জেলা প্রশাসক (ডিসি) নিয়োগে জনপ্রশাসন সচিবের বিরুদ্ধে ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ তদন্তে তিনজন উপদেষ্টাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা শারমীন এস মুরশিদ। গতকাল বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে দুর্গাপূজা উপলক্ষে সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে এ কথা জানান তিনি।
তিনি বলেন, ‘ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা, আইন উপদেষ্টা এবং স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এ তিনজনের কথা বলা হয়েছে, এর মানে এই নয় যে অন্যরা এতে যুক্ত হতে পারবেন না। একটি কমিটি করে এটা তদন্ত করা হবে। একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে নিয়ে এরকম কথা। এটি নিয়ে অবশ্যই আমরা উদ্বিগ্ন।’
এদিকে একটি দৈনিকে প্রকাশিত এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদনকে ‘ফেক নিউজ’ বা ‘ভুয়া খবর’ বলে দাবি করেছেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব মো. মোখলেস উর রহমান।
অন্যদিকে ডিসি নিয়োগ কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িত সব কর্মকর্তাকে আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে চাকরি থেকে অপসারণপূর্বক আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে বৈষম্যবিরোধী কর্মচারী ঐক্য ফোরাম।
অন্য কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে জনপ্রশাসন সচিব তদন্ত করেন। কিন্তু তার বিরুদ্ধে ওঠা ডিসি নিয়োগে ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ সরকার তদন্ত করবে কি না, জানতে চাইলে উপদেষ্টা শারমীন এস মুরশিদ বলেন, ‘অবশ্যই আমরা এটার তদন্ত করব, সরকার (তদন্ত) করবে। এটাও কিন্তু আমরা তলিয়ে দেখছি যে ক্লিপটা সোশ্যাল মিডিয়ায় বহুল প্রচারিত হয়ে গেল, সেটা কতখানি এআই (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) প্রডিউসড (তৈরি)। সেটা কতখানি রিয়েল (বাস্তব), কতখানি ফেক (ভুয়া), আমাদের মতো সাধারণ মানুষ বলতে পারে না। ইমিডিয়েটলি যে সিদ্ধান্তটা হয়েছে এটার টেকনিক্যাল ইন্টিগ্রিটিটা কী, সেটা জানার জন্য কেবিনেটে (উপদেষ্টা পরিষদে) কথা হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘সেটা ইনভেস্টিগেট করে ইমিডিয়েটলি দেখতে হবে। আমরা অবশ্যই তদন্ত করব।’
শারমীন এস মুরশিদ বলেন, ‘অত্যন্ত দায়িত্বশীল জায়গায় প্রতিষ্ঠিত কর্মকর্তাদের কোনো ধরনের দায়িত্বহীনতা মেনে নেওয়া যাবে না। এটাও আমাদের অনুশাসনের অধীনে আনতে হবে।’
জনপ্রশাসন সচিব যা বললেন : ডিসি নিয়োগের ক্ষেত্রে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ নিয়ে দৈনিক কালবেলা পরপর দুটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার প্রকাশিত দ্বিতীয় প্রতিবেদনে হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা আদান-প্রদানের কিছু স্ক্রিনশট প্রকাশ করে বলা হয়েছে, ওই আলাপচারিতা একজন যুগ্ম সচিবের সঙ্গে জনপ্রশাসন সচিবের। ডিসি নিয়োগে ‘৫ থেকে ১০ কোটি টাকা’ লেনদেনের কথা হয়েছে সেখানে।
দেশ রূপান্তর স্বাধীনভাবে ওই অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে পারেনি। তবে গতকাল দুপুরে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন জনপ্রশাসন সচিব।
হোয়াটসঅ্যাপ কথোপকথনের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘আমার মোবাইলটা হলো স্যামসাং, ওখানে (কালবেলার প্রতিবেদনে) যেটা শো করছে সেটা হলো আইফোন। উনারা কী দেখাইল, সেটা উনাদের জিজ্ঞেস করবেন। আমি এইটা সম্পর্কে কিছুই জানি না। আমি মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষ। সরকার যে মোবাইল দিয়েছে সেটাও আমি ব্যবহার করি না। আমার আগের যে নম্বর সেটাই আমি ব্যবহার করতেছি।’
এ অভিযোগের কারণে পদত্যাগ করবেন কি না এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আপনারা যদি স্ট্যান্টবাজি নিউজ করতে চান, তাহলে এ প্রশ্ন করতে পারেন। এতদিন আমার সঙ্গে কাজ করেছেন, বিন্দু-বিসর্গ যেখানে সত্যতা নেই। এই প্রশ্ন করার আগে আপনারা নিজেকে প্রশ্ন করেন, কতটুকু যৌক্তিক হচ্ছে আমাকে এই প্রশ্ন করা।’
খবর যদি মিথ্যা হয়, তাহলে কী ব্যবস্থা নেবেন সেই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ইতিমধ্যে আমরা তিনটি পদক্ষেপ নিয়েছি। পত্রিকটির নাম উল্লেখ করে আমরা তথ্য সচিবকে চিঠি দিয়েছি। এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সরকারি চিঠি দেওয়া হয়েছে। প্রেস কাউন্সিল আছে, অন্যান্য যে নিয়মকানুন আছে, সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
তিনি বলেন, ‘যে ভুয়া লোককে কেন্দ্র করে এতকিছু, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য স্বরাষ্ট্র সচিবকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। আগামী এক-দুদিনের মধ্যে তাকে গ্রেপ্তার করা হবে। যে ব্যাংকারের ভুলের কারণে এ ধরনের একটা অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে, তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর মাঠ প্রশাসনেও ব্যাপক রদবদল আনে অন্তর্র্বর্তী সরকার। এর ধারাবাহিকতায় ৫৯ জেলায় নতুন কর্মকর্তাদের জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া নিয়ে সচিবালয়ে ব্যাপক হট্টগোল হয় গত ১০ সেপ্টেম্বর। এর মধ্যে এক যুগ্ম সচিবের কক্ষ থেকে ৩ কোটি টাকার একটি চেক এবং ডিসি নিয়োগসংক্রান্ত কিছু চিরকুট উদ্ধারের খবর দিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে দৈনিক কালবেলা।
তবে গত ৩০ সেপ্টেম্বর সংবাদ সম্মেলন ডেকে কালবেলার ওই প্রতিবেদনকে ‘গুজব’, ‘সম্পূর্ণ ভুয়া’ এবং ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ আখ্যায়িত করেন মোখলেস উর রহমান।
এরপর বৃহস্পতিবারের প্রতিবেদনে খোদ মোখলেস উর রহমানের বিরুদ্ধেই আর্থিক লেনদেন নিয়ে আলোচনার অভিযোগ তুলে ধরে কালবেলা।
প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে, “একটি মেসেজে সচিব নিজেকে ‘নির্লোভ’ দাবি করে মাত্র ৫ কোটির একটি আবদার করেন। জিয়া (যুগ্ম সচিব জিয়াউদ্দিন আহমেদ) তাকে সুখবর দিয়ে বলেন ১০ কোটি রাখার কথা। এতে সন্তুষ্ট হয়ে সচিব তাকে বলেন, ‘আচ্ছা ঠিক আছে, তোমার যেটা ভালো মনে হয়।’ তবে টাকা-পয়সার প্রতি নিজের তেমন লোভ নেই বলেও জিয়াকে জানান সচিব।”
এ বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নে জনপ্রশাসন সচিব মো. মোখলেস উর রহমান বলেন, ‘যারা এটা করেছে তাদের আমরা কতটুকু গুরুত্ব দেব? একটা রাস্তার লোক আমাকে অনেক কিছু বলতে পারে, আমি কি রাস্তার লোকের পেছনে দৌড়াব? আমরা সরকারের পজিশনে থেকে জনগণের স্বার্থে কাজ করি। যেভাবে আছি সেভাবেই কাজ করব। যতদিন আল্লাহ হায়াতে রেখেছেন, নিয়ম অনুযায়ী কাজ করব।’
অভিযোগের বিষয়ে কোনো তদন্ত কমিটি হবে কি না, জানতে চাইলে মোখলেস উর রহমান বলেন, ‘এই অভিযোগকারী আমার বিবেচনায় নেই এবং এই অভিযোগকে আমি মূল্যহীন মনে করি। ইটস আ ফেক নিউজ।’
জড়িতদের শাস্তি দাবি : ঘুষ লেনদেনের ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত শাস্তির দাবি জানিয়ে গতকাল বিবৃতি দিয়েছে বৈষম্যবিরোধী কর্মচারী ঐক্য ফোরাম। সংগঠনের সমন্বয়ক এবিএম আবদুস সাত্তার স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে বলা হয়, দাবি আদায় না হলে আগামী রবিবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সামনে অবস্থান নেওয়া হবে।
বিবৃতিতে বলা হয়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মোখলেস উর রহমান, কয়েকজন অতিরিক্ত সচিব ও যুগ্ম সচিবের অবিশ্বাস্য রকম দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতা সম্পর্কে বিভিন্ন মিডিয়ায় সম্প্রতি যেসব তথ্যনির্ভর খবর পরিবেশিত হয়েছে; তা জেনে আমরা স্তম্ভিত ও উদ্বিগ্ন।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, তারা উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণআন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কয়েকজন ‘সমন্বয়কারীর’ নাম ভাঙিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে দুর্নীতির স্বর্গরাজ্যে পরিণত করেছে। তাদের এ অপকর্ম বর্তমান অন্তর্র্বর্তীকালীন সরকার, সমগ্র জনপ্রশাসন, দেশ ও জাতিকে গভীরভাবে হেয়প্রতিপন্ন করেছে। আমরা তাদের এ কুকর্মকে কখনই মেনে নিতে পারি না।