স্মৃতির মিনারে শাহ আহমদ শফী

২০১৪ সালের এক বিকেল। হঠাৎ শিক্ষার্থীদের কাছে শুনলাম শাহ আহমদ শফী (রহ.) আসবেন ঢাকার খিলগাঁও মাখযানুল উলুম মাদ্রাসায়। খতমে বুখারির মাহফিলে। বুখারি শরিফের সর্বশেষ হাদিসের সবক দেবেন তিনি। তার আসার সংবাদ শোনার পর থেকে নিজের ভেতর অন্যরকম একটা চাপা উত্তেজনা কাজ করছিল। মনের ভেতরে একটা সশ্রদ্ধ উৎকণ্ঠা বিরাজ করছিল। মনে মনে তাকে নিয়ে অনেক কিছুই ভাবছিলাম। তিনি কি সত্যিই আসবেন? তার সামনা-সামনি গিয়ে বসতে পারব তো? কাছ থেকে তাকে দেখতে পারব তো! এত বড় মাপের একজন ব্যক্তির কাছে যেতে পারা তো অবশ্যই সৌভাগ্যের বিষয়। মনকে আর বেশিক্ষণ মানিয়ে রাখতে পারলাম না।

প্রিয় মানুষটিকে এক নজর দেখার জন্য রওনা হলাম।

গন্তব্য খিলগাঁও মাখযানুল উলুম মাদ্রাসা। অল্প সময়েই পৌঁছে গেলাম। পুরো মাদ্রাসায় অন্যরকম একটা আয়োজনের আমেজ চোখে পড়ল। মাদ্রাসার মসজিদ কানায় কানায় পরিপূর্ণ। চারদিক থেকে দলে দলে মানুষ আগমন করছে তার সান্নিধ্যে ধন্য হতে। মসজিদের একপাশে বসে তার আসার অপেক্ষার প্রহর গুনতে লাগলাম। আচ্ছা তিনি কখন আসবেন? কোন দিক দিয়ে আসবেন? এই ভাবনার রেশ কাটতে না কাটতেই তিনি এসে পড়লেন। অপেক্ষার আকাশে উদিত হলো নতুন সূর্য। শ্রদ্ধা আর উত্তেজনাবোধ নিয়ে অপলক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে রইলাম। তখন কী যে ভালো লাগছিল, তা শুধু অনুভবের বিষয়। বলে ব্যক্ত করা যাবে না। সে সময় তার প্রতি অন্যরকম একটা মুগ্ধতা সৃষ্টি হয়েছিল। বিগলিত তনুমন নিয়ে তার সামনে বসেছিলাম, খুব জড়সড় ও ইতস্তত ভঙ্গিতে।

তিনি বুখারি শরিফের সর্বশেষ হাদিসের ব্যাখ্যা শুরু করলেন। কোনো দায়সারা ভাব নয়, বরং খুব আন্তরিকতার সঙ্গে আলোচনা করছেন। আহ! কী মনকাড়া, হৃদয় জুড়ানো হাদিসের ব্যাখ্যা। শুধু শুনতেই মন চায়। মুগ্ধতার আবেশে সময়টা কীভাবে কেটে গেল বুঝতেই পারলাম না। তার সেই খতমে বুখারির স্মৃতি এখনো চোখের সামনে জ্বলজ্বল করে ভাসছে। একটুও ভুলে যাইনি। তিনি এখন পরজগতের বাসিন্দা। তবু কল্পনার ডানায় ভর করে তার কাছে নিজেকে ভাবতে বড় ভালো লাগে। তার বিনয়সুলভ মুগ্ধকারী ব্যাখ্যা আজও কানে বাজে। সেই স্বর্ণালি সান্নিধ্যের ছোঁয়া আজও লেগে আছে অন্তরে।

শাহ আহমদ শফী (রহ.) শ্রদ্ধা, ভক্তি আর ভালোবাসা মেশানো একটি নাম। যে নাম শুনে চমকে উঠত সবাই। শাহ আহমদ শফী নামক সূর্যটি অস্তমিত হয়ে গেছে। এই ইহজগতে আর উদিত হবে না। যা আলো ছড়াত সারা বাংলায়। যাকে দেখে আমরা বুকে সাহস জোগাতাম। আশার সঞ্চার হতো অন্তরে। সবাই ভাবত আমাদের একজন অভিভাবক আছেন।

জানতাম একদিন তিনি চলে যাবেন। কারণ দুনিয়াতে কেউ চিরস্থায়ী হয় না। কিন্তু তাকে হারানোর বিচ্ছেদ, ব্যথা আর শোক এত গভীর হবে তা কখনো ভাবিনি। আমরা ধন্য, চির গর্বিত যে, আমরা তার যুগের মানুষ। এমন একজন নবীর ওয়ারিশকে আমরা পেয়েছি এবং কাছ থেকে দেখেছি। তার ইন্তিকালে সারা দেশের মানুষ শোকাহত হয়েছে। শুধু দেশ নয়, দেশের সীমানা পেরিয়ে বহির্বিশ্বেও ছড়িয়েছে শোকের ছায়া।

তিনি ছিলেন চেতনাধারী একজন আলেম ও অভিভাবক। যার জ্ঞান-গরিমা, পাণ্ডিত্য এবং বুকটান করা সাহস জনশ্রুত। এক নামে যাকে চিনত সবাই। হাটহাজারী মাদ্রাসার মহাপরিচালকের পরিচয় পর্যন্ত তিনি আর সীমাবদ্ধ থাকেননি। দিগ্দিগন্তে তার খ্যাতি আর প্রসিদ্ধি ছড়িয়ে পড়ছিল। জাতীয় অনেক সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান তার তত্ত্বাবধানে চলত। হ্যাঁ, সত্যিই তার মৃত্যুতে বাংলাদেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা যেন আজ এতিম। বাঁধনহারা। অভিভাবকশূন্য। আহ! তার মতো স্বচ্ছ, নিষ্ঠাবান আর যোগ্য অভিভাবক কি আর পাব?

ব্যক্তি হিসেবে তিনি ছিলেন অমায়িক। বাহ্যিক সৌন্দর্যের প্রায় সবই ছিল তার মধ্যে। হাস্যোজ্জ্বল চেহারা। উচ্চতার সঙ্গে মানানসই স্বাস্থ্য। উজ্জ্বল ফর্সা গায়ের রঙ। চোখের দৃষ্টিতে বলিষ্ঠ বিশ্বাস ও আস্থা। মার্জিত পোশাক-পরিচ্ছদ। কথাবার্তায় প্রজ্ঞা ও সরলতা। সোজাসাপ্টা কথা বলায় পারদর্শিতা। সব মিলিয়ে জ্যোতির্ময় এক আলোকিত ব্যক্তিত্ব ছিলেন তিনি। জীবনের ১০৪ বছরের সিংহভাগই ছিল হাটহাজারী মাদ্রাসার সীমানায় সীমাবদ্ধ। যার শুরু ও শেষটাও হয়েছে কওমি অঙ্গনে। নিজের বর্ণাঢ্য জীবনে দুহাত ভরে এনে দিয়েছেন সাফল্যের মালা। দিয়েছেন নেতৃত্ব।

২০২০ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর তার ইন্তেকালের সংবাদ শুনি। সংবাদটা শোনামাত্র  ভেতরটা যেন চুরমার হয়ে যায়। এক এক করে বড়রা সবাই চলে যাচ্ছেন। আমাদের মাথার ওপরে ছায়াগুলো দিন দিন সংকীর্ণ হতে চলেছে। ইন্তেকালের খবর শোনার পর থেকে মনে বড় একটা অস্থিরতা কাজ করছিল। ভাবনা আর কল্পনার জগতে ভাসছিলাম, তার জানাজায় শরিক হতে পারব তো? শেষ বিদায় কি তাকে কাছ থেকে জানাতে পারব? সর্বশক্তিমান আল্লাহ কী না করতে পারেন, তিনি তো সবকিছুই পারেন। তার অশেষ রহমতে অল্প সময়ের মধ্যেই হাটহাজারী যাওয়ার ব্যবস্থা হয়ে গেল।

ঘড়ির কাঁটায় তখন বেলা পৌনে ২টা। হাটহাজারী এলাকা আজ লোকে লোকারণ্য। সবার চেহারা মলিন। নেই আগের সেই হাঁকডাক। নেই আবেগ-উচ্ছ্বাস। বিভিন্ন উপলক্ষে আগে যেমনটা দেখা যেত। অজস্র চোখ থেকে গড়িয়ে পড়ছিল শোকের পানি। এই শোকের ছায়া পড়েছিল সবার গায়ে। বুকফাটা কান্নায় ভাসছিল ভক্তরা। আহ! স্বর্ণালি সান্নিধ্যের সেই মানুষটি আজ আর আমাদের মধ্যে নেই।

চার বছর হয়ে গেল তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। অভিভাবকশূন্য জাতি এক ক্লান্তিলগ্ন পার করছে। এই সময়টাতে তার মতো অভিভাবকের অনেক প্রয়োজন ছিল। দোয়া করি, মহান আল্লাহ তার কবরকে নুর দ্বারা আলোকিত করুন। আমিন।