চেয়ারে বসে মনোযোগ দিয়ে কৃত্রিম পা লাগানোর চেষ্টা করছেন এক তরুণ। মিনিট পাঁচেক সময় নিয়ে যান্ত্রিক পায়ের সঙ্গে নিজের হাঁটু থেকে কেটে ফেলা পায়ের অংশটুকু সংযোজন করে উঠে দাঁড়ালেন। চোখেমুখে স্পষ্ট তার নতুন স্বপ্ন- বলছিলাম কোটা আন্দোলন ঘিরে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুথানে পুলিশের গুলিতে পা হারানো মোস্তাকিমের কথা। আবারও দাঁড়াতে পারবেন পায়ের ওপর ভর করে তাতেই তিনি খুশি।
মোস্তাকিমকে কৃত্রিম পা নিয়ে দাঁড়াতে দেখে কৌতূহলী হয়ে উপস্থিত অনেকেই তাকিয়ে থাকলেন তার দিকে। তার কৃত্রিম পা লাগিয়ে দিয়েছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান 'ব্র্যাক লিম্ব অ্যান্ড ব্রেইস সেন্টার' (বিএলবিসি)। তিনি ফ্লোরে হাঁটলেন, মুখে হাসি লেগেই আছে।
মোস্তাকিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমি প্রাইভেটকার চালিয়ে বাসায় ফিরবো, এমন সময় মিরপুর-১০ এলাকায় হেলিকপ্টার থেকে গুলি চালায় পুলিশ। একটা গুলি এসে বিদ্ধ হয় আমার পায়ে। এরপর ৩ হাসপাতাল ঘুরেও ঠিকমতো চিকিৎসা পাইনি। শুরুতে মিরপুর-৬ এর একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হয়। তখন আমার গুলিবিদ্ধ পা দিয়ে রক্ত ঝরছিল, সঙ্গে তীব্র ব্যথা। অথচ তারা শুধু ব্যান্ডেজ করেই আমাকে পাঠিয়ে দেয় জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট হাসপাতালে। এরপর পাঠানো হয় পঙ্গু হাসপাতালে। সেখানে অস্ত্রোপচার করে পা কেটে ফেলা হয়। তখন থেকে মনে হচ্ছিল কাঁটা পা নিয়েই জীবন পার করতে হবে। দুশ্চিন্তা নিয়েই দিন কাটছিল।
তিনি বলেন, ভেবেছিলাম পায়ের ওপর ভর দিয়ে আর হাঁটতে পারব না। তবে সেই দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি দিয়েছে ‘ব্র্যাক লিম্ব অ্যান্ড ব্রেইস সেন্টার’ (বিএলবিসি)। বিনামূল্যে কৃত্রিম পা লাগিয়ে দিয়েছে তারা, শুধু তাই নয় আগামী ৫ বছর পর্যন্ত চিকিৎসা সুবিধা দেবে তারা। শুধু তাই নয় প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাও করবে প্রতিষ্ঠানটি।
প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ছাত্র-জনতার আন্দোলনে অঙ্গ হারানো ২৬ জনকে চিকিৎসা সহায়তা দিচ্ছে ব্র্যাক। এর মধ্যে কয়েকজনের কৃত্রিম পা ইতোমধ্যে লাগানো হয়েছে এবং আরও ৫ জন ভর্তি আছেন কৃত্রিম হাত-পা সংযোজনের জন্য। জার্মানিতে প্রস্তুত এক একটি কৃত্রিম পা সংযোজনে খরচ পড়ছে প্রায় ১০ লাখ টাকা, যেটা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে দেওয়া হচ্ছে, একইভাবে যাদের কৃত্রিম হাত সংযোজন প্রয়োজন, তাদেরকেও সর্বোচ্চ প্রযুক্তির কৃত্রিম হাত সংযোজন করা হবে বিনামূল্যে।
১৮ বছর বয়সী মিরাজুল ইসলাম। গত ৫ আগস্ট পাবনায় পায়ে গুলিবিদ্ধ হন। তিনিও এখানে চিকিৎসা নিচ্ছেন। দেশ রূপান্তরকে মিরাজুল বলেন, পাবনার লতিফ টাওয়ারের সামনে আমি গুলিবিদ্ধ হই। শুরু থেকেই বন্ধুরা মিলে আন্দোলনে ছিলাম। ৫ আগস্ট বিজয়ের যখন চূড়ান্ত দ্বারপ্রান্তে, তার কিছু সময় আগে পুলিশ সামনে থেকে আমার পায়ে গুলি করে। আমাকে উদ্ধার করে সাঁথিয়া হাসপাতালে নিয়ে যায় বন্ধুরা, সেখানে থেকে অবস্থা খারাপ দেখে চিকিৎসকরা রাজধানীর পঙ্গু হাসপাতালে পাঠায়। অপারেশনের মাধ্যমে আমার ডান পা হাঁটু থেকে কেটে ফেলা হয়। এরপর ব্রাকের সহযোগিতায় আমাকে কৃত্রিম পা লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, হাসিনা সরকার আমার ভাইদের হত্যা করেছে, আমরা তাকে পরাজিত করে বিজয় ছিনিয়ে এনেছি। এতে আমি পা হারিয়েছি, যদিও আফসোস নেই। এখন আমাদের স্বপ্নের বাংলাদেশ পূর্ণ হোক। আমি পড়াশোনা করতে চাই নিয়মিত। এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছি পাবনার নন্দনপুর কেটিএস আয়েশা খাতুন উচ্চ বিদ্যালয় থেকে। আমাকে ভবিষ্যতে সরকার থেকে পড়াশোনা করার খরচ দেওয়া হলে আমার স্বপ্ন পূরণ হত। দেশের জন্য এই যে সামান্য অবদান রাখতে পেরেছি, সারাজীবন তা নিয়ে গর্ব করতে পারব।
অটোরিকশা চালক রাজু মিয়া, বয়স ৩০ বছর। গাজীপুর থেকে তিনিও এসেছেন এখানে চিকিৎসার আশায়। তিনি বলেন, আমি ২০ জুলাই দুপুরে অটোরিকশা নিয়া বাইর হই। তামিরুল মিল্লাত মাদ্রাসার সামনে একজন আহত ছাত্র বাঁচাও বাঁচাও বলে ডাকছিল। ছেলেটাকে তুলতে গেলে, পুলিশ আমাকে গুলি করে। সেই গুলির কারণে আমার একটি পা কেটে ফেলতে হয়েছে। জীবন নিয়ে দুশ্চিন্তার কথা জানিয়ে এই তরুণ বলেন, আমার ৯ বছর বয়সী ছেলে ও চার বছরের মেয়ে আছে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি আমি। ঘটনার পর থেকে ঘরভাড়া বাকি পড়েছে, কীভাবে সংসার চলবে, কিছুই ঠিক করতে পারছি না। কাজ করতে না পারলে বাচ্চা দুইটাকে খাওয়াব কী? আমার তো জমানো টাকা নাই। চিকিৎসা নিতে যে টাকা খরচ হয়েছে সে টাকাও ধার করা। জীবিকা নিয়ে চিন্তায় আছি ।
ব্র্যাক লিম্ব এন্ড ব্র্যাক সেন্টার (বিএলবিসি)-এর রিহ্যাবিলিটেশন স্পেশালিস্ট নাসরিন জাহান মিলি বলেন, আমরা ২৮ জনের তালিকা করেছি। সাত জনের চিকিৎসা চলছে। ছয় জনের কৃত্রিম পা লাগানো হয়েছে, বাকিরা ফলোআপে রয়েছেন। টোটাল তালিকা হয়েছে ২৫০ জনের। তবে আরও যারা আসবে তাদেরও আমরা তালিকাভুক্ত করব। পাঁচ বছরব্যাপী তাদের কৃত্রিম পায়ের সব ধরনের রক্ষণাবেক্ষণ বিনা মূল্যে করবে এই সেন্টার। এছাড়া যারা কর্মক্ষেত্রে ছিলেন, তাদের সে বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিয়ে পুনর্বাসন করারও পরিকল্পনা রয়েছে।
নাসরিন জাহান আরও জানান, বর্তমানে যে কৃত্রিম পা দেওয়া হচ্ছে, সেটা জার্মান প্রযুক্তির। বাংলাদেশে এটিই সর্বোচ্চ কোয়ালিটিসম্পন্ন কৃত্রিম অঙ্গ। একটি কৃত্রিম পা তৈরিতে ব্যয় হচ্ছে ১০ লাখ টাকা। এক-দুই সপ্তাহ পরেই তারা ভালো হাঁটতে পারবে এবং সব ধরনের কাজ করতে পারবে।