অথৈ সাগরে পর্যটন ব্যবসায়ীরা

পার্বত্য তিন জেলায় পর্যটক ভ্রমণে প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞায় হতাশ প্রকাশ করেছেন এই শিল্পে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও শ্রমিকরা। তিন মাস ধরে দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সম্প্রতি পাহাড়ি-বাঙালি সংঘাতের কারণে এমনিতেই পাহাড়ে পর্যটকদের আনাগোনা কম ছিল। ফলে লোকসান গুনতে হয়েছে এই খাতের ব্যবসায়ীদের। তাদের আশা ছিল দুর্গাপূজার ছুটিতে সেই লোকসান কিছুটা কাটিয়ে ওঠার। তবে প্রশাসনের পর্যটক ভ্রমণের নিষেধাজ্ঞায় হতাশ তারা। কর্মচারীদের বেতন-ভাতাসহ প্রতিদিনের অন্যান্য খরচ চালিয়ে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা নিয়েই সংশয়ে পড়েছেন তারা। বিশেষ করে রাঙ্গামাটির ব্যবসায়ীরা পড়েছেন অথৈ সাগরে। তারা যত দ্রুত সম্ভব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন।

জেলার পর্যটন-সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সাধারণত অক্টোবর মাস থেকে মার্চ পর্যন্ত রাঙ্গামাটিতে পর্যটনের ‘পিক সিজন’ ধরা হয়। শরতের মাঝামাঝি থেকে হালকা শীতের আমেজ আসতেই পর্যটক ভিড় করেন হ্রদ, পাহাড় ও ঝরনার দেশ রাঙ্গামাটিতে। এ সময় শান্ত কাপ্তাই হ্রদের জলে নৌবিহারে নেমে পড়েন ভ্রমণপ্রেমীরা। পাহাড়, হ্রদ নিয়ে পর্যটকদের আগ্রহের কারণে এই খাতের উন্নয়নে এগিয়ে এসেছেন তরুণ উদ্যোক্তারা। পর্যটকদের ভ্রমণ আনন্দ ও আকর্ষণীয় করে তুলতে নানা উদ্যোগ নিয়েছেন। করেছেন কোটি টাকা বিনিয়োগ। কাপ্তাই হ্রদের ছোট ছোট দ্বীপে তৈরি করা হয়েছে রিসোর্ট। হ্রদে নামানো হয়েছে হাউজ বোট। কিন্তু গত কয়েক মাসের রাজনৈতিক অস্থিরতা, পাশাপাশি পার্বত্য জেলায় পাহাড়ি-বাঙালি সংঘাতের কোপ পড়েছে এবার পর্যটন খাত। ৮-৩১ অক্টোবর পর্যন্ত রাঙ্গামাটিসহ তিন পার্বত্য জেলা ভ্রমণে বিরত থাকার পরামর্শ দিয়েছে জেলা প্রশাসন। আর এতে হতাশা ও দুশ্চিন্তা ভর করেছে এই খাতের বিনিয়োগকারীদের।

ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব রাঙ্গামাটির (টোয়ার) সভাপতি ও গরবা ট্যুরিজমের সিইও বাদশা ফয়সাল বলেন, ‘এই নিষেধাজ্ঞা শুধু একটা নির্দেশনা নয়; এটা দীর্ঘমেয়াদি একটা নেতিবাচক ফল বয়ে আনবে আমাদের জন্য। বাইরে থেকে সবাই ভাববে পাহাড় নিরাপদ নয়, সেখানে ঘুরতে যাওয়া নিরাপদ হবে না। সে ক্ষেত্রে প্রত্যাহারের পরও কতটুকু এটা রিকভার করতে পারব, আমরা বুঝতে পারছি না। অনেকেই এই ব্যবসা ছেড়ে বিদেশে পাড়ি দেওয়ার চিন্তাভাবনা করছেন। এই ক্ষতি বলে বোঝানোর মতো নয়।’

হাউজ বোট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও বার্গি লেকের পরিচালক বাপ্পী তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, ‘রাঙ্গামাটি শহরসহ এর আশপাশে যে এলাকা, তাতে বর্তমানে যে পরিস্থিতি, সেখানে পর্যটক ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞার মতো এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়নি কিংবা সে রকম পরিস্থিতি আমরা দেখছিও না, আর যদি শুধু নিরাপত্তার জন্য পর্যটক ভ্রমণ নিষেধ করা হয়, তাহলে তো পর্যটক ভ্রমণ বন্ধ রেখে তো পরিস্থিতি উন্নয়ন হবে না, এই বিষয়টি সংশ্লিষ্ট সবাইকে ভেবে দেখা দরকার।’ তিনি জানান, দুর্গাপূজায় টানা ছুটিতে হোটেল, মোটেল, রিসোর্টগুলো অগ্রিম বুকিং ছিল, সেগুলো ক্যান্সেল করতে হচ্ছে। ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত যদি এই নিষেধাজ্ঞা বলবৎ থাকে, তাহলে এই খাতে কোটি কোটি টাকা লোকসান হবে।

রাঙ্গামাটি ট্যুরিস্ট বোট মালিক সমিতির সহসভাপতি রমজান আলী বলেন, ‘কাপ্তাই হ্রদে পর্যটকদের নৌবিহারের জন্য কয়েকশ ট্যুরিস্ট বোট রয়েছে। এতে হাজারখানেক মালিক ও শ্রমিকের সংসার নির্ভরশীল। পর্যটক ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞায় সবাই কষ্টে পড়েছেন। এমনিতেই এতদিন পর্যটক ছিল না। সামনের টানা ছুটিতে যখন সবাই প্রস্তুতি নিচ্ছিল, তখন এমন নির্দেশনায় আমাদের মালিক-শ্রমিক সবার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েছে।’

রেস্টুরেন্ট মালিক সমিতির সাবেক সম্পাদক এম নেকবর আলী জানান, পর্যটক না এলে সব সেক্টরেই প্রভাব পড়বে। পর্যটকদের ওপর নির্ভর করে এখানে অসংখ্য রেস্টুরেন্ট খোলা হয়েছে, তাদের লোকসানে পড়তে হবে। কারণ পর্যটক না এলেও ভাড়া, স্টাফ খরচ, বিদ্যুৎ, পানি বিল সব বহন করতে হবে।

রাঙ্গামাটি শহরে ৫৩টি হোটেল রয়েছে। পর্যটকরা রাঙ্গামাটি এলে বেশিরভাগই এসব হোটেলেই রাত্রিযাপন করেন। পর্যটক ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞায় হোটেল ব্যবসায়ীও বিপাকে। রাঙ্গামাটি হোটেল মালিক সমিতির সভাপতি মঈনুদ্দীন সেলিম জানান, গত কয়েকমাসের লোকসান পূজার এই ছুটিতে কাটিয়ে তোলার লক্ষ্য ছিল ব্যবসায়ীদের। কিন্তু ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞায় ব্যবসায়ীরা আরও লোকসানে পড়লেন। অনেক হোটেলে কর্মচারী ছাঁটাই করতে হবে খরচ কমানোর জন্য।

রাঙ্গামাটি ভ্রমণে এলে পর্যটকদের নির্ধারিত গন্তব্য পর্যটন কমপ্লেক্সের ঝুলন্ত সেতু। যেটিকে রাঙ্গামাটির ‘আইকন’ বলা হয়। দেড় মাস ধরে ঝুলন্ত সেতুর পাটাতন কাপ্তাই হ্রদের পানিতে ডুবে আছে। এতে তারা দৈনিক লোকসানে দিন কাটাচ্ছে। এবার এই নিষেধাজ্ঞার সিদ্ধান্তে আবারও পিছিয়ে পড়ল পর্যটন করপোরেশনের এই প্রতিষ্ঠানটি। পর্যটন হলিডে কমপ্লেক্সের ব্যবস্থাপক আলোক বিকাশ চাকমা বলেন, ‘এই সিদ্ধান্তের কারণে আমাদের দৈনিক লক্ষাধিক টাকা ক্ষতি হবে।’

এ পরিস্থিতিতে জেলা প্রশাসকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে অনতিবিলম্বে তিন পার্বত্য জেলায় পর্যটকদের ভ্রমণের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারসহ চার দফা দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

চারটি দাবির মধ্যে আছে পর্যটন-সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে এই খাতের উদ্যোক্তাদের সঙ্গে পরামর্শ গ্রহণ, আর্থিক ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার জন্য প্রণোদনার ব্যবস্থা গ্রহণ করা, পর্যটন খাতের উন্নয়ন ও বিকাশের জন্য অব্যাহতভাবে নীতি এবং আর্থিক সমর্থন সমুন্নত রাখা।

সার্বিক বিষয়ে রাঙ্গামাটি জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মোশারফ হোসেন খান জানান, তাদের দাবি-দাওয়ার বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করা হবে।