শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় সাবেক রাষ্ট্রপতি, বিকল্পধারা বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা ও বিশিষ্ট চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে নিজ গ্রামের বাড়ি মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলার বীতারা ইউনিয়নের মজিদপুর দয়াহাটা গ্রামে চিরসমাহিত করা হয়েছে। গতকাল রবিবার বিকেল ৩টার দিকে মজিদপুর দয়াহাটা গ্রামের কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
শনিবার রাজধানীতে পৃথক দুটি নামাজে জানাজা শেষে গতকাল সকালে তার মরদেহ মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলার শ্রীনগর স্টেডিয়ামে আনা হয়। সেখানে সকাল ১০টার দিকে তৃতীয় নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় রাষ্ট্রপতির মরদেহ এক নজর দেখার জন্য আত্মীয়-স্বজন, স্থানীয় রাজনীতিবিদসহ বিভিন্ন শ্রেণিপেশার ব্যাপক মানুষের ঢল নামে। মরদেহের কফিনে ফুলেল শ্রদ্ধা জানায় বিকল্পধারাসহ বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন। পরে তার মরদেহ নেওয়া হয় নিজ গ্রামের বাড়ি মজিদপুর দয়াহাটা গ্রামে। বাদ জোহর মজিদপুর দয়াহাটা জামে মসজিদে চতুর্থ জানাজা হয়। পরে তাকে গ্রামের কবরস্থানে শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় দাফন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে।
এদিকে, শ্রীনগর স্টেডিয়ামে নামাজে জানাজার আগে উপস্থিত লোকজনের উদ্দেশ্যে সাবেক রাষ্ট্রপতির ছেলে বিকল্পধারা বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব মাহী বি. চৌধুরী বলেন, রাষ্ট্রীয় মর্যাদা বলে কিছু নেই, মর্যাদার মালিক একমাত্র আল্লাহ। আল্লাহ ছাড়া কেউ মর্যাদা দিতে পারেন না। আমাদের মনে আছে, ২০০৪ সালে বঙ্গভবন থেকে বের হয়ে তিনি বলেছেন, ক্ষমতা কোনোদিন চিরস্থায়ী হয় না। কিন্তু ইজ্জত আল্লাহর বিশেষ দান।
মাহী বি. চৌধুরী বলেন, যারা আজ ভালো অবস্থায় আছেন তারা অন্যদের দৌড়ের ওপর রাইখেন না। ক্ষমতা কারও জন্য চিরস্থায়ী না। মানুষকে সম্মান করবেন। তাহলে সম্মান পাবেন। এটাই বি. চৌধুরী সাহেবের শিক্ষা। যারাই ক্ষমতায় আসুক, আমরা বি. চৌধুরী সাহেবের পরিবার সবসময় মাথা উঁচু করে বিক্রমপুরের মাটিতে এসে দাঁড়াতে পেরেছি। তিনি আরও বলেন, রাজনীতি রাজনীতির জায়গায়। কিন্তু জিয়াউর রহমানের ছবিটা এখনো তার বেডরুমে মাথার ওপরে রয়েছে। কাজেই রাজনীতির জন্য বিক্রমপুরের একজনের সঙ্গে আরেকজনের সম্পর্ক যেন নষ্ট না হয়। রাষ্ট্রীয় মর্যাদা নিয়ে কেউ নতুন করে কথা বলবেন না। এতে ঝগড়া লাগবে। আমরা নতুন করে ঝগড়া চাই না। তিনি মারা যাওয়ার সময় তার ছাত্র-ছাত্রী, ডাক্তার, নার্স, রাজনৈতিক নেতাকর্মী মিলে এক-দেড়শ লোক উপস্থিত ছিলেন। তাদের কোলে মাথা রেখে তিনি আস্তে আস্তে আল্লাহর কাছে চলে গেছেন। এমন মর্যাদা সম্মান রাষ্ট্র দিতে পারবে না।
বাবার শেষ ইচ্ছা প্রসঙ্গে মাহী বি. চৌধুরী বলেন, আমার বাবা সারা জীবন বিক্রমপুরের মানুষকে ভালোবেসেছেন। দলমত নয়, ওনার কাছে কেউ যদি বলতেন বিক্রমপুরের মানুষ। তাকেই বুকে টেনে নিতেন। তার শেষ ইচ্ছা ছিল বিক্রমপুরে তাকে সমাহিত করা হোক। তার মৃত্যুতে বড় কোনো আয়োজন যেন না থাকে। রাজনৈতিক জীবনে তিনি কোনো ভুল করে থাকলে ক্ষমা করবেন। সবার কাছে আমার বাবার জন্য, আমার পরিবারের জন্য দোয়া চাই।
বি. চৌধুরী প্রয়াত রাষ্ট্রপতি মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের অনুরোধে ১৯৭৮ সালে রাজনীতি শুরু করেন। তিনি মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর থেকে ১৯৭৯ সালে প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং কেবিনেটমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯১ সালে তিনি দ্বিতীয়বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং প্রথমে শিক্ষামন্ত্রী ও পরে সংসদ উপনেতা হন। ১৯৯৬ সালে তিনি সংসদে বিরোধীদলীয় উপনেতার দায়িত্ব পালন করেন। সর্বশেষ ২০০১ সালে তিনি পুনরায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং একই বছরের অক্টোবর থেকে নভেম্বর পর্যন্ত বিএনপি সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন। অধ্যাপক এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী ২০০১ সালের ১৪ নভেম্বর বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। রাজনৈতিক কারণে ২০০২ সালের ২১ জুন রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন। ২০০৪ সালের ৮ মে বি. চৌধুরী বিকল্পধারা বাংলাদেশ নামে একটি রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি দলটির প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করছিলেন।