন করা হয়েছে। এর ফলে বিশ্বে বিমানবন্দরটির সেবার পরিধি যেমন বেড়েছে। ইতিমধ্যে রানওয়ে সম্প্রসারণ, অ্যাপ্রোন সম্প্রসারণ, বিমানবন্দরের প্যারালাল ট্যাক্সিওয়ে নির্মাণ, নতুন কার্গো হাউজ নির্মাণ এবং এর মাধ্যমে আধুনিক কার্গো ভিলেজ সংস্থাপন ও কার্গো হাউজ সম্প্রসারণ ও অটোমেশন করা হয়েছে।
বিমানবন্দরের পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন শেখ আবদুল্লাহ আলমগীর জানান, আগের তুলনায় ফ্লাইট চলাচল বেড়েছে ১ দশমিক ৮৯ শতাংশ। যাত্রী চলাচল বেড়েছে ২ দশমিক ৭৭ শতাংশ।
রাজস্ব বেড়েছে ২ দশমিক ৩৫ শতাংশ। অনুমোদিত জনবল ৬১২ জন হলেও বর্তমানে প্রকিউরমেন্ট, স্টোর এবং সরবরাহ বিভাগে সাতজনের পরিবর্তে আছে চারজন। প্রশাসনিক বিভাগে ৯০ জনের জায়গায় আছে ৩৭ জন। হিসাব বিভাগে আটজনের জায়গায় আছে পাঁচজন। মোট পদ খালি আছে ২৬৮টি। আছে যাত্রীদের জন্য ট্রলি সংকট। চাহিদা আছে ৬০০। কর্তৃপক্ষ এই পর্যন্ত পেয়েছে ২০০ ট্রলি।
জানা গেছে, এই বিমানবন্দরে প্রতি সপ্তাহে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রুটে ৩৬৪টি ফ্লাইট উঠানামা করে। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ রুটে ২৪৫টি এবং আন্তর্জাতিক রুটে ১১৯টি। ২০২৩ সালে অভ্যন্তরীণ রুটে ১২ হাজার ২৭৬টি ফ্লাইট উঠানামা করেছে। চলতি বছরের জুন পর্যন্ত উঠানামা করেছে পাঁচ হাজার একটি। ২০২৩ সালে আন্তর্জাতিক রুটের মোট ৮ হাজার ২৩২টি ফ্লাইট উঠানামা করেছে। চলতি বছরের জুন পর্যন্ত ৪ হাজার ২৯৩টি ফ্লাইট উঠানামা করেছে। আন্তর্জাতিক গন্তব্যগুলো হলোÑ শারজাহ, দুবাই, আবুধাবি, জেদ্দা, কাতার, মাস্কাট, মদিনা, ব্যাংকক ও কলকাতা।
২০২৩ সালে এই বিমানবন্দর দিয়ে আন্তর্জাতিক রুটের ৯ লাখ ৭৭ হাজার ৬৭৪ যাত্রী আসা-যাওয়া করেছে। চলতি বছরের জুন পর্যন্ত আসা-যাওয়া করেছে ৪ লাখ ৭৮ হাজার ৪৯৭ জন। একইভাবে অভ্যন্তরীণ রুটে গত বছর আসা-যাওয়া করেছে ৬ লাখ ৪৯ হাজার ৪১৩ জন। চলতি বছরের জুন পর্যন্ত আসা-যাওয়া করেছেন ৩ লাখ ৬ হাজার ৫৩২ যাত্রী। বিমানবন্দরে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সব খাতে মোট রাজস্ব আয় হয়েছে ২৩৭ কোটি ৯ লাখ ৮৫ হাজার টাকা। এর আগের অর্থবছরে (২০২২-২০২৩) আয় হয়েছিল ২২৫ কোটি ৬ লাখ ৪৮ হাজার টাকা।
এদিকে কমে গেছে কার্গো পরিবহন খাতে রাজস্ব আয়। দেখা গেছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে রাজস্ব আয় হয়েছে ৪ কোটি ২ লাখ ৩৪ হাজার টাকা। গত অর্থবছরে (২০২৩-২৪) আয় হয়েছে ২ কোটি ৫ লাখ ৩৫ হাজার টাকা। প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায় গত ১৪টি অর্থবছরে সবচেয়ে বেশি রাজস্ব আয় হয়েছিল ২০১৫-১৬ অর্থবছরে। ওই অর্থবছরে রাজস্ব আয় হয়েছিল ৯ কোটি ৭ লাখ ২২ হাজার টাকা।
বিমানবন্দরের রানওয়ে টার্নিং প্যাড স্থাপন এবং টারমাক সম্প্রসারণ করা হয়েছে হয়েছে বলে জানিয়ে বিমাবন্দরের জনসংযোগ কর্মকর্তা ইব্রহিম খলিল জানান, স্থাপন করা হয়েছে ৩ নম্বর বোর্ডিং ব্রিজ, বসানো হয়েছে ১১৫টি শীতাতপ যন্ত্র। যাত্রীদের সুবিধার জন্য ব্যবস্থা করা হয়েছে র্যাম্প কার। এ ছাড়া যাত্রীদের জন্য বাস্তবায়ন করা হয়েছে অ্যাক্সেস কন্ট্রোল সিস্টেম, হেল্প ডেস্ক ও প্রার্থনা রুম। প্রশাসনিক বিভাগের এস্টেট শাখার জন্য তিনটি বিদ্যমান সমস্যা সমাধান চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মন্তব্য করে কর্মকর্তারা জানান, নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত ১৫০ অফিসার ও স্টাফের আবাসন সংকট প্রকট হয়ে দাড়িয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে এপিবিএন সদস্যদের থাকার ভবনটিও।