কোন পথে হিজবুল্লাহ?

ক্রমেই তীব্র হয়ে উঠছে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা। গত দুই সপ্তাহ ধরে ইরান সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহকে লক্ষ্য করে লেবাননে হামলা চালিয়ে আসছে ইসরায়েল। এসব হামলায় সংগঠনটির প্রধান হাসান নাসরাল্লাহসহ কয়েকজন শীর্ষ কমান্ডার নিহত হয়েছেন। দুই পক্ষের চলমান এই সংঘর্ষ নতুন সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের জন্য। এরমধ্যে হাসান নাসরাল্লাহর মৃত্যু আগুন আরও উসকে দিয়েছে।

ইসরায়েলের হামলায় গোষ্ঠীটি ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়েছে। নেতৃত্ব শূন্যতা থেকে শুরু করে সামগ্রিক কাঠামোতে বড় পরিবর্তনের মুখে পড়েছে হিজবুল্লাহ। তাতে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে সংগঠনটির ভবিষৎ নিয়ে। যুদ্ধ বিশ্লেষকরা বলছেন, শীর্ষ ও জ্যেষ্ঠ নেতাদের হারানোর এসব ঘটনা হিজবুল্লাহর জন্য স্বল্প মেয়াদে বড় আঘাত হলেও, দীর্ঘ মেয়াদে খুব খারাপ প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা নেই। এক নেতার জায়গায় অন্য নেতাকে বসিয়ে ক্ষমতার শূন্যতা পূরণ করবে হিজবুল্লাহ। পাশাপাশি সংগঠনটির অস্ত্রশস্ত্রের বিশাল সম্ভার রয়েছে, যা তাদের এই সংকট থেকে উত্তরণে সহায়তা করবে।

তবে নাসারাল্লাহর মৃত্যুর পর কে তার উত্তরসূরি হচ্ছেন এবং হিজবুল্লাহ এই সংঘাতময় পরিস্থিতে কোন কৌশল অবলম্বন করবে সব ছাপিয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে সে প্রশ্ন। সামরিক ও যুদ্ধ বিশ্লেষকদের কাছে সে প্রশ্নের উত্তর খোঁজার  চেষ্টা করেছে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা। ধারণা করা হচ্ছে সহসাই নতুন প্রধানের নাম ঘোষণা করবে না হিজবুল্লাহ। তবে নাসরাল্লাহর স্থলাভিষিক্ত হতে পারেন হিজবুল্লাহর দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত হাশেম সাফিউদ্দিন। হিজবুল্লাহর নির্বাহী কাউন্সিলের প্রধান তিনি। গোষ্ঠীটির রাজনৈতিক বিষয় দেখভাল করেন তিনিই। গোষ্ঠীটির জিহাদ কাউন্সিলেরও সদস্য সাফিউদ্দিন। নাসরাল্লাহকে হত্যার অভিযানে কমপক্ষে আটটি যুদ্ধবিমান ব্যবহার করে ইসরায়েল। সামরিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক ইলিয়াস ম্যাগনিয়ার আল জাজিরাকে জানায়, যুদ্ধবিমানগুলো ‘বাংকার-বাস্টার’ বোমায় সজ্জিত ছিল। যুদ্ধবিমানগুলোয় অন্তত ১৫টি ‘বাংকার-বাস্টার’ বোমা ছিল। বোমাগুলোর প্রতিটির ওজন প্রায় ২ হাজার পাউন্ড। হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি বিএলইউ-১০৯ বোমা ও রাফায়েলের তৈরি ‘স্পাইস ২০০০’ বোমার ব্যবহার করেছে ইসরায়েল।

তবে ৩২ বছর ধরে সংগঠনটিকে নেতৃত্ব দেওয়া নাসরাল্লাহকে হত্যার ঘটনা আঞ্চলিক শক্তি ইরানের জন্য একটি বিশাল আঘাত হিসেবে মনে করা হচ্ছে। এরই মধ্যে এ ঘটনার প্রতিশোধ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। হিজবুল্লাহর প্রধানকে ‘শহীদ’ উল্লেখ করে তার হত্যার ঘটনায় ইরানে পাঁচ দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছেন খামেনি। এ সময় প্রতিশোধের বার্তা দিয়ে নাসরাল্লাহর চিন্তাধারা ও তার দেখানো পথ অনুসরণ করার কথা জানান তিনি। মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র লেবাননের হিজবুল্লাহ ফিলিস্তিনের হামাস ও ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা। যুক্তরাষ্ট্রসহ ও পশ্চিমা দেশগুলো এদের সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করেছে। নাসরাল্লাহর মৃত্যুর ঘটনায় তাই মধ্যপ্রাচ্যে আঞ্চলিক যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কাও বাড়ছে প্রবলভাবে। সেক্ষেত্রে ইরানের সিদ্ধান্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, হিজবুল্লাহ এখন টিকে থাকার জন্য পূর্ণশক্তিতে আঘাত করার চেয়ে নেতৃত্ব শূন্যতা পূরণ ও কৌশলগত বিকল্প পথকে বেছে নিতে পারে। কার্নেগি মিডল ইস্ট প্রোগ্রামের জ্যেষ্ঠ ফেলো ইয়েজিদ সেইগ বলেন, ‘ইসরায়েলের এমন হামলার পরও হিজবুল্লাহ নিঃশেষ হচ্ছে না। এমনকি ইরানের সহায়তা না পেলেও, কৌশলগতভাবে ধৈর্য ধরে রেখে এগিয়ে যাবে গোষ্ঠীটি। নাসরাল্লাহকে হত্যার বিষয়টি নিজেদের বিজয় হিসেবে মনে করছে ইসরায়েল। হিজবুল্লাহর নেতৃত্ব শূন্যতার সর্বোচ্চ সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা অব্যাহত রাখবে দেশটি। নিরাপত্তা ও নীতিবিশ্লেষক আলী রিজক বলেন, ইরান সর্বাত্মক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ার পথ বেছে নেবে না। ইসরায়েলের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধে জড়ানো না পর্যন্ত মিত্রদের দিয়ে পরোক্ষ লড়াইয়ের প্রথাগত দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করতে পারে তেহরান।

ইরানের সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, বৈরুতে গত শুক্রবারের হামলায় ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডসের একজন শীর্ষ নেতা নিহত হয়েছেন। এর আগে গত জুলাইয়ে ইরানের রাজধানী তেহরানে এক হামলায় নিহত হন ফিলিস্তিনের সশস্ত্র সংগঠন হামাসের রাজনৈতিক শাখার প্রধান ইসমাইল হানিয়া। নাসরাল্লাহ ছাড়াও শুক্রবারের হামলায় নিহত হয়েছেন গোষ্ঠীটির আরেক কমান্ডার নাবিল কাউক। গত ২০ সেপ্টেম্বর ইসরায়েলে হামলায় নিহত হন জ্যেষ্ঠ কমান্ডার ইব্রাহিম আকিল। গত বছরের ৭ অক্টোবর থেকে বোমা হামলা, গুপ্তহত্যাসহ নানা কৌশলে ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তা থেকে শুরু করে তাদের সমর্থিত সংগঠনগুলোর অন্তত ১১ জন নেতাকে হত্যা করেছে ইসরায়েল।