সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যার আলোচিত মামলা তদন্তে উচ্চপর্যায়ের টাস্কফোর্স গঠনের নির্দেশনা এসেছে উচ্চ আদালত থেকে। একই সঙ্গে এ মামলার তদন্ত থেকে র্যাবকে (র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন) সরাতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের করা আবেদন মঞ্জুর করেছে হাইকোর্ট। এ-সংক্রান্ত আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল সোমবার বিচারপতি ফারাহ মাহবুব ও বিচারপতি মুহাম্মদ মাহবুব-উল ইসলামের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের অবকাশকালীন একটি দ্বৈত বেঞ্চ এ আদেশ দেয়।
বিভিন্ন বাহিনীর অভিজ্ঞ তদন্ত কর্মকর্তাদের নিয়ে টাস্কফোর্স গঠন করে ছয় মাসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করতে বলা হয়েছে। আর এই নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে বলা হয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে।
এক যুগের বেশি সময় আগে সংঘটিত এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তদন্তের দায়িত্ব পেয়েছিল র্যাব। এক রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১২ সালের ১৮ এপ্রিল হাইকোর্টের আদেশে র্যাবকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তবে, ১১১ বারের মতো সময় নিয়েও তদন্ত শেষ করতে পারেনি পুলিশের বিশেষায়িত এই ইউনিটটি। ফলে তদন্তেই আটকে থাকায় চাঞ্চল্যকর এ মামলাটি এখন পর্যন্ত বিচারের পর্যায়ে আসেনি। সবশেষ গত ৯ সেপ্টেম্বর ঢাকার একটি ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলে সময় নিয়েছিল র্যাব।
আলোচিত এই মামলার তদন্তভার র্যাবের কাছে পাঠানোর সেই আদেশ সংশোধন চেয়ে গত রবিবার স্বরাষ্ট্র সচিবের পক্ষে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা হাইকোর্টে আবেদন করেন। এরই ধারাবাহিকতায় বিষয়টি শুনানিতে আসে। আদালত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের করা সংশোধনের আবেদনটি মঞ্জুর করে আদেশ দেয়। স্বরাষ্ট্র সচিবের প্রতি আদালতের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, তদন্ত শেষে ছয় মাসের মধ্যে হাইকোর্টে প্রতিবেদন দিতে হবে। আগামী ৬ এপ্রিল পরবর্তী শুনানি ও আদেশের জন্য দিন ধার্য রেখেছে হাইকোর্ট। আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ আরশাদুর রউফ ও অনীক আর হক। তাদের সহযোগিতা করেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল রেদওয়ান আহমেদ রানজিব। রিট আবেদনকারীর পক্ষে শুনানিতে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ। সাগর-রুনি হত্যা মামলার বাদীপক্ষে শুনানিতে ছিলেন অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির।
২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাতে রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের একটি ফ্ল্যাটে মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক সাগর সরওয়ার এবং এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মেহেরুন রুনি খুন হন। পরদিন ভোরে তাদের ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় ১২ ফেব্রুয়ারি রুনির ভাই নওশের আলী রোমান বাদী হয়ে শের-ই বাংলা নগর থানায় মামলা করেন। প্রথমে মামলাটির তদন্ত করেন ওই থানার একজন কর্মকর্তা। কয়েক দিন পর ওই বছরের ১৬ ফেব্রুয়ারি মামলার তদন্তভার পড়ে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) ওপর। তবে, তদন্তের দায়িত্ব পাওয়ার দুই মাসের মাথায় হাইকোর্টে ব্যর্থতা স্বীকার করে ডিবি। এরপর হাইকোর্টের আদেশে মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব পায় র্যাব।
এ মামলায় সন্দেহভাজন হিসেবে বিভিন্ন সময় গ্রেপ্তার হয়েছেন আটজন। তবে, তাদের কেউ এখন পর্যন্ত হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করেননি। তদন্তের প্রয়োজনে র্যাব গত ১২ বছরে অন্তত ১৫৮ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। মামলার আসামিদের মধ্যে দুজন সাগর-রুনির কথিত বন্ধু তানভীর রহমান ও বাড়ির দারোয়ান পলাশ রুদ্র পাল হাইকোর্টের আদেশে জামিনে আছেন। অন্য ছয় আসামি মিন্টু ওরফে বারগিরা মিন্টু, বকুল মিয়া, কামরুল হাসান অরুন, রফিকুল ইসলাম, এনাম আহমেদ ওরফে হুমায়ুন কবির ও আবু সাঈদ কারাগারে আছেন। এর মধ্যে আসামি বকুল, আবু সাঈদ ও কামরুল ঢাকার বক্ষব্যাধি হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক ডা. নারায়ণ চন্দ্র দত্ত নিতাই হত্যা মামলার আসামি।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী অনীক আর হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হাইকোর্টের এ আদেশের ফলে আমরা নিশ্চিত যে এই হত্যা মামলার তদন্ত হবে। আর টাস্কফোর্স গঠন করবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সেখানে কারা থাকবে, কীভাবে কাজ করবে তা মন্ত্রণালয় দেখবে।’ ১২ বছর আগে র্যাবকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়ার নির্দেশনা চেয়ে আবেদনটি করেছিলেন মানবাধিকার ও পরিবেশবাদী সংস্থা হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের সভাপতি (এইচআরপিবি) অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ। তিনি গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আমরা শুনানিতে বলেছি, যেহেতু দীর্ঘদিনেও র্যাব মামলার তদন্তকাজ শেষ করতে পারেনি, তাই তাদের তদন্তকাজ থেকে বিরত রাখলে আমাদের কোনো আপত্তি নেই। আদালত রাষ্ট্রপক্ষের আবেদন মঞ্জুর করেছে। এ আদেশের ফলে দীর্ঘদিন পর এই হত্যা মামলার তদন্তকাজ শেষ হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে বলে মনে করি।’
এ মামলায় বাদীপক্ষে আইনি শুনানি করতে গত রবিবার আইনজীবী শিশির মনিরকে নিয়োজিত করা হয়। তিনি গতকাল সাংবাদিকদের বলেন, ‘হাইকোর্টের এই আদেশের ফলে আশা করা যায়, তদন্তের যে ক্লুগুলো আছে, আরও যেসব কনফিডেনশিয়াল ডকুমেন্ট দেখার সুযোগ রয়েছে, তাতে দীর্ঘদিন পর এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচন হবে। সেই ক্লুগুলো নিয়ে আলোচনা করে সুনির্দিষ্টভাবে অগ্রসর হওয়া যায়, তাহলে অবশ্যই এ সময়ের মধ্যে তদন্ত সম্পন্ন করা সম্ভব হবে এবং প্রকৃত অপরাধী যারা আছে, যেখানে যে অবস্থায় আছে, তারা আদালতের সামনে হাজির হতে বাধ্য হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘টাস্কফোর্স মানে হলো এখানে পিবিআই (পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন) থাকতে পারে, আরও অন্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপ্তি থাকতে পারে। আমরা চাই পিবিআই, সিআইডি থাকুক এবং সরকারের আরও যেসব এজেন্সি আছে, তারাও থাকুক। সম্মিলিতভাবে টাস্কফোর্স গঠন হোক। তাহলে তদন্ত গ্রহণযোগ্য হবে।’