কবে সচল হবে মাটির নিচে ৮ হাজার কোটির পাইপলাইন

মাটির নিচে সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকার পাইপলাইন অলস বসে আছে। এই পাইপলাইন কবে নাগাদ সচল হবে, তার কোনো আভাস দিতে পারছে না বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। ফলে আপাতত সাগর পথে তেল পরিবহনে প্রাইভেটাইজেশনের দিকে যেতে হচ্ছে সরকারকে। এজন্য সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন ইতিমধ্যে একটি বিদেশি কোম্পানির জাহাজকে ভাড়া করেছে। আর অন্তর্বর্তী সময়ের জন্য তেল পরিবহনে জাহাজ খুঁজছে বিপিসি।

সৌদি আরব ও আবুধাবি থেকে মাদার ভেসেলে (বড় জাহাজ) আসা পরিশোধিত এবং অপরিশোধিত তেলগুলো কুতুবদিয়ার পরে চট্টগ্রাম বন্দরে প্রবেশ করতে পারে না। কুতুবদিয়া থেকে লাইটারিং (ছোট জাহাজ) করে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের ‘বাংলার জ্যোতি’ ও ‘বাংলার সৌরভ’ এত দিন এই তেল পতেঙ্গায় ইস্টার্ন রিফাইনারিতে নিয়ে আসত। কিন্তু সম্প্রতি বিস্ফোরণ ও দুর্ঘটনায় জাহাজ দুটি তেল পরিবহনব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে যায়। এখন অগত্যা কুতুবদিয়ায় অপেক্ষারত মাদার ভেসেল থেকে তেল খালাস করতে বিদেশি জাহাজ ভাড়া করা হয়েছে।

আগামীতে কীভাবে এই তেল পরিবহন করা হবে, এমন প্রশ্নের জবাবে বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর মাহমুদুল মালেক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা দেশীয় ও বিদেশি কোম্পানির কাছে জাহাজ চাইব। এদের দেওয়া দর পর্যালোচনা করব। যাদের দর জুতসই মনে হবে, আমরা তাদের জাহাজ দিয়ে লাইটারিং করব। তবে এ ক্ষেত্রে আমরা চেষ্টা করব দেশীয় কোম্পানিকে সুবিধা দিতে। আর তা দিলে আমাদের দেশীয় টাকা সাশ্রয় হবে।’

কিন্তু দেশে কি এই জাহাজ আছে? তেল পরিবহনে নিয়োজিত অয়েল ট্যাংকার অ্যাসোসিয়েশনের দুটি সংস্থার মালিকপক্ষের প্রতিনিধি ও শিপিং সেক্টরের প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দেশীয় কোনো কোম্পানির কাছে বিএসসির দুই জাহাজের মতো কোনো অয়েল ট্যাংকার নেই।

এ বিষয়ে কথা হয় বাংলাদেশ অয়েল ট্যাংকার মালিক অ্যাসোসিয়েশনের অফিস সেক্রেটারি মোশাররফ হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমাদের অ্যাসোসিয়েশনের আওতায় প্রায় ৪০টি অয়েল ট্যাংকার জাহাজ অভ্যন্তরীণ নৌপথে চলাচল করলেও এগুলো সর্বোচ্চ ১ হাজার ৫০০ টন পরিবহন করতে পারে। অন্যদিকে বিএসসির জাহাজগুলো পরিবহন করত প্রায় ১১ থেকে ১২ হাজার টন তেল।’

দেশে তেল পরিবহনে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ট্যাংকার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন নামের আরেকটি সংস্থা রয়েছে। কথা হয় এই সংস্থার অফিস সেক্রেটারি শামীম হাসানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমাদের অ্যাসোসিয়েশনের আওতায় ১২০টি পেট্রোলিয়াম অয়েল ট্যাংকার থাকলেও, এগুলোর সর্বোচ্চ বহন ক্ষমতা প্রায় দুই হাজার টন।’

কিন্তু এই জাহাজটি মাদার ভেসেল থেকে তেল পরিবহন করে পতেঙ্গায় ইস্টার্ন রিফাইনারিতে নিয়ে আসতে পারবে? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘কেন পারবে না? আমরা কম কম করে নিয়ে আসব।’

বাংলাদেশ বাংলাদেশ মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট ক্যাপ্টেন আনাম চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের দেশে লাইটারিং উপযোগী অয়েল ট্যাংকার নেই। বিএসসিতে দেশের বাইরে থেকে চার্টার্ড (ভাড়া) করতে হবে। তাহলে চাহিদা অনুযায়ী জাহাজ পাবে বিএসসি।’

এ ব্যাপারে বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর মাহমুদুল মালেক বলেন, ‘এসপিএম (সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং) চালু না হওয়া পর্যন্ত আমরা চার্টার্ড করা জাহাজেই তেল পরিবহন করব।’

এসপিএম চালু হচ্ছে না কেন? : সাগর পথে লাইটারিং করে তেল পরিবহন বন্ধের জন্য সরকার ২০১৫ সালে প্রকল্প নিলেও দফায় দফায় সময় বাড়িয়ে ৮ হাজার ৩৪১ কোটি টাকায় এসপিএম পদ্ধতি চালু হয়। এর মাধ্যমে মহেশখালী সমুদ্র উপকূল থেকে সাগরের দিকে ১৬ কিলোমিটার দূরে একটি পয়েন্টে গোলাকার রিং বসানো হয়েছে। সেই রিং থেকে সাগরের নিচে দিয়ে দুটি পাইপলাইন এসেছে মহেশখালীর কালারমারছড়া এলাকার স্টোরেজে। সেই স্টোরেজ থেকে সাগরের উপকূল ঘেঁষে মাটির নিচ দিয়ে পাইপলাইনে তেল আসার কথা পতেঙ্গার ইস্টার্ন রিফাইনারিতে। এই পাইপলাইনে তেল পরিবহনের জন্য গত বছরের ৩ জুলাই ‘এমটি হোরে’ নামের জাহাজ প্রথম নোঙর করা হয়েছিল। পরে গত মার্চে আরও একবার পাইপলাইনে তেল পরিবহনের পর আর পরিবাহিত হয়নি। তখন থেকেই তা অলস বসে আছে। এই দুটি পাইপলাইনের একটি দিয়ে ডিজেল ও অন্যটি দিয়ে ক্রুড অয়েল (অপরিশোধিত তেল) আসার কথা।

কেন এই পাইপলাইন সচল করা যাচ্ছে না, এই প্রশ্নের উত্তর জানতে চাইলে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের পরিচালক (অপারেশন) অনুপম বড়–য়া বলেন, ‘গত বছর এসপিএম কমিশনিং হওয়ার পর একবার পাইপলাইনে গভীর সমুদ্রবন্দর থেকে মহেশখালী হয়ে ইস্টার্ন রিফাইনারিতে তেল আনা হয়েছিল। কিন্তু নিয়মিতভাবে মাদার ভেসেল থেকে এসপিএমে (কুতুবদিয়ায় সাগরে একটি পয়েন্টে পাইপ রয়েছে। সেখান থেকে তলদেশ দিয়ে পাইপ মহেশখালী হয়ে ইস্টার্ন রিফাইনারিতে আনার প্রক্রিয়াকে বলা হয় এসপিএম) তেল খালাসে দক্ষ ব্যবস্থাপনা দরকার। আমরা এজন্য ঠিকাদার নিয়োগ করব। এই ঠিকাদার তেল খালাসের কাজটি সম্পন্ন করবে। সেই ঠিকাদারের কাছ থেকে আমাদের লোকজন ধীরে ধীরে খালাস প্রক্রিয়াটি শিখবে।’

কবে নাগাদ ঠিকাদার নিয়োগ হতে পারে? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আরও ছয় মাস লাগতে পারে।

তবে অন্য এক সূত্রে জানা যায়, ঠিকাদার নিয়োগ চূড়ান্ত করতে আগামী বছরের জুন পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।