জমে থাকা পানিতে ভাসছে ডুমুরিয়া

১৪

 

 

আধা মাস ধরে পানিবন্দি সিংগা গ্রামের ৮০টি পরিবার। গ্রামের কাঁচা ঘরবাড়ি ধসে পড়ছে। লোকজনের থাকার জায়গা নেই, রান্না করার জায়গা নেই, স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার নেই। চারদিকে পানি আর পানি। আগেই ডুবে গেছে পুকুর ও ভেসে গেছে ঘেরের মাছ। মরে সাদা হয়ে গেছে ক্ষেতের সবজি। শিশুরা রোজ ডোঙায় করে বিদ্যালয়ে যাওয়া-আসা করছে।

শুধু সিংগা গ্রামই নয়, এমন করুণ চিত্র খুলনার সবচেয়ে বড় উপজেলা ডুমুরিয়ার প্রায় শতাধিক গ্রামে। নদীমাতৃক উপজেলা হলেও নদী ভরাট হওয়ায় ও সøুইসগেট অকেজো থাকায় এবং খালে নেটপাতা ও বাঁধের কারণে চলতি বর্ষা মৌসুমে অতিবর্ষণে গ্রামগুলো প্লাবিত। এ সময় ভয়াবহ জলাবদ্ধতার কবলে পড়ে গ্রামগুলো। পানি নিষ্কাশন হয় না ঠিকমতো। এখন জলাবদ্ধতা স্থায়ী রূপ নিয়েছে। অবর্ণনীয় দুর্ভোগ লাখো মানুষের।

উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, খুলনার ৯টি উপজেলার মধ্যে আয়তনে (৪৫৫ কিলোমিটার) সবচেয়ে বড় ডুমুরিয়া। এটির ১৪টি ইউনিয়ন ধামালিয়া, রঘুনাথপুর, রুদাঘরা, খর্ণিয়া, আটলিয়া, মাগুরাঘোনা, শোভনা, শরাফপুর, সাহস, ভা-ারপাড়া, ডুমুরিয়া, রংপুর, গুটুদিয়া ও মাগুরখালী। সবচেয়ে বেশি জলাবদ্ধতা হয় রংপুর, খর্ণিয়া, গুটুদিয়া, রঘুনাথপুর, ধামালিয়া, আটলিয়া ও মাগুরাঘোনা ইউনিয়নে। এসব ইউনিয়নের শতাধিক গ্রামের লাখো মানুষ এখন পানিবন্দি।

খর্ণিয়া ইউনিয়নের সিংগা গ্রামের বাসিন্দা টুম্পা রানী ও রংপুর ইউনিয়নের মাধবকাটি বিলপাটিয়া গ্রামের বাসিন্দা আরতী জানান, বাথরুমে যাওয়ার মতো অবস্থা নেই। প্রায়দিনই কেরোসিন জ¦ালিয়ে সামান্য খিচুড়ি রান্না করে খেয়ে দিন পার করতে হচ্ছে। পায়ে চর্মরোগ হচ্ছে। সবার মধ্যে সাপের আতঙ্ক। সেচ দিয়ে পানি কিছুটা কমানো গেলে জীবনে কিছুটা স্বস্তি আসত।

খর্ণিয়া ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মোল্লা আবুল কাশেম ও ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মো. মোক্তার হোসেন এবং জলাবদ্ধ এলাকার বাসিন্দারা দেশ রূপান্তরকে বলেন, সবজি ও মাছের ভা-ার হিসেবে খ্যাত ডুমুরিয়া উপজেলা। এবারের অতি বর্ষায় শত শত বিঘা জমির মাছের ঘের ভেসে গেছে। পানিতে তলিয়ে থাকায় কাঁচা ফসল শিম, তরমুজ, লাউ, টমেটো, উচ্ছে, ঝিঙে প্রভৃতির গাছ শুকিয়ে মরে যাচ্ছে। কাঁচা ঘর ধসে পড়ছে। মানুষ বাড়িঘর ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় খুঁজছে।

ডুমুরিয়া প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. হাবিবুর রহমান জানান, উপজেলার ১৫টি বিদ্যালয়ের আশপাশ ও সড়ক পানিতে ডুবে আছে। শরাফপুর ইউনিয়নের ভদ্রা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মাঠবকাটি বিলপাটিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠদান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। জলাবদ্ধতার কারণে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কমে গেছে।

ডুমুরিয়া মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা দেবাশিষ বিশ্বাস জানান, দুটি বিদ্যালয়ের ফ্লোর পানিতে ডুবে আছে। বিদ্যালয়ে আসার সড়ক ডুবে গেছে। ফলে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে।

খুলনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আবদুর রহমান তাজকিয়া বলেন, এ উপজেলার মধ্য দিয়ে ১১টি নদ-নদী বয়ে গেছে। এসবের মধ্যে মিডল ভদ্রা, ভদ্রা জয়খালি, হামকুড়া, আপার শালতা, লোয়ার শালতা, লোয়ার শোলমারী ও হরি নদী পুরোপুরি ভরাট হয়ে গেছে। বাকিগুলোয় জোয়ারের সময় পানি থাকলেও ভাটায় হেঁটে পার হওয়া যায়। নদীগুলোর সঙ্গে সংযুক্ত খালের মুখগুলোয় ৭৫টি সøুইসগেট রয়েছে। সচল আছে ২১টি সøুইসগেট। ২৩টি একেবারে অকেজো। ১১টি আংশিকভাবে কাজ করে। আর বাকি ২০টি সøুইসগেটের মুখ পলি জমে ভরাট হয়ে আছে। এ কারণে বর্ষার পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। নদী খনন ছাড়া এ সমস্যার কোনো সমাধান নেই। ইতিমধ্যে ৪২০ কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হয়েছে।

ডুমুরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আল-আমিন জানান, ১৪টি ইউনিয়নের মধ্যে সাতটি ইউনিয়নের শতাধিক গ্রামে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা। অতিবর্ষণে ১৬০ কোটি টাকার ক্ষতি নিরূপণ করা হয়েছে। পানির পরিমাণ বেশি, সেচ দিয়ে তাড়াতাড়ি কমানো সম্ভব নয়। তারপরও সেচ দিয়ে কমানোর চেষ্টা চলছে। নদী খননই স্থায়ী সমাধান।