মহান আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে মানুষ সর্বশ্রেষ্ঠ। মানুষের রয়েছে বিবেক ও বুদ্ধির প্রাবল্য, যা অন্য কোনো জীবের নেই। এই পৃথিবীতে মানুষের পাপ ও পুণ্য অর্জনের সক্ষমতা রয়েছে। যদিও কোরআনে মহান আল্লাহ পাপ-পুণ্যের সম্পর্কে সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন, তবুও মানুষের প্রবৃত্তি তাকে পাপের দিকে টানে। প্রবৃত্তির অনুসরণে মানুষের মনুষ্যত্ব লোপ পায় এবং পশুত্ব বৃদ্ধি পায়। তাই প্রবৃত্তির অনুসরণ অত্যন্ত নিন্দনীয় ও পরিত্যাজ্য। প্রবৃত্তির অনুসরণ মানুষের জীবনের একটি দীর্ঘমেয়াদি ফল। শৈশবকাল থেকে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া পর্যন্ত বিভিন্ন কারণে মানুষ প্রবৃত্তির অধীন হয়ে যায়। এ সম্পর্কে বিস্তারিত বিবরণী তোলে ধরা হলো।
দিকনির্দেশনার অভাব : প্রতিটি শিশু নিষ্পাপ অবস্থায় জন্ম নেয়। মা-বাবা, পরিবার ও পরিবেশের প্রভাবে তার ভালো-মন্দের পার্থক্য বোঝার ক্ষমতা গড়ে ওঠে। একজন আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে শৈশব থেকে শিশুকে পরিবারের পক্ষ থেকে নৈতিক শিক্ষা দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। আবু হুরায়রাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, প্রত্যেক সন্তানই ইসলামি ফিতরাতের ওপর জন্মগ্রহণ করে থাকে। অতঃপর তার মা-বাবা তাকে ইহুদি, নাসারা অথবা অগ্নিপূজক বানিয়ে ফেলে। (সহিহ বুখারি) অন্য হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) শিশুদের প্রতি স্নেহ, ভালো ব্যবহার, সদাচরণ ও শিষ্টাচার শেখানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। অতএব, অভিভাবকদের উচিত শৈশব থেকেই শিশুদের সঠিক দিকনির্দেশনা দেওয়া।
সঙ্গী নির্বাচনে অসতর্কতা : মানুষ সামাজিক জীব। বলা হয়, সঙ্গী ছাড়া মানবজীবন অতিবাহিত করা সম্ভব নয়। ভালো সঙ্গী জীবনকে সাফল্যের দিকে পরিচালিত করে এবং কঠিন পরিস্থিতিতে সাহায্য করে। অন্যদিকে খারাপ সঙ্গী মানুষের চিন্তা-ভাবনা ও আচরণকে নষ্ট করে। ফলে মানবজীবনে বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। তাই ইসলামে বন্ধু নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দিয়েছে। কোরআনের ইরশাদ হয়েছে, ‘মুমিনগণ যেন অন্য মুমিনকে ছেড়ে কোনো কাফেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করে। আর যারা এ রূপ করবে, আল্লাহর সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক থাকবে না।’ (সুরা আলে ইমরান ২৮)
দুনিয়ার প্রতি ভালোবাসা : দুনিয়ার প্রতি অতিরিক্ত ভালোবাসা সব পাপের মূল। মানুষের মনে দুনিয়ার মোহ আল্লাহকে ভুলিয়ে দেয় এবং তাকে পাপ কাজে লিপ্ত করে। তাই মুমিন ব্যক্তির দুনিয়ার মোহ থেকে মুক্ত থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘টাকা-পয়সার পূজারিরা ধ্বংস হোক। পোষাক বিলাসী ধ্বংস হোক। তাকে দিতে পারলে খুশি হয়, না দিতে পারলে রাগান্বিত হয়। (মিশকাত)
ইসলামি জ্ঞানের স্বল্পতা : ইসলামি শিক্ষা মানুষের মধ্যে নৈতিকতা, মূল্যবোধ ও মানবিক গুণাবলি জাগিয়ে তোলে। দুঃখজনক হলেও সত্য, আজকের সমাজে আমরা ধর্মীয় শিক্ষার প্রতি উদাসীন হয়ে পড়েছি। দুনিয়াবি শিক্ষার জন্য আমরা যত অর্থ ও সময় ব্যয় করি, ইসলামি শিক্ষার ক্ষেত্রে সেটার সামান্যতমও করি না। এই কারণে আমাদের ছেলে-মেয়ে ও ভাই-বোনরা পথভ্রষ্ট হয়ে পড়ছে। আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘জেনে রেখো! তোমাদের প্রত্যেকেই একজন দায়িত্বশীল। আর তোমরা প্রত্যেকেই নিজ অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।’ (সহিহ বুখারি)
পরিণাম সম্পর্কে অজ্ঞতা : প্রবৃত্তির অনুসরণে অস্থায়ী এই দুনিয়াতে ক্ষণস্থায়ী লাভবান হওয়া যায়, কিন্তু এর পরিণাম অত্যন্ত ভয়ংকর। প্রবৃত্তির অনুসরণে হাশরের ময়দানে কঠিন শাস্তির সম্মুখীন হতে হবে। আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, সেই ব্যক্তিই সফলকাম হয়েছে, যে ইসলাম গ্রহণ করল, তাকে প্রয়োজনমাফিক রিজিক দেওয়া হলো এবং আল্লাহ তাকে যা দিয়েছেন তাতে সন্তুষ্ট রেখেছেন।’ (মিশকাত) মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, আপনি মুসলিম উম্মাহকে প্রবৃত্তির অনুসরণ থেকে রক্ষা করুন। আমিন।